somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হরি ধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৬ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হরিপদ কাপালী সাদাসিদে গোছের অতি দরিদ্র একজন মানুষ। পেশায় কৃষক। এই পৃথিবীতে অনেক মানুষই আছে যাদের শৈশব, কৈশোর বলতে কিছু থাকে না। থাকে না বাবা, মায়ের আদর-যত্ন এবং ভালোবাস, থাকে শুধু জীবন-সংগ্রাম। হরিপদ কাপালীও সেরকম একজন মানুষ।অতি দরিদ্র, নিরক্ষর গোছের মানুষটিই আবিষ্কার করেছেন বাংলা জনপদের অন্যতম প্রধান খাদ্য ধান-এর একটি উচ্চফলনশীল জাত। হরিপদ কাপালীর নাম অনুসারে এর নাম রাখা হয়েছে “হরি ধান”। স্বাধীনতার পর বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। ১৯৭১ সালের তুলনায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে গেলেও খাদ্য উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। এই কৃতিত্ব এই কৃতিত্ব ‘গণি মিয়া’ নামের যে কৃষকের কথা আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, এই কৃতিত্ব সেই অগণিত গণি মিয়ারই। তাঁরাই মাঠে মাঠে দিনবদলের এই কাব্য রচনা করেছেন। ব্রি ও ইরির দাপটে আমরা এই ঐতিহ্যের কথা ভুলেই যাচ্ছিলাম। ভুলেই বসেছিলাম আমাদের কৃষকেরাই বড় কৃষিবিজ্ঞানী আর মাঠগুলোই তাঁদের পরীক্ষাগার। আমাদের সেখান থেকে ফিরিয়ে এনেছেন হরিপদ কাপালী। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত এ কৃষক ১৯৯৪ সালে আবিস্কার করেন নতুন প্রজাতির এক ধান। তার নামের সাথে মিল রেখেই এ ধানের নামকরণ করা হয় হরি ধান। হরিধান আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে আমাদের কৃষককুলের ঐতিহ্যের কথা। হাজার জাতের ধানের সৃষ্টি আমাদের এই কৃষকদের হাতে। আজ এই মহান আবিস্কারকের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের আজকের দিনে তিনি ঝিনাইদহে মৃত্যুবরণ করেন। হরি ধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি


হরিপদ কাপালী ১৯২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কুঞ্জু লাল কাপালী এবং মায়ের নাম সরোধনী। জন্মের পরেই তার বাবা-মা মারা যান। পিতার অবর্তমানে কিশোর বয়সেই কাঁধে চাপে সংসারের দায়িত্ব। কিশোর বয়সেই সংসার কাধে নেবার কারনে তার লেখা পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ হয়নি বা দরিদ্রতা পেরে উঠতে দেয়নি। হরিপদ কাপালীর হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তবে বর্ণমালাকে ভালোবাসতেন ভীষণ। কাঠ বাঁশের তৈরি চাকচিক্যহীন এক প্রকার ঝুলন্ত বিছানার উপরে একগুচ্ছ ইংরেজী বর্ণমালা তৈরি করে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতেন কোনটা কী। জীবিকা নির্বাহ করতে কিশোর বয়স থেকেই গ্রামে গ্রামে এর ওর বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে হরিপদকে। এমনি করে একদিন কাজের সন্ধানে আসেন ঝিনাইদহের আসাননগর গ্রামে। সেখানে পছন্দ হয় সুনিতী বিশ্বাসকে। বিয়ে করে ফেলেন কিশোর বয়সেই। বিয়ের পর থেকে মৃত্যু অবধি তিনি আসাননগর গ্রামেই বসবাস করেছেন। ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে আসাননগর গ্রাম। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষেরই পেশা কৃষি, ধানের চাষাবাদ। হরিপদ এ গ্রামের একজন প্রবীণ অভিজ্ঞ কৃষক। ১৯৯২ সালের কোনো একদিন ধানের যত্ন নিতে জমিতে যান হরিপদ। এমন সময় তার নজরে আসে একটি ভিন্ন জাতের গাছের। এতগুলো জমি, এত জাতের ধানের মধ্যে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। হরিপদ আগ্রহ ভরে দেখলেন। গাছটিকে তার আগাছা মনে হল না। রেখে দিলেন, যত্ন দিলেন। কিছুদিন পরে দেখা গেল গাছটি আরও বেড়ে উঠেছে এবং মোটা তাজা হয়েছে সেটির গোছা। কিছুদিন পরে গোছায় ধান আসে। হরিপদ লক্ষ্য করেন, অন্যজাতের তুলনায় অনেক বেশি ধান হয়েছে নতুন জাতের তিনটি গোছায়। হরিপদ সেগুলো তুলে নিয়ে যান বাড়িতে। বেশ যত্ন করেন। আগন্তুক ধানগুলোকে বীজ হিসেবে তৈরি করেন। পরীক্ষামূলকভাবে আবার সেগুলো তার চাষের জমির এক কোণায় আলাদাভাবে বপন করেন। নির্দিষ্ট সময় পর নতুন জাতের সংসারে ধান আসে প্রচুর। তখন বিঘাপ্রতি বিআর-১১-এর ফলন ছিল ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মণ। কিন্তু হরিপদ কাপালীর নতুন ধানের ফলন ছাড়িয়ে গেল ২২ মণ। দৈর্ঘ্যে বেশ উঁচু, উৎপাদন বেশি, রোগ-বালাই কম, এমনকি খরচও কম এই ধানে। ব্যাপার দেখে হরিপদ অনেক বেশি পরিমাণে বীজ, চাষাবাদ এবং উৎপাদন করেন নামহীন এই আগন্তুক ধানের। পরে এই ধানের আবাদ সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। নিজের এলাকার কৃষকরা হরিপদ কাপালীর কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে ইরি ও বোরো মৌসুমে এ ধান আবাদ শুরু করে। ১৯৯৪ সালের দিকে ঝিনাইদহসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে নাম পরিচয় বিহীন এক জাতের ধানের আবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হরিধান আবিস্কারের সূত্র ধরে হরিপদ কাপালী এখন দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও একটি পরিচিত নাম।


১৯৯৬ সালে টেলিভিশনের সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার হলে বিষয়টি সারা দেশে আলোচিত হয়। পোকামাকড়, ক্ষরা ও অতিবৃষ্টি সহিষ্ণু এই জাতের ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ দেখে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বিশেষ ধরনের এই জাতের ধান চাষের ওপর ছাড়পত্র দেয়। এই ধান উদ্ভাবনের জন্য হরিপদকে বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি সংগঠন সম্মাননা ও পুরস্কার দেয়। নবম ও দশম শ্রেণির কৃষি শিক্ষা বইতে হরিপদ কাপালীর কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিজের উদ্ভাবিত এ ধানের নামকরণও হরিপদ কাপালীর নামে হরি ধান করা হয়। হরিপদ কাপালীর এ উদ্ভাবন চমকে দিয়েছে অনেককে। পাশাপাশি নিজের উদ্ভাবনকে নিজের কাছে আটকে না রেখে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। হরিপদ কাপালী তার আবিষ্কারের কৃতিত্ব স্বরূপ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, রোটারিক্লাব সহ প্রায় ১৬ টি জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হন। ২০১৭ সালের ৬ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আসাননগর গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। হরিপদ স্ত্রী, ছেলেসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। আর আমাদের অন্নের অন্যতম যোগান হিসেবে রেখে যান তার হরিধানকে। হরিপদ কাপালী বেঁচে থাকবেন কৃষকের মাঠে আর হরি ধানের মাঝে। তার উদ্ভাবনই তাকে মনে রাখবে। হরিপদ কাপালীর মতো এমন মাঠের কৃষকদের অভিবাদন। কারণ, তাদের মাঠের সে কঠিন কাজের ফলেই খাদ্যে আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ।আজ এই মহান আবিস্কারকের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী। হরি ধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:২২
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসলামী ব্যাংক - সবার ভাবী !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×