somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক, রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা রাজশেখর বসু ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৭ শে এপ্রিল, ২০১৮ দুপুর ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিংশ শতকের সর্বাপেক্ষা সন্মানীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক রাজশেখর বসু। তিনি ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ্, যন্ত্র বিজ্ঞানী, ভাষাতাত্ত্বিক, অভিধান-রচয়িতা, ধর্মগ্রন্থ রচয়িতা, কৌতুক কাহিনীর রচয়িতা, কুটির শিল্পের প্রতিভাসম্পন্ন এক সৃষ্টিশীল লেখক। বাংলা সাহিত্যে রস রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পশুরাম ছদ্মনামে রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের গল্প লিখে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মননশীল তীক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি তার সৃষ্টির প্রধান সম্পদ। গল্পরচনা ছাড়াও স্বনামে প্রকাশিত কালিদাসের মেঘদূত, বাল্মীকি রামায়ণ (সারানুবাদ), কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসকৃত মহাভারত (সারানুবাদ), শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা ইত্যাদি ধ্রুপদি ভারতীয় সাহিত্যের অনুবাদগ্রন্থগুলিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। প্রখ্যাত এই বাঙ্গালি সাহিত্যিক ১৯৬০ সালের আজকের দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় পরলোকগমন করেন। আজ তার ৫৭তম মৃত্যুৃবার্ষিকী। বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক, অনুবাদক, রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা রাজশেখর বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

রাজশেখর বসু ১৮৮০ সালের ১৬ই মার্চ ভারতের বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দার্শনিক চন্দ্রশেখর বসু এবং লক্ষ্মীমণি দেবী। তাদের আদি নিবাস নদীয়া জেলার উনা গ্রামে। রাজশেখরের পিতা চন্দ্রশেখর বসু ছিলেন দ্বারভাঙ্গা-রাজ-এস্টেটের ম্যানেজার। রাজশেখর বসু ছিলেন তাঁদের ৬ সন্তানের মধ্যে ২য়। তার শৈশবকাল কাটে পিতার কর্মস্থল দ্বারভাঙ্গায়। রাজশেখর ১৮৯৫ সালে দ্বারভাঙ্গা রাজস্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন এবং এরপর পাটনা কলেজে ভর্তি হন ফার্স্ট আর্টস পড়ার জন্য। ১৮৯৭ সালে ফার্স্ট আর্টস পাশ করার পর শ্যামাচরণ দে’র পৌত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ১৮৯৯ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে বি.এ পাশ করেন এবং ১৯০০ সালে রসায়নে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। এর দুই বছর পরে ১৯০২ সালে রিপন কলেজ থেকে বি.এল পাশ করে মাত্র তিন দিন আইন ব্যবসা করেই বুঝেছিলেন আইনের থেকে বিজ্ঞান চর্চাই তাঁর কাছে আকর্ষনীয়। তাই বিজ্ঞান চর্চায় সাফল্য লাভের উদ্দেশ্যে আচার্য স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সাথে যোগাযোগ করেন।

১৯০৩ সালে আচার্য স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস কোম্পানীতে রসায়নবিদ হিসাবে সামান্য বেতনে নিজের চাকুরিজীবন শুরু করেন রাজশেখর বসু। স্বীয় দক্ষতায় অল্পদিনেই তিনি আচার্য স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডাঃ কার্তিক বসুর প্রিয়পাত্র হন। ১৯০৪ সালে তিনি ঐ কোম্পানীর পরিচালক পদে উন্নীত হন। একদিকে গবেষণার কাজ, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনা - উভয়ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। কেমিস্ট্রি ও ফিজিওলজির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে তিনি এক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। রাজশেখর বসুর তত্ত্বাবধানে বেঙ্গল কেমিক্যাল সমৃদ্ধশালী গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রে পরিণত হয়। দীর্ঘ তিরিশ বছর তিনি এই কোম্পানির কর্মী ছিলেন এবং অবসর গ্রহনের পরেও তিনি আজীবন এই কোম্পানির সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হলে তিনি তাতে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যহানির দরুণ ১৯৩২ সালে এখান থেকে অবসর নিলেও উপদেষ্টা এবং ডিরেক্টররূপে আমৃত্যু এই কোম্পানীর সাথে যুক্ত ছিলেন। নিয়মানুবর্তিতা ও সুশৃঙ্খল অভ্যাসের জন্য তাঁর জীবন-যাপন-পদ্ধতি কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল। রাজশেখর তাঁর সাহিত্যিক জীবন শুরু করেন ১৯২০ সালে। ১৯২২ সালে তিনি ছদ্মনাম নেন ‘পরশুরাম’ এবং একটি মাসিক পত্রিকায় ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’ নামে ব্যঙ্গ রচনা লেখেন। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি বাংলা তথা দেশের এক বিরাট সম্পদ ভান্ডার।

রাজশেখর বসুর প্রকাশিত গ্রন্থ মোট ২১টি। যার মধ্যেঃ গল্পগ্রন্থ ১। গড্ডলিকা, ২। কজ্জলী, ৩। হনুমানের স্বপ্ন, প্রবন্ধ সংগ্রহঃ লঘুগুরু, অভিধানঃ চলন্তিকিা, জ্ঞান-বিজ্ঞান সংক্রান্ত গ্রন্থঃ ১। ভারতের খনিজ, ২। কুটিরশিল্প, জ্ঞানবিজ্ঞানসংক্রান্ত গ্রন্থঃ বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ (বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ - ২), অনুবাদ গ্রন্থঃ কালিদাসের মেঘদূত উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও ১। গল্পকল্প, ২। কৃষ্ণকলি, ৩। আনন্দী, ৪। নীল তারা, ৫। চমৎকুমারী, ৬ হিতোপদেশের গল্প এবং পরশুরামের কবিতার বই। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় রাজশেখর বসু’র দু’টি ছোটগল্প নিয়ে-পরশ পাথর এবং ‘বিরিঞ্চি বাবা’ অবলম্বনে মহাপুরুষ নামে দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ কাব্যজগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন সন্মান লাভ করেন। তার প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননাঃ
১। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত জগত্তারিণী পদক
২। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যাল কর্তক সরোজিনী পদক
৩। ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত রবীন্দ্র পুরস্কার
৪। ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
৫। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার পদত্ত পদ্মভূষণ উপাধি
৬। ১৯৫৭-০৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.লিট উপাধি প্রদান
৭। ১৯৫৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডক্টরেট উপাধি প্রদান

এত পুরস্কার ও সম্মাননা পেলেও রাজশেখর বসুর পারিবারিক জীবন বিশেষ সুখের ছিল না। তাঁর মেয়ে ও জামাই খুব অল্প বয়সে মারা যান। ১৯৪২ সালে স্ত্রীও মারা যান। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখের কথা তাঁর লেখনীতে কখনোই ধরা পড়ে নি। ১৯৫৯ সালে একবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, কিন্তু লেখা একভাবেই চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালের ২৭ এপ্রিল আর একবার স্ট্রোক হয়ে ঘুমন্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হয় এই সনামধন্য লেখকের। আজ তাঁর ৫৭তম মৃত্যুৃবার্ষিকী। বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক, অনুবাদক, রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা রাজশেখর বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০১৮ দুপুর ১২:০৯
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি, যার অর্থ খারাপ বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া এবং ভালো বা সৎ মানুষকে রক্ষা করা। এটি মূলত সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×