somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিংশ শতাব্দীর সাম্যবাদী ধারার লেখক বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণের ৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৬ ই মে, ২০২০ রাত ৯:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নির্মাতা ছিলেন আজন্ম বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণ। যাকে প্রায় অধিকাংশ মানুষ রেবতী বর্মণ নামেই জানে। তবে তার নিজ গ্রামের মানুষদের কাছে রেবতীবাবু বলে পরিচিত ছিলেন। আর আমাদের কাছে সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ বইয়ের লেখক হিসেবে পরিচিত। 'সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ' গ্রন্থের রচয়িতা ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আমৃত্যু সংগ্রামী মার্কসীয় তাত্ত্বিক। তিনি পূর্ববাংলার অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ছিল কলকাতা, বাকুড়া ও বীরভুম জেলায়। সম্পন্ন ও ব্রিটিশ শাসকদরদী পরিবারের সন্তান হলেও রেবতী বর্মন সাম্যবাদী ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রাবস্থায়। তিনি মার্কসীয় তত্ত্বে আকৃষ্ট হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। যৌবনের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে ব্রিটিশ সরকারের জেলের অন্ধকার প্রকোষ্টে। ১৯২৩-১৯২৪ সালে রেবতীমোহন বর্মণ বেঙ্গল-ভলান্টিয়ারের কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রুপের নেতৃত্ব দেন এবং শ্রীসংঘে যুক্ত থেকে কাজ করেন কলকাতা, বাঁকুড়া এবং বীরভূমে। ১৯২৭-১৯২৮ সালে ছাত্র-যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া স্বর্ণপদক বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় নিজের সম্পাদনায় বেণু নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। বেণুর প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের একটি গান প্রকাশিত হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস বিপ্রদাস-ও প্রকাশিত হয় বেণু পত্রিকায়। আজ সংগ্রামী রেবতী মোহন বর্মণের ৬৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫২ সালের এ দিনে তিনি কলকাতার আগরতলায় মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


রেবতী বর্মণ ১৯০৩ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার শিমূলকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার জন্ম সাল অনেকে ১৯০৪ বা ১৯০৫ বলেও উল্লেখ করেছেন। রেবতী মোহন ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের মাঝে চতুর্থ। তার পিতা হরনাথ বর্মণ ছিলেন একজন নামকরা আইনজীবী। ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের জন্য তিনি রায় উপাধিতে পান। ঢাকার পগোজ স্কুল এবং কুমিল্লার গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯২২ সালে কিশোরগঞ্জের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ঐ বছর প্রমোদরঞ্জন চক্রবর্তী এবং গৌরচন্দ্র মণ্ডলও তার সংগে একই নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এমএ পাশ করেন। তার আগে বিএ পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য পেয়েছিলেন জগত্তারিণী পদক এবং পদক বিক্রির অর্থ দিয়ে সহপাঠীদের নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘বেণু’ স্কুলজীবনের শেষ পর্যায়ে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ক্রমে ক্রমে বিপ্লবী স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের ওপর বিপ্লবীদের আক্রমণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রেবতীমোহনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বিনা বিচারে আটককালে তাঁকে বিভিন্ন জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়। জেলে বসে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদী দর্শন ও আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। দেউলী জেলে অবস্থানকালে অন্যান্য বিপ্লবীদের নিয়ে রেবতীমোহন বর্মণ প্রকাশ করেন The Communist ও সংহতি। জেলখানায় তিনি পাঠচক্রের মাধ্যমে বন্দিদের মার্কসবাদ-লেনিনবাদের উপর দীক্ষা দিতেন। ১৯৩০-৩৮ সালে বিনা বিচারে জেলে অন্তরীন থাকেন। দেউলী জেলে বন্দী থাকাকালীন সময় তার শরীরে কুষ্ঠরোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘ আট বছর কারা-শাস্তির পর রাজপুতনার দেউলী জেল থেকে তিনি ১৯৩৮ সালের ২১ জুলাই মুক্তি পান। এরপর তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে সম্পৃক্ত হন এবং সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্টির দায়িত্ব নিয়ে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।


১৯৩৯ সালে তিনি ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রতিষ্ঠা করেন। জেলে থাকাকালীন সময়ে তিনি সমাজ বিবর্তণমূলক অসংখ্য গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি রচনা করেন যা পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়। মার্কসবাদের প্রচার উদ্দেশে লেখালেখি এবং প্রকাশনার উদ্দেশ্যে ১৯৩৯ সালে তিনি কমরেড মুজাফফর আহমদ এবং অন্যান্যদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন সোসালিস্ট প্রকাশনী সংস্থা ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’। একই সময়ে বন্ধুদের সহায়তায় তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণ-সাহিত্যচক্র’। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ তরুণ রুশ। এছাড়াও তাঁর রচিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি (১৯৩৮), মার্কস প্রবেশিকা (১৯৩৮), কৃষক ও জমিদার (১৯৩৮), সাম্রাজ্যবাদের সঙ্কট (১৯৩৮), হেগেল ও মার্কস (১৯৩৮), ভারতের কৃষকের সংগ্রাম ও আন্দোলন (১৯৩৮), লেনিন ও বলশেভিক পার্টি (১৯৩৯), অর্থনীতির গোড়ার কথা (১৯৪৫), সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ (১৯৫২) প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। রেবতী মোহন বর্মণ উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বেলঘরিয়ায় থাকাকালীন শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। এসময়ই তার শরীরে কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পুলিশ তার উপর হুলিয়া জারি করে ও তিনি বাংলাদেশের ভৈরব উপজেলায় চলে যান। দেশভাগের পরে ১৯৫১ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তাকে বাধ্য হয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে আগরতলা চলে আসতে হয়। ১৯৫২ সালের ৬ মে তারিখে আগরতলার কাছে মৃত্যুবরণ করেন রেবতী বর্মণ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তার গ্রামের বাড়ির রাস্তায় তার নামানুসারে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করছে। আজ সংগ্রামী রেবতী মোহন বর্মণের ৬৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০২০ রাত ৯:৪৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×