somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

ফারাক্কা বাঁধ এখন শুধু বাংলাদেশের নয় ভারতের জন্যও মরণ ফাঁদ !!

১৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৫:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ মে মাসের ১৬ তারিখ ফারাক্কা দিবস। ফারাক্কা লংমার্চের ৪২তম বার্ষিকী। ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে ভারত কর্তৃক একতরফা গঙ্গার জল অপসারণের মাধ্যমে পদ্মা নদীকে জলশূন্য করে ফেলার বিরূদ্ধে ১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ ফারাক্কা লং মার্চ সংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের এই তারিখে ফারাক্কা অভিমুখে প্রাণঘাতী ব্যারাজ ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের দুই পাশের মানুষ, পশুপাখি, জীব-অণুজীব--অর্থাৎ দৃশ্যগ্রাহ্য বা দৃশ্যের বাইরে থাকা সকল প্রাণের রক্ষা এবং তাদের হেফাজত নিশ্চিত করবার জন্য এক অভূতপূর্ব মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী সেদিন ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও এর বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সেই সাহসী উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে আজো। তখন তিনি অসুস্থ। হাঁটতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার এই লঙ মার্চ আয়োজনে সহায়তা দিয়েছিল। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২১শে এপ্রিল এই বাঁধ চালু করার কয়েক মাসের মধ্যে এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের পরিবেশে ফারাক্কার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মাওলানা ভাসানী এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদের জন্য জাতির প্রতি আহবান জানান। এইরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই মে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখী এই অভিযাত্রা শুরু করা হয়। যদিও মাওলানা ভাসানী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে ফারাক্কা পর্যন্ত পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছিলেন তবু সরকারের পরামর্শে এই পদযাত্রা ১৭ই মে অপরাহ্নে ভারতীয় সীমান্তের কাছে কানসাটে গিয়ে শেষ করা হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ওই দিন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকণ্ঠ দিল্লির মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। শতাব্দির বার্ধক্য ও জরা উপেক্ষা করে মরণপণ মার্চারদের পয়লা কাতারে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ অজেয়-অকুতোভয়।


প্রসঙ্গতঃ ভারত সরকার ১৯৫১ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৬১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৪ সালে এসে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২১শে এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই এই বাঁধের উজান এবং ভাটিতে অবস্থিত অঞ্চলে পরিবেশ গত বিপর্যয় শুরু হয়। এই বাঁধের উজানে বিস্তীর্ণ এলাকায় পলি জমার কারণে প্রতি বছর বন্যা হয় আর ভাটির অঞ্চলে পানির অভাবে খরা হয়। পশ্চিম বঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যাপক নদীভাঙন হয় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিহার প্রদেশে প্রতি বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। বছরের পর বছর ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। আর ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পানির অভাবে পরিবেশ গত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। শুস্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে পদ্মা নদীর বুকে চর আর চর জেগে ওঠে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেবার কারণে সেই পানিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা হয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ফলে ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য আজ মহা এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পানি না পাবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী প্রবাহ, নৌ-যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য, অর্থনীতি এবং মানব বসতি। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে ফসল হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা সর্বশান্ত। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে মরুপ্রক্রিয়া চলছে। এদিকে নদীতে পানি শুকিয়ে যাবার ফলে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্ত পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যায়। ফলে নলকূপে পানি ওঠে না। পানির অভাবে রাজশাহীর বরেন্দ্র সেচ প্রকল্প আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। এ পর্যন্ত শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবার ফলে অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে এতদাঞ্চল এতদিন কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর দীর্ঘদিন যাবত যারা ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিল আজ তাদের দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে যারা ভারত বিরোধিতা বলে অভিহিত করেছিল, তাদের সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আজ ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করার জন্য আর বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজন নেই। আর ফারাক্কা বাঁধের পক্ষে কথা বলার মতো কোন যুক্তিও এর স্বপক্ষের লোকদের নেই। সুতরাং এখন উচিত ভারত বাংলাদেশের যৌথ কল্যাণের স্বার্থে ফারাক্কা বাঁধকে স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা। এটাই বাস্তবতা এবং এতেই উভয় দেশের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মানুষ যদি অজ্ঞতা এবং অহঙ্কার বশত কোন নদীর গতিপথের স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধ নির্মাণ করে এবং সেই বাঁধের মাধ্যমে পানিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে তা মানুষের জীবনে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বয়ে আনে। আজ ফারাক্কা লংমার্চের ৪২তম বার্ষিকীতে আমাদের দাবী জাতিসঙ্ঘের পানিপ্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। — মাও সে-তুং বলেছেনঃ ‘‘রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি। রাজনীতি যখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না যুদ্ধই তখন তার সমাধান দেয়।’’
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৫:১১
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুভ জন্মদিন আফীক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৩


তোর সাত বছর
কোন দিক দিয়ে গেলো
মনেই পড়ছে না;
জানিস কি অদ্ভুত সময়?
সময়ের উষ্ণভাজে
বেঁচে থাকাটাই ১ বিস্ময়!
শুভ জন্মদিনের
শুভেচ্ছাটা আরও খুশি
যেনো রঙিন ক্ষণ;
শত কষ্টের মাঝে মানুষ
হওয়াটা আনন্দাশ্রু;
মানুষের মত মানুষ হও
শুভ জন্মদিন- শুভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×