somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উনিশ শতকের বাংলা ছবির হার্টথ্রব নায়িকা-গায়িকা কানন দেবীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

১৭ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


উনিশ শতকের বাংলার গুণী নারীদের মধ্যে যিনি স্বমহিমায়, স্বনামে খ্যাত -তিনি হচ্ছেন কানন দেবী। বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী কানন দেবী যিনি কানন বালা নামেও সু-পরিচিত। বাংলা ছবির প্রথম হার্টথ্রব নায়িকা-গায়িকা বলা হয় এই কানন দেবীকে। চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত দুটি মাধ্যমে তিনি ছিলেন অনন্যা। অভিনয় ও সুকণ্ঠের করণেই কাননবালা থেকে তিনি কানন দেবী হতে পেরেছিলেন-আর এজন্যই তিনি কিংবদন্তি। অতি সামন্য অবস্থা থেকে ভারতীয় চলচিত্রে কিংবদন্তী গাইয়া-নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে নির্বাক ছবি ‘জয়দেবে’ রাঁধার ভূমিকায় অভিনয় করে প্রথম পাঁচ টাকা সম্মানী লাভ করেন। বড় হয়ে কানন দেবী রবীন্দ্র সংগীতের পাঠ নেন। কানন দেবী ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি ও আধুনিক গানের সফল গায়িকা । তার কন্ঠে ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’ এবং নজরুল সঙ্গীত ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো’ এই গান দু’টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এইগুনী শিল্পী ১৯৯২ সালের আজকের দিনে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। উনিশ শতকের প্রথম মহাতারকা বাংলা ছবির হার্টথ্রব নায়িকা-গায়িকা কানন দেবীর মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


কানন দেবী ১৯১৬ সালের ২২ এপ্রিল ভারতের হাওড়াতে জন্মগ্রহণ করেন। কানন দেবীর ছিলেন একজন রক্ষিতার সন্তান। তার বাবার নাম রতন চন্দ্র দাস। জন্মের পরপরই তিনি বাবাকে হারান। বড় হয়ে জানতে পারনে, বাবা তার মাকে বিয়ে করেনি। তাঁর বাবা ছিলেন সওদাগর অফিসের একজন ছোট কেরানি। তার একটি ছোট দোকানও ছিল। কিন্তু কাননের বয়স যখন ৯ বছর তখন তিনি মারা যান। কাননের মা তখন তার ২ কন্যাকে নিয়ে এক দুরসম্পর্কের আত্নীয়ের বাড়িতে রাঁধুনী ও ঝিয়ের কাজ নেন। দারিদ্রের কারনে কানন দেবী মাত্র বার-তের বছর বয়সে ম্যাডানের স্টুডিওতে হাজির হন অভিনয় করতে। তিনি সেই বয়সে নির্বাক ছায়াছবি জয়দেবে অভিনয় করেন নায়িকা হিসেবে।কানন দেবী ছিলেন সমাজের নিচের তলা থেকে আসা শেষ বড় অভিনেত্রী। অভাবের কারণে কিশোর বয়স থেকেই তাকে পর্দায় নগ্নতার অভিনয় করতে হয়েছে। নায়ক ও পরিচালকের লোলুপতার শিকার হতে হয়েছে। কেউ হাত ধরে টানাটানি করেছে, কেউ কেউ পিঠে তাত বুলিয়ে আদর করেছে। কারো কারো কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ার তারা প্রতিশোধও নেয় তার ওপর। ১৯৩১ সালের ছবি 'জোর বরাতের' একটি দৃশ্যে নায়ক তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোটে চুমু খান যা তাকে অপমানিত ও ব্যাথিত করে।পরিচালকের নির্দেশেই নায়ক এই কাজ করেন তাকে আগে না জানিয়েই। অভিভাবকহীন নিচু ঘরের মেয়ে হওয়ায় তাকে টাকা পয়সার লোভ দেখিয়ে নগ্ন দৃশ্যে বাধ্য করা হয়। এ রকম একটি ছবি হলো 'বাসব দত্তা'। এ ছবিতে তার অনিচ্ছায় নগ্নতার প্রদর্শন ছিল। সম্ভবত সে কারণে এই ছবি সফল হয়নি। এছাড়া পরিচালকেরা তার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে টাকা পয়সার ব্যাপারে ঠকাতো।


কানন দেবীর সত্যিকারের অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৩০ সালে। ১৯৩১ সালে থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত কানন দেবী ছিলেন নায়িকা-গায়িকা। ১৯৩১ সালে পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র ‘জোর বরাতে’ নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৩৫ সালে মুক্তি পাওয়া 'মানময়ী গার্লস স্কুল' তাকে প্রতিষ্ঠা দেয় চলচ্চিত্র জগতে। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে চলার সময় কান দেবীর অভিনয় দেখতে বহু তরুণ পাগলের মতো ছুটে যেতেন সিনেমার পর্দায় তাকে স্পর্শ করতে। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পাওয়া 'মুক্তি' নামের চলচ্চিত্র তাঁকে প্রথম জীবনে খ্যাতি এনে দেয়। ৪০-এর দশকের 'পরিচয় এবং শেষ উত্তর' ছবির জন্য তিনি পরপর দু’বার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার পান। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ ছবিতে তার গাওয়া ‘মেঘ নগরের অন্ধকারে এবং কেন অকারণে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। প্রথথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে ‘মুক্তি’ ছবিতে অভিনয় করেই তিনি পেলেন তারকার মর্যাদা। তখন কলকাতার টালিগঞ্জের ফিল্ম স্টুডিওর কত শত দর্শক কানন দেবীকে এক নজর দেখার জন্য উত্তেজনা চেপে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করত। ‘স্ট্রিট সিংগার (১৯৩৮), সাথী (১৯৩৮), পরাজয় (১৯৪০), জওয়ানি কি রাত (১৯৪০), বিদ্যাপতি (১৯৩৮), সাপুড়ে (১৯৩৯) ছবিতে কানন দেবীর নাচ-গান-অভিনয় এক কথায় ছিল অনবদ্য। তার শেষ ছবি হলো ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদা দিদি (১৯৫৭)।


বহু প্রতিভার অধিকারিণী ছিলেন কানন দেবী। অভিনয়, নাচ, গান-এই তিন প্রতিভাসহ অসংখ্য গুণের সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। বিজ্ঞাপন চিত্রেও দেখা যায় কানন দেবীকে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০টি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। কানন দেবী যেসব নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেন তারা হলেন, জয় নারায়ন, হীরেন বসু, জহর গাঙ্গুলী, ধীরাজ ভট্টাচার্য, জাল মার্চেন্ট, প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়া, কুন্দন লাল সায়গল, পাহাড়ী সান্যাল, ছবি বিশ্বাস, ভান বন্দ্যোপাধ্যায় (বড়), নওয়াব, নাজাম, পরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধামোহন ভট্টাচার্য, বিকাশ রায়, কমল মিত্র, অশোক কুমার, ইফতেখার প্রমুখ। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত কানন দেবীর জন্য সবচেয়ে বেশি খ্যাতির সময় ছিল। তিনি এ সময় সম্ভ্রান্ত কানন দেবীতে পরিণত হন কানন বালা থেকে। তিনি তখন রোমান্টিক নায়িকার বদলে স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকাতেই বেশী অভিনয় করেন।১৯৪৮ সালে তিনি শ্রীমতি পিকচার্স গড়ে তোলেন যার বেশির ভাগ ছবিই ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে।এই কোম্পানীর ছবিতে তিনি কেবল অভিনয় ও প্রযোজনাই করেন নি, তিনি পরিচালনাও করেন।তার ছবির পরিচালকের একটি তিন সদস্য বিশিষ্ট দল ছিল যার নাম সব্যসাচী। তিনি তিন জনের একজন ছিলেন। সিনেমার বাইরেও তার গানের রেকর্ড ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি ওস্তাদ আল্লারাখার কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিক্ষা নেন। এছাড়াও তিনি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম,অনাদি দস্তিদার ও পঙ্কজ কুমার মল্লিকদের কাছেও তালিম নেন। তিনি আধুনিক গান ছাড়াও রবীন্দ্র সঙ্গীতও গেয়েছিলেন, যা রবীন্দ্রনাথকেও খুশি করে তুলেছিল। এ গানকে তিনি ভদ্রঘর থেকে বাংলার সাধারণ ঘরেও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। কবি গুরু রবী ঠাকুর তার গান শুনে দারুন মুগ্ধ হন। সেজন্যই ১৯৩৮ সালে কানন দেবীর প্রথম বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাম সই করা একখানি ছবিসহ একগুচ্ছ রজনীগন্ধা পাঠিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে মেজ দিদি করার সময় নেভাল এডিসি হরি দাস ভট্টাচার্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারপর ঘনিষ্ঠতা এভাবে একে অপরের প্রেমে জড়িয়ে পরেন। কয়েক মাস যেতেই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিয়ে বেশী দিন না টিকলেও কানন দেবীর দ্বিতীয় বিয়ে সুখের হয়েছিল।


কানন দেবীর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ এক প্রামাণ্য দলিল। শিল্প মাধ্যমে অসাধারণ অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ১৯৬৪ সালে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধীতে ভূষিত করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন। এইগুনী শিল্পী ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী।,বাংলা ছবির হার্টথ্রব নায়িকা-গায়িকা, উনিশ শতকের প্রথম মহাতারকা কানন দেবীর মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:৪৪
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহলে হাদিস বিরোধী পোষ্টে ব্লগে লাইক না থাকলেও গ্রুপে লাইক পাঁচ হাজার আটশত

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪



হাদিস প্রেমিক হলো নাস্তিক ও আহলে হাদিস। উভয় দল হাদিস দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু মুসলিমদের হেদায়াতের জন্য কাজ করি সেহেতু আমাকে আহলে হাদিস বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী ব্যাংক - সবার ভাবী !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×