
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যকৌতুকময় অভিনয়ের দিকপাল ভানু বন্দোপাধ্যায়। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকার গাড়োয়ানদের কাছ থেকে কৌতুক অভিনয়ের প্রাথমিক প্রেরণা পেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কলকাতায় কাটালেও ঢাকার ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি গর্ববোধ করতেন। ব্যক্তিগত আচার-আচরণে এবং অভিনয়ে তিনি পূর্ববঙ্গের কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। শুধু কৌতুকাভিনেতা নয়, চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন উঁচু দরের শিল্পী। ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘দর্পচূর্ণ’ প্রভৃতি ছবিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর ধীরে ধীরে ছবির সংখ্যা বাড়তে থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘মন্ত্রমুগ্ধ’(১৯৪৯), ‘বরযাত্রী’(১৯৫১) এবং ‘পাশের বাড়ি’(১৯৫২)। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, এবং বলা যেতে পারে যে এই ছবির মাধ্যমেই ভানু দর্শকদের নিজের অভিনয়ের গুণে আকৃষ্ট করা শুরু করেন। এর পরের বছর মুক্তি পায় ‘ওরা থাকে ওধারে’। ১৯৫৮ সালটিতে মুক্তি পাওয়া অনেক ছবির মধ্যে দু’টি ছিল ‘ভানু পেল লটারি’এবং ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’।১৯৫৯-এ মুক্তি পায় ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট" এই ছবিতে ভানু নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন, বিপরীতে ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘৮০তে আসিও না’ ছবিটিতেও ভানু নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন, এবং এখানেও ওনার বিপরীতে ছিলেন রুমা দেবী।১৯৬৭ সালে ভানুর আরো একটি ছবি মুক্তি পায়, ‘মিস প্রিয়ংবদা’ যেখানে উনি চরিত্রের প্রয়োজনে মহিলা সেজে অভিনয় করেন। এখানে ওনার বিপরীতে ছিলেন লিলি চক্রবর্তী। ভানুর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। ভানুর শেষ ছবি ‘শোরগোল’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৪। পূর্ববঙ্গীয় বাংলা ভাষা নিয়ে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের নাক সিঁটকানো, ব্যঙ্গোক্তি, বিদ্রুপ, হাসি-তামাশার কমতি ছিল না। পূর্ববাংলার প্রচলিত বাংলা ভাষাকে তারা রীতিমতো উপহাস করতেন। এর ওপর বৃহত্তর ঢাকা জেলার আঞ্চলিক ভাষা তাদের পক্ষে সহ্য-হজম করা কঠিন থেকে কঠিনতর ছিল। ভানুর ঢাকাইয়া ভাষা নিশ্চিত তাদের কান গরম করে দিত। তাচ্ছিল্যের ঢাকাইয়া ভাষাকে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে উল্টো তাদেরই নাজেহাল করে ছেড়েছেন। সহজ-সাবলীল এবং সর্বজন বোধগম্যে ভানুর কৌতুকের জনপ্রিয়তা আজও আকাশচুম্বী। আজ ঢাকার ভানুর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের কলকাতায় মৃৃত্যুবরণ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায়ের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভানু বন্দোপাধ্যায় ১৯২০ সালের ২৬শে অগাস্ট বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম সাম্যময়। বাবা জিতেন্দ্রনাথ ছিলেন ঢাকার নবাব স্টেটের সদর মোক্তার। মাতা সুনীতি দেবী সরকারি শিক্ষা বিভাগে চাকরি করতেন। মাত্র বারো বছর বয়সে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বিপ্লবী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা বিপ্লবী দীনেশচন্দ্র গুপ্তের সহযোগী ছিলেন। ১৯৪০ সালে তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাকে ঢাকা কলকাতায় আসতে হয় ১৯৪১ সালে। এখানে এসে তিনি আয়রন এন্ড স্টীল কম্পানি নামে একটি সরকারি অফিসে যোগ দেন এবং বালীগঞ্জের অশ্বিনী দত্ত রোডে তার বোনের বাসায় থাকেন। বোনের বাসায় দু’বছর থাকার পর তিনি টালিগঞ্জের চারু অ্যাভিন্যু-তে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। দুটি হিন্দি ছবিসহ ভানু অভিনীত সর্বমোট চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৩১টি। ২২৯টি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন অসামান্য প্রতিভাধর সপ্রতিভ অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তার প্রথম অভিনীত ছবির নাম ‘জাগরণ’। জাগরণে তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত এক চরিত্রে রূপদান করেন। তার অভিনীত দ্বিতীয় ছবির নাম ‘নতুন ইহুদী’। এখান থেকেই তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার অভিনীত দ্বিতীয় ছবির নাম ‘নতুন ইহুদী’। এখান থেকেই তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভানু প্রায় তিনশ’ ছবিতে অভিনয় করেন। তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে ‘ভানু পেল লটারী’ এবং ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিসটেন্ট’ নামে দুটি ছবি নির্মিত হয়েছে। ১৯৫৫ সালে লেখা তার রসরচনার বই ‘চাটনী’ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯৫৬ সালে তিনি পেশাদারি রঙ্গমঞ্চে আসেন। তিনি একটি দলও পরিচালনা করতেন। জীবনের শেষ দিকে এসে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যাত্রাদলের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। নাট্যমঞ্চের শিল্পী হিসেবেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন খাঁটি বাঙাল এবং অনিবার্যরূপে আমাদেরই লোক। পূর্ববঙ্গের তো বটেই। খাস ঢাকারও। ঢাকার স্থানীয় ভাষাকে পশ্চিমবাংলাজুড়ে ছড়িয়ে ঢাকার ভানু খ্যাতিমান হয়েছিলেন। তার কৌতুক নক্শাসমূহে এবং বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের সংলাপগুলো নির্ভেজাল ঢাকাইয়া ভাষায় প্রয়োগ ও প্রচার করে নিজেকে ঢাকার ভানু রূপে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। ভানুর কৌতুকের উল্লেখযোগ্য দিকটি অসঙ্গতিকে উপহাস করা। সেটা সার্থকভাবে তিনি করেছেন। দম ফাটানো হাসিতে লুটোপুটি খেলেও ভানুর তির্যকপূর্ণ কৌতুক শ্রোতাদের বুঝতে বেগ পেতে হতো না। ভানুর কৌতুক কেবল হাসিসর্বস্ব ছিল না। তির্যক ছিল বহুলাংশে। অসঙ্গতি-অনাচারের শৈল্পিক উপহাস করেছেন কৌতুকের মাধ্যমে। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি সব ক্ষেত্রের অসঙ্গতি নিয়ে কৌতুকে তির্যক করেছেন-খোঁচা দিয়েছেন। ঢাকার ভানু কেবল পশ্চিমবাংলায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। মাতৃভূমি পূর্ববঙ্গেও জনপ্রিয় ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কৌতুক নক্শাসমূহ ভানু এল কলকাতায়, লর্ড ভানু, টেলিফোন বিভ্রাট, ভানু সদানন্দ, নব রামায়ণ, ঘাতক সংবাদ, কর্তা বনাম গিন্নি, কর্তা বাবুর দেশ ভ্রমণ, হনুমানের নগর দর্শন, কলকাতা ও ভদ্রতা, চাটুজ্যে-বাড়ুজ্যে ইত্যাদি। ভানুর অভিনয় শৈলী, অভিব্যক্তি, বাচনভঙ্গি, কণ্ঠস্বর সব মিলিয়েই হাস্যকৌতুকের দিকপাল ভানু। দর্শক-শ্রোতাদের কখনও সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর বৃথা চেষ্টা তিনি করেননি। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এত অসুস্থ হলেন যে, সিএমআরআই-এ ভর্তি করতে হল ভানুকে। সে বার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলন ভানু। তবে মার্চের ৪ তারিখ আবার অসুস্থ। বুকে অসহ্য ব্যথা। এ বারও হাসপাতালে ভর্তি না করে উপায় নেই। তবে বাইরে থেকে দেখে বোঝে কার সাধ্যি! সোজা হেঁটে হেঁটে গাড়িতে উঠলেন কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ মাত্র ৬২ বছর বয়সে মানুষকে নির্মল আনন্দে মাতিয়ে রাখার অসামান্য দক্ষতার অধিকারী ভানু বন্দোপাধ্যায়ের জীবনাবসান ঘটে । আজ কৌতুকের দিকপাল ঢাকার ভানুর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায়ের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০২০ বিকাল ৪:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



