
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি এখন ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে কোমেন। ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৭ নম্বর মহাবিপদসঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদফতর। পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তা নীলুফার জাহান জানান, ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার রাত সোয়া ৯ টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৫ কিলোমিটার পশ্চিম উত্তর-পশ্চিমে, মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করছিল। গত রাত সোয়া ১২টার পর থেকে ভারি বৃষ্টিসহ বাতাসের গতিবেগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ‘ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের নিকটে সাগর সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে। এটি আরও ঘনীভূত হতে পারে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করবে। "এ সময় ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে"।

নিম্নচাপের কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার ও সমুদ্রগামী জাহাজকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে। গভীর নিম্নচাপটি উপকূল অতিক্রমের সময় উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরে নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুটের বেশি উচ্চতার বায়ুর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এ জেলাগুলোতে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। নিম্নচাপের প্রভাব গত কয়েকদিন ধরেই সারাদেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ভারি বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পাহাড় ধসের কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন জায়গায় দেখা দিয়েছে বন্যা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি। গৃহহীন হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। ঘুর্ণি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলের মানুষজন। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতাই ক্ষতি হ্রাসে সর্বোত্তম পন্থা বলে পরামর্শ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদফতর।

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আগে করণীয়ঃ দুর্যোগের সময় কোন এলাকার লোক কোন আশ্রয়ে যাবেন, গৃহপালিত পশুপাখি কোথায় রাখবেন তা আগে ঠিক করুন এবং জায়গা চিনে রাখুন। বাড়িতে, গ্রামে, রাস্তায় ও বাঁধের ওপর গাছ লাগান। যথাসম্ভব উঁচু স্থানে শক্ত করে ঘর তৈরি করুন। পাকা ভিত্তির ওপর লোহার বা কাঠের পিলার এবং ফ্রেম দিয়ে তার ওপর ছাউনি দিন। ছাউনিতে টিন ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ ঝড়ের সময় টিন উড়ে মানুষ ও গবাদিপশু হতাহত করতে পারে। ডায়রিয়া-মহামারীর প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের ডায়রিয়া হলে কীভাবে খাবার স্যালাইন তৈরি করতে হবে সে বিষয়ে পরিবারের সবাইকে প্রশিক্ষণ দিন। ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার মাসগুলোতে বাড়িতে মুড়ি, চিড়া ও বিস্কুট জাতীয় শুকনো খাবার রাখা ভালো। নোংরা পানি কীভাবে ফিটকিরি বা ফিল্টার দিয়ে খাবার ও ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিন। ঘূর্ণিঝড়ের পরে বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করুন। বৃষ্টির পানি নিরাপদ। মাটির বড় হাঁড়িতে বা ড্রামে পানি রেখে তার মুখ ভালোভাবে আটকে রাখতে হবে, যাতে পোকামাকড় ও ময়লা-আবর্জনা ঢুকতে না পারে। পূর্বাভাস পাওয়ার পর দুর্যোগকালে করণীয় হল-ঘরগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করে মজবুত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। বিপদ সঙ্কেত পাওয়ামাত্র বাড়ির মেয়ে, শিশু ও বয়স্কদের আগে কাছাকাছি নিরাপদ স্থান বা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি রাখুন ও সময় নষ্ট না করে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় আগুন নিভিয়ে যাবেন। গরু-ছাগল কাছের উঁচু বাঁধে অথবা কেল্লা বা উঁচু স্থানে রাখুন। কোনো অবস্থাতেই গোয়ালঘরে বেঁধে রাখবেন না। কোনো উঁচু জায়গা না থাকলে ছেড়ে দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে দিন। টিউবওয়েলের মাথা খুলে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং টিউবওয়েলের খোলা মুখ পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে আটকে রাখতে হবে, যাতে দূষিত বা লবণাক্ত পানি টিউবওয়েলের ভেতর প্রবেশ করতে না পারে।

দুর্যোগ পরবর্তী করণীয়ঃ রাস্তাঘাটের ওপর উপড়েপড়া গাছপালা সরিয়ে ফেলুন, যাতে করে সহজে সাহায্যকারী দল আসতে পারে এবং দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষকে বাড়ি ফিরতে সাহায্য করুন এবং নিজের ভিটায় বা গ্রামে অন্যদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিন। অতিদ্রুত উদ্ধারকারী দল নিয়ে খাল, নদী, পুকুর ও সমুদ্রে ভাসা বা বনাঞ্চল বা কাঁদার মধ্যে আটকেপড়া মানুষ বা গবাদিপশু উদ্ধার করুন। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ যাতে শুধু এনজিও বা সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজ উদ্যোগে অন্যকে সাহায্য করেন সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। পুকুর বা নদীর পানি ফুটিয়ে পান করুন। বৃষ্টির পানি ধরে রাখুন। নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ লোকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ত্রাণ বণ্টন (আলাদা লাইনে) করুন। দ্রুত উত্পাদনশীল ধান ও শাকসবজির জন্য জমি প্রস্তুত করুন, বীজ সংগ্রহ করুন এবং কৃষি কাজ শুরু করুন, যাতে করে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফসল ঘরে আসে।
সতর্ক হো্ন নিরাপদে থাকুন।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১৫ সকাল ৯:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



