somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের ৯৫তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

১৫ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


থার্ড থিয়েটার নামক ভিন্ন ধারার নাটকের প্রবক্তা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকার। তিনি একাধারে ছিলেন নাট্যকার, নাট্য নির্মাতা, অভিনেতা ও নাট্য গবেষক। মঞ্চের বাইরে সাধারন মানুষের ভেতর নাটক'কে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম কাজ বাদল সরকারের। বাংলায় নাটকে তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষা জন্ম দিয়েছিল থার্ড থিয়েটারের৷ গত শতাব্দীর ষাট সত্তরে দশকে যখন লাতিন আমেরিকার থার্ড সিনেমা যেভাবে হলিউডি ছবিকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেদের আদলে গড়ে তুলেছিল ঠিক তখনই বাদল সরকার বাংলা নাটক নিয়ে কাজ করছেন৷ থার্ড সিনেমা যেমন একান্তভাবেই নিজেদের অর্থাৎ “লাতিনীয়” হয়ে উঠছিল ওই সময়কার সেখানকার মানুষের কাছে ঠিক তেমনই আবার বাংলায় বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারও হয়ে উঠেছিলো পুরোমাত্রায় দেশীয়। এই দেশীয় নাটক তাই সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে বোধগম্য হয়ে উঠতো। একেবারে নকশাল আমলে বাদল সরকারের নাটকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল৷ তখন সেই নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গন্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল৷ তৈরি করেছিলেন নিজস্ব নাটকের দল শতাব্দী৷ সেই সময়ের তাঁর নাটকের বার্তা দেশে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে মারাঠি ভাষায় বিজয় টেন্ডুলকার, হিন্দিতে মোহন রাকেশ এবং কানাড়ি ভাষায় গিরিশ কার্নাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নাম উঠে এসেছিল। সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলনের সময় প্রতিষ্ঠান বিরোধী নাটক রচনার জন্যে তিনি বিশেষভাবে পিরিচিতি লাভ করেন। ১৯৫১ সালে বাদল সরকার নিজের লেখা বড় তৃষ্ণা নাটক প্রযোজনা ও অভিনয়ের মাধ্যমে পা রাখেন নাট্যজগতে। ১৯৭৬ সালে তার নিজস্ব নাটক দল শতাব্দী গঠিত হয়। বাদল সরকার ৫০টির বেশি নাটক লিখেছেন। তাঁর বহু নাটকই শম্ভু মিত্রের গড়া নাট্যদল বহুরূপীতে মঞ্চস্থ হয়েছে। ভারতে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে হাবিব তনভীর, বিজয় তেন্ডুলকর, মোহন রাকেশ এবং গিরিশ কার্নাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নাম উচ্চারিত হয়। ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী এবং ১৯৬৮ সালে পেয়েছিলেন ‘সংগীত নাটক একাডেমি’ সম্মান। বাংলার তৃতীয় থিয়েটারের জনক বাদল সরকারের আজ ৯৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৫ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। থার্ড থিয়েটারের জনক বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।


বাদল সরকার ১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম সুধীন্দ্র সরকার। স্কুল ও কলেজ জীবনে তার এই নামই বহাল ছিলো। কিন্তু পরবর্তী কালে পরিচিত হয়েছিলেন বাদল সরকার নামে৷ স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে ভর্তি হন শিবপুর বেংগল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। পেশাগত দিক থেকে ছিলেন টাউন প্ল্যানার। শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তার অন্যতম সহপাঠী ছিলেন সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর টাউন প্ল্যানার হিসেবে কাজ করেছেন ভারতে ও বিভিন্ন দেশে। ইংল্যান্ড ও নাইজেরিয়াতে পেশার কাজে যান৷ আবার সাহিত্য-নাটকের প্রতি আগ্রহের জন্য বৃদ্ধ বয়েসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পারেটিভ লিটারেচার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে সেখান থেকে এই বিষয়ে এম.এ পাশ করেন তিনি৷ ১৯৫৬ সালে বাদল সরকার প্রথম নাটক ‘সলিউশন এক্স’ লেখেন। তবে এটি মৌলিক ছিল না, নাটকটি লেখা হয়েছিল ‘মাঙ্কি বিজনেস’ সিনেমা অবলম্বনে। তার পরে বাদলবাবু আরও কয়েকটি মৌলিক নাটক লিখলেও তাঁকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দেয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ই নাটকটি। এই নাটকটি বহুরূপী পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল৷ তারপর তাঁর রচিত ‘বাকী ইতিহাস’ ‘প্রলাপ’, ‘পাগলা ঘোড়া’ ‘শেষ নাই’ সবকটিই শম্ভু মিত্রের নেতৃত্বাধীন বহুরূপী গোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়৷তবে নিজের নাট্যদল শতাব্দী গঠনের পর তিনি একেবারে কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নিচে নাটক করা শুরু করেন৷ বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারের আঙ্গিক, তার প্রয়োজনীয়তা, পাশ্চাত্যে প্রবর্তিত থার্ড থিয়েটারকে বাদল সরকার বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে কী ভাবে জনপ্রিয় করেছেন। আসলে বাদল সরকারের পরীক্ষা নিরীক্ষায় থার্ড থিয়েটারের উৎপত্তি সামন্ত সমাজের সেই গুটিকয়েক শিক্ষিতের দ্বারা, যারা ভূস্বামী বা কৃষক কোন শ্রেণীর মধ্যে পড়ে না। অনেক সময় তাঁর নাটকে কোন প্লট থাকে না। চরিত্রের সুনির্দিষ্ট কোন চরিত্রায়ন নেই ফলেবাধ্যবাধতকতা নেই সুনিদিষ্ট পোশাকের৷ অভিনেতা–অভিনেত্রীরা ইচ্ছে মতো চরিত্র বাছাই করে নেন, নাটকের মাঝখানে চরিত্র বদলেরও স্বাধীনতা থাকে৷ প্রয়োজন বুঝলে দর্শকেরাও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন৷ঠিকই অংশগ্রহণ সে ভাবে আক্ষরিক অর্থে নয়, খুব জোড়ালোভাবে কিন্তু দর্শক ঢুকে পড়েন কিছু একটা করতে যা অনেকটা সিনেমার ‘এক্সট্রা’দের মতো৷ বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার আন্দোলন ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী তথা রাষ্ট্রবিরোধী৷ শহরাঞ্চলকে ভিত্তি করে তাঁর ‘ভোমা’ নাটকের পাওয়া যায় নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতিফলন৷ আবার ‘মিছিল’ নাটকে উঠে আসে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদ আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ৷


বাদল সরকারের তৃতীয় থিয়েটার তাঁরই পরিচালনা আর অভিনয়ে দেখার সুযোগ ঢাকার দর্শকদের হয়েছে। সেটা ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে। ‘উন্মুক্ত নাট্য উৎসব’ নামে ওই পরিবেশনার আয়োজক ছিল গণনাট্য সংস্থা আর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। অভিনয় স্থানটা ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম-দক্ষিণ গেটের অদূরে উদ্যানের ভেতর দিকের কদমতলার নিচে। তৃতীয় থিয়েটারের মঞ্চায়ন হয় চার দিন। ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ অক্টোবর। মঞ্চায়ন আরম্ভ করা হয় বিকেলে। ঢাকার সোহরাওয়র্দী উদ্যানের সবুজ দূর্বা ছাওয়া অঙ্গনে ২৫ অক্টোবর, শনিবার বিকেলে বাদল সরকারের তৃতীয় থিয়েটার মঞ্চায়নের সূচনা করা হয় ‘হট্টমালার ওপারে’ নাটকটি দিয়ে। এটির প্রযোজনা করে শতক দল। বাদল সরকারের এ নাটকে শিল্পীদের অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। নদীর স্রোত, গাছগাছালি, পাখির ডাক এ সবকিছুই শিল্পীরা নিপুণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জীবন্ত করে তোলেন। বাদল সরকার ৭২ বছর বয়সেও অভিনয় করছেন। ‘ভোমা’ নাটকে বাদল সরকার এ বৃদ্ধ বয়সেও দাপটে অভিনয় করেছেন ঢাকায়। ১৯৬৮ সালে সঙ্গীত নাটক আকাডেমি এবং ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী খেতাব পান তিন। ১৯৯৭ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ফেলোশীপ থেকে ভারত সরকারের সর্ব্বোচ্চ পুরষ্কার “রত্ন সদস্য” পদকে তাকে সন্মানিত করা হয়। তার নাটক সবসময়ই বহু আআলোচিত, অভিনীত হলেও তিনি শেষ দুই দশক প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন। ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১১ সালের ১৩ মে কলকাতাতে তার মৃত্যু হয়৷ বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটার তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের অন্যতম হিসেবেই বাদলবাবুকে মনে রাখবে।বাংলার তৃতীয় থিয়েটারের জনক বাদল সরকারের আজ ৯৫তম জন্মবার্ষিকী। থার্ড থিয়েটারের জনক বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৩৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহলে হাদিস বিরোধী পোষ্টে ব্লগে লাইক না থাকলেও গ্রুপে লাইক পাঁচ হাজার আটশত

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪



হাদিস প্রেমিক হলো নাস্তিক ও আহলে হাদিস। উভয় দল হাদিস দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু মুসলিমদের হেদায়াতের জন্য কাজ করি সেহেতু আমাকে আহলে হাদিস বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী ব্যাংক - সবার ভাবী !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×