somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান সংগীত পরিচালক সমর দাসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলা গানের অমর সুরস্রষ্টা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরসৈনিক ও উপমহাদেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস। কালের ডামাডোলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তের দাগ মুছে গেছে, কিন্তু আজও তাঁর স্বাধীনতার গান আমাদের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল ও জাজ্বল্যমান। এখনো রক্তে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ ছিলেন সমর দাস। ওই সময় অনেক গানে তিনি সুর করেন। তাঁর সৃষ্ট সুরে বহু গান জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সেসব গান গেয়ে অনেক শিল্পী সঙ্গীত জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তার সুর করা গান যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সুর করা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’, ‘চিরদিন আছে মিশে’ এবং ‘ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা’ গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন প্রেরণা জুগিয়েছে তেমনি দেশবাসীকে দারুণভাবে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সুরবিন্যাস করে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ মূল গানটি বিবিসি লন্ডন থেকে সামরিক ব্রাশব্র্যান্ডে রেকর্ড করার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন সমর দাস। আজ তার ৮৬তম জন্মবার্ষিকী। বিখ্যাত বাংলাদেশী যন্ত্রশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা


১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে নবদ্বীপ বসাক লেনে এক সঙ্গীতশিল্পী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সমর দাস। তার পিতা পিতা জিতেন্দ্রনাথ দাস এবং মাতা কমলিনী দাস। পারিবারিকভাবে সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠেন সমর দাস। তিনি প্রথমে প্রথমে পিতার কাছে বেহালা বাদন শেখেন পরে নর্থ ফিল্ড নামক এক মিশনারীর কাছে শেখেন পিয়ানো, গিটার এবং বাঁশি। সেই সঙ্গে অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গীতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। অল্প বয়সেই গিটার ও পিয়ানো বাজানোর জন্য তার চারদিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্রে বংশীবাদক হিসেবে সংগীত জীবনের সূচনা করেন এবং কালকাতা বেতারসহ কলকাতা এইচ.এম.ভি গ্রামোফোন কোম্পানিতেও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এ গ্রামোফোন কোম্পানিতে তিনি কমল দাসগুপ্ত, অনুপম ঘটক, কালিপদ বসু প্রমুখ সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পীর সান্নিধ্য লাভ করেন। এ প্রখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্য সমর দাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে ঢাকা কেন্দ্রিক নাগরিক সঙ্গীত ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার সমরদাসের অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বেতারে এবং ১৯৬১ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে রেডিওর নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনি কিছুকাল করাচীতে পিআইএ সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গীত বিভাগের প্রধান ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠলে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত কাজ করেন। রেডিও-টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য বাংলা গানের সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর খেকে পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান পরিচালক ছিলেন। এ সময় বহু গানে তিনি সুর দেন। তার সুর করা গান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও দেশবাসীকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রধান সঙ্গীত সংগঠক ও সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা ছিল সমর দাসের সঙ্গীতে বহুমুখী পারদর্শিতা অর্জনের এক উজ্জ্বল ভূমিকা। এছাড়ও শিল্পকলা একাডেমীসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সমর দাস। শিল্পীদলের সদস্য ও দলনেতা হিসেবে তিনি নানা দেশে ভ্রমণ করেন।


সঙ্গীত পরিচালনায় সমর দাসের কৃতিত্বের কথা স্মরণীয় তেমনি বাংলা ছায়াছবির সংগীত পরিচালক হিসেবেও সমর দাসের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মুখ ও মুখোশ, লটারী, মাটির পাহাড়, আসিয়া, গৌরী, ধীরে বহে মেঘনা, রাজা এলো শহরে প্রভৃতি ছবির সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। নদীর সন্তান, নবারুণ, বীরাঙ্গনা সখিনা, সোনার সবুজ গাঁয়ে ছবির নৃত্যনাট্যের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। লাহোরে অনুষ্ঠিত আফ্রোএশিয় সঙ্গীত সম্মেলনে (১৯৬৪) উপস্থাপিত সোনার সবুজ গাঁয়ে নৃত্যনাট্যের প্রযোজনা ও সঙ্গীত পরিচালনা এবং লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ উৎসবে (১৯৬৬) সানস অব রিভার নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয় সমর দাসের পরিচালনায়। সমর দাসের মধ্যে মানবিক গুণেরও পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালে বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হলে দুর্গত মানুষকে সহায়তা করার জন্য পল্টন ময়দানে কাঁদো বাঙালি কাঁদো নামে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমর দাস ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৭২ সালে কলকাতার এইচ.এম.ভি কোম্পানি বাংলাদেশের ‘হূদয় হতে’ নামে একটি লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশ করে যাতে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ২৬টি গান। সমর দাস ছিলেন এ রেকর্ডের সঙ্গীত পরিচালক। তিনি ১৯৭২ সালে বিবিসিতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের অক্রেস্ট্রেশন রেকর্ড করে আনেন। নবগঠিত বাংলাদেশ বেতারের সিগনেচার টিউন বা সূচনা সঙ্গীত সমর দাসের কম্পোজ করা। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ নামে দুটি এল.পি ডিস্ক প্রকাশ করার উদ্যোগ নিলে একজন সংগঠক ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সমর দাস সেটাকে সফল করে তোলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় সাফ গেমসের সূচনা ও সমাপনী সঙ্গীত তিনি রচনা করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক এবং ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।


২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পরলোক গমন করেন সমর দাস। মৃত্যুর পরে তাঁকে ঢাকার ওয়ারীস্থ খৃষ্টান গোরস্খানে সমাহিত করা হয়। সংঙ্গীত জীবনের সংগ্রামের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় তিনি সৃষ্টি করেছেন অজস্র গান। সমর দাশ নেই, তার গান আছে। এখনো গাওয়া হয় সেইসব গান। কিন্তু যিনি এসব কালজয়ী গানের স্রষ্টা, তাকে সেইভাবে আমরা কী স্মরণে রেখেছি? কেউ মনে রাখুক বা নাই রাখুক যতোদিন বাঙালি থাকবে, যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততোদিন স্বাধীনতার গান বেঁচে থাকবে আর পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার মতোই সমর দাসও যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। মুক্তিযোদ্ধা-শব্দসৈনিক সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৫৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×