
আজ ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। সারা বিশ্বে এ দিনটিকে বলা হয় ‘আর্থ ডে’। পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বসবাসযোগ্য রাখতে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ দিবস পালিত হয়। আজকের দিনে আমাদের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ প্রভৃতি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সবসময় বিষয়টি এমন ছিল না। ’৬০ এর দশকে পরিবেশ দূষণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে মাটি, পানি, বায়ু সবকিছুই দূষিত হয়ে পড়ছিল। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হচ্ছে, তখন এই দূষণ প্রতিকারের জন্য কোন আইন পর্যন্ত ছিল না! এমন এক সময় ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে তেল উপচে পড়ে বিশাল দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। জলবায়ু সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এই ঘটনাটি দেখে উইসকন্সিনের সিনেটর গেলর্ড নেলসন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। এর মধ্যেই দিয়েই শুরু হয় বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানজনক বেসামরিক খেতাব, “প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম” লাভ করেন। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়। এরপর ১৯৯০ সালে ধরিত্রী দিবসকে একটি নতুন মাত্রা দেয়া হয়। সে বছর থেকে ডেনিস হেয়েসের উদ্যোগে ধরিত্রী দিবস বিশ্বব্যাপী পালন করা শুরু হয়। সে বছর ১৪১ টি দেশে দিবসটি পালিত হয়। বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। তাই ধরিত্রীকে রক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে।পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালিত করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল। তাছাড়া, ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনেও ধরিত্রী দিবস প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং অন্যান্য ১২০ সংখ্যক দেশ দ্বারা এক দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ধরিত্রী দিবস এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সারা বিশ্বে এক বিলিয়নেরও অধিক মানুষ দিবসটি পালন করে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ক্লাইমেট একশন’। পরিবেশ এবং প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে ধরিত্রীকে টিকিয়ে রাখাই এই দিবসটির লক্ষ্য। ২০২১ সালে ধরিত্রী দিবসের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপিত হবে। সেই লক্ষ্যে ভবিষ্যতের জন্য কিছু নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তুত করার কাজ বর্তমানে চলছে। আশা করা হচ্ছে যে, দিবসটির ৫০ বছর পূর্তিতে পরিবেশ রক্ষার এই আন্দোলন নতুন প্রাণ পাবে।

এ বছর এমন সময় ধরিত্রী দিবস পালন হচ্ছে, যখন সমস্ত পৃথিবী কোভিড-১৯ এর করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত। প্রকৃতি আসলে নিজের শুন্যস্থান নিজেই পূরণ করে নেয়, কারো জন্যে অপেক্ষা করে না। ধরিত্রীকে অর্থাত্ প্রকৃতিকে আমরা আমাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়েছিলাম। পরিবেশ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণবিদগণের আবেদন নিবেদনে কেউ কর্ণপাত করেনি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আর বন্যপ্রাণী বানিজ্য ঠেকানো বিশ্ব নেতাদের জন্য খুব কঠিন কিছু নয়। আজ সমগ্র পৃথিবী অসীম বাজেট নিয়ে কোভিড-১৯-এর প্রতিষেধক বানাতে হন্যে হয়ে উঠেছে অথচ শিক্ষা নেবার দরকার ছিল ইতিহাস থেকে। বন বন্যপ্রাণীর জন্য। সেখানে বন্যপ্রানীরা নির্ভয়ে চলাচল করবে মানুষের নাগালের বাইরে ফলে তাদের সংস্পর্শে আসার কথা নয় আমাদের। মানবজাতি এখন খাদ্যের জন্য শিকারের উপর নির্ভরশীল নয়। হরেক রকম প্রোটিন মানুষের হাতের নাগালে ফলে বন্যপ্রাণী থেকে প্রোটিন আহরণের বিন্দুমাত্র কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। শুধুমাত্র বিকৃত রুচির কারণে পৃথিবীর খুবই সামান্য কিছু মানুষ বন্যপ্রাণীদেরকে খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে মহামারীকে ডেকে নিয়ে আসছে। সবারই পুরো পৃথিবী ও পরিবেশের দিকে বাড়তি ও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। আমাদের চারপাশের পরিবেশের খুবই নাজুক অবস্থা। বাংলাদেশের বায়ু সবচাইতে বেশী দূষিত। যা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পেছনের সব রেকর্ড। নতুন শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ধরিত্রী দিবসে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। সে বছর প্রায় ৫০০০ পরিবেশবাদী সংগঠন ১৮৪ টি দেশে কাজ করে ধরিত্রী দিবসকে সফল করার জন্য। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি সার্বজনীন চুক্তি সই করতে ব্যর্থ হন। ফলে, ২০১০ সালের ধরিত্রী দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে বছর ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্রে ২,৫০,০০০ মানুষ নিয়ে একটি বড় সমাবেশ হয়। তাছাড়া, A Billion Acts of Green নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করা হয়। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ, প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা, মাংস কম খাওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ক্যাম্পেইনটিতে বর্তমানে ২ বিলিয়নের অধিক কার্যক্রম লিপিবদ্ধ রয়েছে। র্তমানে ধরিত্রী দিবস এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সারা বিশ্বে এক বিলিয়নেরও অধিক মানুষ দিবসটি পালন করে। ধরিত্রী দিবসের মহৎ এই উদ্যোগ সফল করার জন্য আমাদের সকলেরই কাজ করা উচিত। বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ ব্যাপারে যতটা স্বোচ্চার আমরা ঝুঁকির শীর্ষে থেকেও ততটা নই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে এক দিকে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ আন্দোলন দরকার, তেমনি দরকার নিজের দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এ ব্যাপারে সচেতন করে তোলা। এবারের ধরিত্রী দিবসে সেটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

