somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাঙালী মুসলিম মহিলা কবিদের অন্যতম কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার ১০৯তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক জাগরণে নারীর অবস্থান যাঁরা নিশ্চিত করেছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। এক্ষেত্রে স্বনামধন্যা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামাল-এর পর্যায়ভুক্ত ছিলেন তিনি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত না হলেও সৃজনশীল মন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মনন দিয়ে তিনি স্বকালের স্বসমাজে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি মুখ্যত কবিতাই লিখেছেন। স্বভাবজাত প্রেরণায় মাহমুদা খাতুন অনবরত কবিতা লিখেছেন এবং সেগুলি সমকালীন সাময়িক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাব্যপ্রতিভা হয়তো তাঁর কর্মখ্যাতির সমতুল্য ছিল না, কিন্তু নিষ্ঠা ও প্রয়াস তাঁকে রবীন্দ্রানুসারী কবিদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট আসনে সমাসীন করেছে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার মুসলিম নারী কবিদের মধ্যে ইতিহাসে যাঁরা অমরত্ব লাভ করেছেন কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা তাঁদের মধ্যে অন্যতম যিনি সরাসরি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। মাহমুদা খাতুন ধার্মিক ও কলকাতার পীর সাহেবের মুরিদ হওয়া সত্বেও কুসংস্কার, পর্দা, অশিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন সব সময়। মুসলিম বাঙালী মহিলা কবিদের মধ্যে তিনিই প্রথম সনেট ও গদ্য ছন্দে কবিতা লিখেছেন। আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার প্রথম কাব্যগ্রন্থ পসারিণী প্রকাশিত হয়েছিল। তার পরশমনি কাব্যগ্রন্থের পূর্বে আর কোন বাঙালী মুসলিম মহিলা কবির কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। ১৯০৬ সালের আজকের দিনে পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। আজ তার ১০৯তম জন্মবার্ষিকী। কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার জন্মবার্ষিকীতে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।


মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ১৯০৬ সালেল ১৬ ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছয় বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মাহমুদা ছিলেন দ্বিতীয়। কৈশোরে রচিত কবিতা ও রূপকথায় তাঁর নাম পাওয়া যায় শ্রী রকিবননেছা মহম্মদা খাতুন। তাছাড়া সে সময়ে তাঁর ডাক নাম ছিল বাতাসী। তাঁর পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়া জেলার নিয়াজতবাড়ি গ্রামে। তার পিতার নাম খান বাহাদুর মহম্মদ সোলায়মান। তিনি ছিলেন ডিভিশনাল ইস্কুল ইন্সপেক্টর। পিতার চাকুরীর সুবাদে তিনি রাজশাহী মিশন স্কুল, বরিশাল ও পাপনায় শিক্ষা লাভ করেন। তবে তার প্রদিষ্ঠানিক শিক্ষার শেষ ধাপ ছিলো ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। রাজশাহী মিশনারী স্কুলে পড়ার সময় তার গৃহ শিক্ষক ছিলেন আনোয়ারা উপন্যাসের প্রখ্যাত লেখব মোহাম্মদ নজিবর রহমান। ১৯২৮ সালে মাহমুদা খাতুন হাইজিনে ডিপ্লোমা এবং রন্ধন প্রণালীতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। ছবি আঁকা ও সঙ্গীতের প্রতিও ছিলো তাঁর বিশেষ ঝোক। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালজয়ী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে ছিলো তার ব্যক্তিগত পরিচয়। ১৯৩৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের পক্ষ থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যাকে 'ডক্টর অফ লিটারেচার' উপাধি দেওয়া উপলক্ষ্যে যশোর সাহিত্য সংঘ কর্তৃক দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মান পত্রটি পাঠ করেছিলেন কবি মাহমুদা খাতুন। এ ছাড়াও ১৯৩৭ সালে তিনি কলকাতা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দান করেন।


বাঙালী মুসলিম মহিলা কবিদের অন্যতম কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় কবিতা লিখে পরিচিতি লাভ করেন। এসময় পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকলে অত্যন্ত অল্প সময়েই তাঁর কবি প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। প্রকৃতির রূপবৈচিত্র তাঁর কবিতায় প্রানের স্পর্শ লাভ করেছে। মাহমুদা খাতুনের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি। পশারিণী (১৩৩৮), মন ও মৃত্তিকা (১৯৬০) এবং অরণ্যের সুর (১৯৬৩) তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কবিতায় মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার আন্তরিক প্রকাশ ঘটেছে। কবিতা ছাড়া কিছু প্রবন্ধ ও ছোটগল্পও তিনি রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী ১৯৬৭ সালে তাকে একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে বর্তমান প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে 'যুক্ত' প্রকাশ করেছে "নির্বাচিত কবিতা সংকলন" মাহমুদা খাতুন সনেট এবং গদ্যছন্দেও কিছু কবিতা রচনা করেছেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং মানুষ ও সমাজ তাঁর কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে। কখনও সাময়িক প্রসঙ্গ হয়েছে তাঁর কবিতার বিষয়বস্ত্ত। দুই মহাযুদ্ধের তান্ডবলীলা তাঁকে শান্তির অনিবার্যতায় আস্থাশীল করেছে। তাই শান্তির স্বপক্ষে তিনি আহবান জানিয়েছেন উদাত্ত কণ্ঠে। যেহেতু তাঁর কাছে কবিতা ছিল ‘হূদয়ের বিশুদ্ধ উচ্চারণ’, সেহেতু তাঁর নিজের কবিতাও ছিল মৌলিক এবং এক প্রশান্ত গতিপথে প্রবহমান।


মাহমুদা খাতুন বহু সাহিত্যসভায় অংশগ্রহণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাজী নজরুল ইসলাম-এর স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগও তাঁর ঘটেছিল। সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবনযাপন তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আজীবন কুমারী মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ১৯৭৭ সালের ২ মে ঢাকায় মৃত্যুৃবরণ করেন। আজ কবির ১০৯তম জন্মবার্ষিকী। কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার জন্মবার্ষিকীতে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:১১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গত ৪৮ ঘণ্টায় সামু'র সর্বোচ্চ পঠিত ২ ব্লগার হচ্ছেন - অপলক এবং সৈয়দ কুতুব

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১৭

গতকাল রাত ৮টা ১২ মিনিট থেকে এখন রাত ৯ টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত সামুতে পোস্ট এসেছে মোট ১৬টি, আমার এই পোস্টটি ছাড়া।
এই পোস্টগুলোতে উত্তর ও প্রতিউত্তর মিলিয়ে কমেন্টেসের সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একদিন আমরা ক’জনা মিলে …….

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১২



ব্লগের একাধারে নম্র ও প্রাজ্ঞ এবং গবেষক সহ-ব্লগার শ্রদ্ধেয় ডঃ এম এ আলীর “ব্লগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত আবেদন”... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে-----

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৪



জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় ..।

দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে
যেদিন মানুষ নিজের কাছে
মিথ্যে বলা বন্ধ করবে
অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে
সত্যের পথে দৃঢ় পায়ে চলবে।

যেদিন বিবেক জাগবে মনে
লোভ হারাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার কি ইউনূস সাহেবকে ভয় পাচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৩


ব্যাপারটা এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বর্তমান সরকার, সবাই যেন একজন কমন করফাঁকিদাতা খুঁজে পেয়েছে। সেই করফাঁকিদাতার নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×