somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"যাহা সত্য তাহা বলিব । সত্য বই মিথ্যা বলিবনা "

০৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৩:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সত্য সুন্দর। সত্য কল্যাণকর। 'সত্য মানুষকে মুক্তি প্রদান করে আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে'। চিরন্তন এই বাণীটি জানেন না এমন মানুষ হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই বাণীটিকে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন এমন মানুষের সংখ্যা খবুই কম। সত্য কথা বলা ও সৎভাবে জীবনযাপন করা মহৎ মানুষের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা কথা বলা ও অসৎ জীবন যাপন করা অসৎ মানুষের লক্ষণ। সত্যবাদিতা হলো ঈমানের পূর্ণতাদানকারী একটি মহৎ গুণ। ইসলামের দাবি হলো সততানির্ভর জীবন, যে জীবনে থাকে না কোনো অসত্যের চিহ্ন। সত্যবাদিতা নির্ভেজাল ও নির্মল ঈমানের জন্ম দেয় এবং সত্যবাদী ব্যক্তিরাই প্রকৃত অর্থে দুনিয়া-আখিরাতে সফলকাম হয়ে থাকে। সত্যবাদী-সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তিরাই আল্লাহর ওপর যথোপযুক্ত তাওয়াক্কুল ও ভরসা রাখে দুর্যোগ ও দুর্ভোগের সময় ধৈর্যের পরিচয় দেয় স্বচ্ছলতার সময় ঐকান্তিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সত্যবাদীরাই কল্যাণকর কাজে পরস্পরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং অকল্যাণকর কাজে তারা হয় প্রতিবাদী-বিদ্রোহী। এ সব কারণেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া ও আল্লাহ-ভীতি ও সত্যবাদী লোকদের সংস্রব অবলম্বন করার জোর নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেঃ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক’ (সূরা আত-তাওবাঃ ১১৯)।

সত্য কথা বলা, সত্যের সঙ্গে থাকা এবং মিথ্যার পরিবর্তে সত্যকে গ্রহণ করাই সত্যবাদিতা। সত্য মানুষকে মুক্তি প্রদান করে, পক্ষান্তরে মিথ্যা বিভ্রান্তিসহ নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। সত্যবাদিতা কেবল একজন মানুষের ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক পরিমণ্ডল, সামাজিক পরিণ্ডল; এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।সত্যবাদিতা কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাগতিক যেকোনো মানদণ্ডের বিচারে এটি একটি ভালো গুণ। সত্যবাদী মানুষকে সবাই ভালোবাসে, চাই তিনি মুসলমান হোন কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী। কালো হোন কিংবা সাদা। হোন তিনি উঁচু বংশীয় কিংবা সাধারণ কোনো বংশের সদস্য। আলোকিত একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা প্রথম ও প্রধান গুণ হিসেবে বিবেচিত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সত্য কথা বলা, সত্যের পক্ষে অবস্থান করা এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ মহান পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে ও নবীজি (সাঃ) বাণীর মাধ্যমে যেসব ভালো গুণাবলিকে আয়ত্ত করতে জোর নির্দেশ প্রদান করেছেন, তার মধ্যে প্রথম সারির গুণ হলো 'সত্যবাদিতা'।
সততা ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে কুরআন মাজীদে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে। সত্যবাদী ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন মজিদে বলা হয়েছেঃ
‘আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকার করবে। তাদের জন্য জান্নাতে রয়েছে যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নদী। তারা তাতেই থাকবে চিরকাল’ (সূরা আল মায়েদা : ১১৯)।
অর্থাৎ পার্থিব জগতে তাদের সততা পারলৌকিক জীবনে উপকারী হবে। বিচার দিবসে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি থেকে সত্যবাদিতাই তাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে। কুরআন মাজীদে হয়েছেঃ
‘এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা’ (ইউনুস : ২)।
যারা সত্যকে ধারণ করে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নেয় তাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকী বলে আখ্যায়িত করেছেন। পবিত্র কোরআনের বলা হয়েছেঃ
‘আর যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই হলো মুত্তাকী’ (যুমার : ৩৩)।

সত্যবাদিতাকে তুচ্ছ করে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন- এমন ইতিহাস পৃথিবীতে আগে ছিল না, বর্তমানে নেই এবং ভবিষ্যতেও সৃষ্টি হবে না; হতে পারে না। কারণ সত্য সব ভালো স্বভাব বা সব শুভ্রতার 'মা'। মদিনার কাফিররা মুহাম্মাদ (সা.) আনীত ধর্মকে মানতো না ঠিকই; কিন্তু সত্যবাদী একজন মানুষ হিসেবে তাঁর স্থান ছিল তাদের সবার হৃদয়ের গভীরে। সত্যবাদী মানুষ হিসেবে সবাই ভালোবাসত তাঁকে। নবীজির (সাঃ) সত্যবাদিতা এবং ন্যায়পরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন আরবের মুসলিম-কাফির নির্বিশেষে 'আল-আমিন' উপাধিতে ভূষিত করেছিল তাঁকে। তিনি ছিলেন সত্যবাদী একজন আদর্শ মানুষ। নবীজির (সা.) সত্যবাদিতাকে তৎকালীন কাফির-মুশরিকরাও স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। নবীজির (সাঃ) জীবনাদর্শ গ্রহণ করে আমাদের সত্যবাদী হওয়া উচিত। সত্যবাদী মানুষকে সঙ্গী বানানো প্রয়োজন। সত্য একজন মানুষকে কেবল ধর্মীয় 'অর্জনে'র ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখে, ব্যাপারটা কখনোই এমন একপক্ষীয় নয়। সত্যবাদিতা প্রতিটি মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ এবং ঝামেলামুক্তভাবে বসবাস করতে সহযোগিতা করে।

একজন সত্যবাদী মানুষের সংস্পর্শ ধীরে ধীরে সত্যের পথে ধাবিত করবে, পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদী একজন মানুষের সংস্পর্শ মিথ্যার দিকেই পরিচালিত করে। এই মর্মে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেন, 'হে ইমানদাররা. আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও। (সুরা আত্-তাওবা, আয়াতঃ ১১৯)
সত্যকে গ্রহণ করা এবং সত্য কথার বিজয়ী অবস্থানের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেন, '(হে নবী) বলো, সত্য এসেছে আর মিথ্যা অন্তর্ধান করেছে। মিথ্যাকে অন্তর্ধান করতেই হবে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৮১)
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, 'সত্যবাদিতাকে গ্রহণ করো তোমরা, কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতের পথে পরিচালিত করে, একজন লোক সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার প্রতি অনুরাগী হয়, ফলে আল্লাহর কাছে সে সত্যবাদী হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে যায়'। [মুসলিম]
একই বাণীটি হাদিসের অন্য গ্রন্থে একটু আলাদাভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে মহানবী (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের সত্য কথা বলা উচিত, কেননা সত্যবাদিতা অবশ্যই পুণ্যের দিকে পরিচালিত করে, আর নিশ্চয়ই পুণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে।' এ ব্যাপারে তিনি আরো বলেছেন, 'সত্য হলো প্রশান্তির মাধ্যম এবং মিথ্যা হলো দুশ্চিন্তা বা ভয়ের উৎস।

গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সত্যবাদিতা বিদায় নিচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। সত্যবাদী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দিন দিন। সামান্য থেকে সামান্য কারণেও সত্য কথাকে ত্যাগ করছি আমরা। গ্রহণ করছি মিথ্যাকে এবং নিজের অজান্তেই জাহান্নামী মানুষের তালিকাভুক্ত করছি নিজেকে। শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদের (সাঃ) উম্মত হিসেবে যা কখনোই কাম্য নয়। মিথ্যা কেবল দুশ্চিন্তার সৃষ্টিই করে না, মিথ্যাবাদীরা দুর্বল চিত্তের অধিকারী হয়। তাই আমাদের সবাইকে মিথ্যা বলা ত্যাগ করে সত্যবাদী হতে হবে। তাই আসুন আমরা সকল ক্ষেত্রে সত্যবাদী হই। সততার পরিচয় দেই। সত্যবাদীদরে সঙ্গ অবলম্বন করি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সাদিকীনদের দলভুক্ত করুন। কথায়-কাজে-আচরণে আমাদের সবাইকে সততার পরিচয় দেয়ার তাওফীক দান করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যাশ্রয়ী হয়ে জীবনযাপনের তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে মিথ্যা থেকে হিফাযত করুন। কপটতা ও মুনাফিকী থেকে হিফাযত করুন। আমীন ।

সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৪:০৭
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যামিলি কার্ড: বিশ্বব্যাংক খুশি, আইএমএফ চিন্তিত কেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫৭


বাংলাদেশে বর্তমানে কার্ডের জোয়ার উঠেছে। আমজনতা মজা করে বলছে, চাইলাম প্রধানমন্ত্রী, পাইলাম রেফারি। খালি কথায় কথায় কার্ড দেখায়। হাসির কথা হলেও বিষয়টা আসলেই সত্যি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ অধিবেশনে গিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিদায় নানা পাটেকার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৭



৯০ দশকের শুরুর দিকের কথা, সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন বাসভবনে ফিরেছি, রুটিন মাফিক গোসল খাওয়া দাওয়া করে ঘুমোবো কিন্তু টিভি অন করে দেখি একটি সিনেমা শুরু হচ্ছে -... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×