somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

ঔপন্যাসিক, কবি ও সমাজ সেবিকা অনুরূপা দেবীর ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৯ শে এপ্রিল, ২০২০ বিকাল ৫:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাঙালি সাহিত্যিক, কবি ও সমাজসেবিকা অনুরূপা দেবী। তিনি ৩৩টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৯১১সালে তাঁর উপন্যাস পোষ্যপুত্র ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তিনি বিখ্যাত হন। এই উপন্যাসটি সাহিত্য সমাজে ভীষণভাবে সমাদৃত হয়। এরপর তাঁর লেখনীর স্বর্ণস্পর্শে বাংলা সাহিত্যে একাধিক জনপ্রিয় উপন্যাসের জন্ম দেয়। অনুরূপা দেবী তাঁর দিদি ইন্দিরা দেবীর অনুপ্রেরণায় সাহিত্য চর্চা আরম্ভ করেন। যে যুগে মেয়েদের পড়াশোনাকে তাচ্ছিল্য করা হত, সেই যুগে এই পরিবার থেকে উঠে আসেন দুজন লেখিকা— ইন্দিরা দেবী ও অনুরূপা দেবী।তাঁর প্রথম কবিতা ঋজুপাঠ অবলম্বনে রচিত। রাণী দেবী ছদ্মনামে তাঁর রচিত প্রথম গল্প কুন্তলীন পুরস্কার প্রতিযোগিতায় প্রকাশিত হয়। ১৯০৪ সালে তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস টিলকুঠি নবনূর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাহিত্য কর্ম ছাড়াও অনুরূপা দেবী একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি কাশী এবং কলকাতায় কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নারীর অধিকার আন্দোলনের তিনি একজন পুরোধা ছিলেন। তিনি একাধিক নারীকল্যাণ আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মহিলা সমবায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ১৯৩১ সালে উত্তর বিহার সাহিত্য সম্মেলনে কথাসাহিত্য শাখার সভানেত্রী হন। এ ছাড়াও তিনি ১৯৪৬ সালে হিন্দু কোড বিল ও ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হন। আজ সাহিত্যিক অনুরূপা দেবীর ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫৮ সালের আজকের দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঔপন্যাসিক, কবি ও সমাজ সেবিকা অনুরূপা দেবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


১৮৮২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহন করেন ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবী। অনুরূপা দেবীর পিতার নাম মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায় এবং মাতা মা দয়াসুন্দরী। পিতামহ ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ভূদেব মুখোপাধ্যায়। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চার পরিবেশের মধ্যে তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন। সময়টা ছিল মেয়েদের জন্য একেবারে অন্য রকম। নারীশিক্ষার প্রসার তেমন ঘটেনি। মেয়েদের স্থান তখনও অন্তঃপুরে। তারা জানতেই পারত না, সমাজে নারী পুরুষ সবার সমান অধিকার। এই রকম সময়েই লেখালিখি কবি, ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবীর।দাপটের সঙ্গে সংসার সামলে লিখেছেন উপন্যাস, গল্প, কবিতা। অনুরূপা দেবীর স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে যথেষ্ট অবদান থাকলেও মূলত তিনি ছিলেন মহিলা সাহিত্যিক। তাঁর চলচ্চিত্রায়িত উপন্যাসগুলির বিষয়বস্তু বিশেষভাবে মহিলাদের অবসরের আবেগঘন আলোচনা। যুক্ত হয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন নারী কল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্পে। নারীর সমানাধিকারের লড়াইয়ে প্রথম দিকের রূপকার তিনি। বাল্যকালে অনুরূপা দেবী পিতামহ ভূদেব মুখোপাধ্যায় এর কাছে সংস্কৃতি শিক্ষা ও বাংলা সাহিত্যিচর্চার প্রেরণা লাভ করেন। তার কাছে কিছুদিন দর্শনশাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। তাঁর দিদি ইন্দিরা দেবী ছিলেন একজন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং কবি। তিনি তাঁর আইন ব্যবসায়ী স্বামী শিখরনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে মজঃফরপুরে বসবাস করতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুলী লতার সাথে এখানে চ্যাপম্যান গার্লস স্কুল নামে একটি ইংরেজি স্কুল স্থাপন ও পরিচালনা করেন।


দিদি ইন্দিরা দেবীর অণুপ্রেরণা সাহিত্য চর্চায় তাকে উৎসাহ দেয়। ‘রাণী দেবী’ ছদ্মনামে গল্প লিখে কুন্তলীন পুরস্কার জিতে নেন অনুরূপা দেবী। ১৩১১ বঙ্গাব্দে (১৯০৪) তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘টিলকুঠি’ প্রকাশিত হয় নবনুর পত্রিকায়। ১৩১৯ বঙ্গাব্দে (১৯১১) ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পোষ্যপুত্র’ উপন্যাসের মাধ্যমেই তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এর পর একের পর এক উপন্যাস লিখেছেন— ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘মা’, ‘মহানিশা’, ‘জ্যোতিহারা’, ‘বাগদত্তা’, ‘পথের সাথী’, ‘উত্তরায়ণ’। মোট তেত্রিশটি গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। নারী নিয়ে তাঁর রচিত ‘সাহিত্যে নারী’ (১৯৪৯) বইটি নারী রচিত সাহিত্য-আলোচনার পথপ্রদর্শক। কবিতা লেখার হাতও ছিল চমৎকার। ‘ভারতী’ পত্রিকার পৌষ ১৩১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘দেবদূতের প্রতি রাজা অরিষ্টনেমি’। ঝোঁক ছিল পরীক্ষামূলক রচনা, বা একই লেখার রূপান্তরের দিকেও। নিজের কয়েকটি উপন্যাস নাটকে পরিবর্তিত করেছিলেন। স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘মন্ত্রশক্তি’, বিখ্যাত নাট্যকার অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রূপদানে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি পণপ্রথা, বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তুলেছিলেন। এ দিক থেকে দেখলে তিনি এক জন সমাজ সংস্কারকও। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতার সঙ্গে একযোগে মুজফ্‌ফরপুরে ‘চ্যাপম্যান গার্লস স্কুল’ নামের ইংরেজি স্কুল শুধু স্থাপনাই নয়, পরিচালনাও করতেন। যুক্ত ছিলেন কলকাতা ও কাশীর কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গেও। ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন যে নারীদেরও আছে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অনেক আগেই। নারী কল্যাণের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ শুরু করেন, প্রতিষ্ঠা করেন একাধিক আশ্রম। ১৯৩০-এ মহিলা সমবায়ও তৈরি হয় তাঁর দক্ষতায়। পরের বছর উত্তর বিহার সাহিত্য সম্মেলনে কথাসাহিত্য শাখার সভানেত্রী হয়েছিলেন। সরব হয়েছিলেন ১৯৪৬-এর হিন্দু কোড বিল আন্দোলনেও।


ব্যক্তিগত জীবনে মাত্র দশ বছর বয়সে উত্তরপাড়ার শিখরনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় অনুরূপা দেবীর। বিহারের মুজফ্‌ফরপুরে শুরু হয় সংসার জীবন। দুটি সন্তান হয়, একটি পুত্র এবং একটি কন্যা। শিখরনাথ অবসরে পড়তেন দেশ-বিদেশের সাহিত্য; সাহিত্য নিয়ে আলোচনা খুব পছন্দ করতেন। স্ত্রীকেও লেখালেখির ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। জীবন তাঁকে দু’হাত ভরে দিয়েছে, নিয়েওছে বড় কঠিন ভাবে। ১৯৩৪-এ মুজফ্‌ফরপুরের ভূমিকম্পে মৃত্যু হয় তাঁর কন্যার। ভূমিকম্পে তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত। সব-হারানো মানুষের কান্না মোছাতে তৈরি করেছিলেন ‘কল্যাণব্রত সঙ্ঘ’। অনুরূপা দেবীর শেষ জীবন কেটেছিল রানিগঞ্জ শহরে। নাতি অংশুমান বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেখানে এক সংস্থার উচ্চপদাধিকারী। প্রায়ই দেখা যেত বাংলোর বারান্দায় বসে রোদে চুল শুকোতে শুকোতে বই পড়ছেন বা লিখছেন এক বৃদ্ধা। মাঝে মধ্যে পানের বাটা থেকে পান খাচ্ছেন। তিনিই ছিলেন মৃত্যুবরণ করেন ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবী। ১৯৫৮ সালের ১৯ এপ্রিল রানিগঞ্জেই মৃত্যুবরণ করেন কবি ও সমাজ সেবিকা অনুরূপা দেবী। অসমাপ্ত থেকে যায় ‘জীবনের স্মৃতিলেখা’ রচনাটি। নারীর অধিকার রক্ষায় অগ্রণী সাহিত্যিক অনুরূপা দেবীর ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ঔপন্যাসিক, কবি ও সমাজ সেবিকা অনুরূপা দেবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক লিংক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০২০ বিকাল ৫:২২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরীচকাি ও নক্ষত্র

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১০


মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছে নিল। তারপর সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল, "নীল, আমি প্রেগন্যান্ট!"
আমি তখন চায়ের কাপে সবেমাত্র একটা অসতর্ক চুমুক দিয়েছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×