
অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড/ফঁসি। চাঞ্চল্যকর মামলার ফাঁসি সব সময়ই আলোচনার জন্ম দেয়। তবে সব মৃত্যুদণ্ড এত বেশি আলোচিত হয় না। কোনো কোনো ঘটনা রীতিমতো আলোচনার ঝড় তোলে। ওইসব মৃত্যুদণ্ডের পেছনে থেকে যায় স্মৃতি-বিস্মৃতির নানা ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকমই আলোচিত ফাঁসির ঘটনা নিয়ে আমার আজকের আয়োজনঃ ডা.ইকবােলর পরকীয়ার বলি সালেহা। একটি আলোচিত ফাঁসি।

(ঘাতক ডাঃ ইকবাল)
বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত অন্যতম ফাঁসির ঘটনা হচ্ছে ডা. ইকবালের ফাঁসি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের কোনো ব্যক্তির ফাসি হওয়ার সম্ভবত এটা ছিল প্রথম ঘটনা। গৃহপরিচারিকার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের পরিণতিতে ডা. ইকবাল খুন করেন তার স্ত্রীকে।যৌতুকলোভী ডা. ইকবাল তার নিজের গৃহপরিচারিকার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে সংসারে নেমে আসে অশান্তি। এক সময় স্ত্রী জেনে যায় প্রিয়তম স্বামীর এসব বাজে কীর্তিকলাপ। এরপর স্ত্রী এসবের প্রতিবাদ করলে ফুঁসে ওঠেন ডা. ইকবাল। শুরু হয় স্ত্রীর ওপর নির্যাতন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালের ১৮ এপ্রিল স্বামীর হাতে নিহত হন সালেহা। যৌতুকের নির্মমতার ইতিহাসে সালেহা ও তার স্বামী ডা. ইকবালের নাম মনে পড়লে আজও মানুষের অনুভূতি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করেছিলেন তার স্ত্রী সালেহা। প্রতিবাদ করেছিলেন স্বামীর দুশ্চরিত্রের বিরুদ্ধে। সে জন্য ১৯৭৮ সালে রাজধানীর মালিবাগে সালেহাকে নৃশংসভাবে খুন করেন তার চিকিৎসক স্বামী ইকবাল।এ ঘটনায় ডা. ইকবালের ফাঁসি হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়। এই মৃত্যুদণ্ড তখন খুব আলোচিত হয়েছিল। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের কোনো ব্যক্তির ফাঁসি হওয়ার ঘটনা ছিল ওটাই প্রথম। যৌতুকের নির্মমতার ইতিহাসে সালেহা ও তার স্বামী ডা. ইকবালের নাম মনে পড়লে আজও মানুষের অনুভূতি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তবে এর জন্য অনেক খড় কাট পোড়াতে হয়েছিলো। খুনের দায় থেকে ডা. ইকবাল নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন বার বার। কিন্তু সফল হননি। এই ঘটনায় দুবারের ময়নাতদন্তেই মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তৃতীয়বারে ভিন্ন কথা। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতের গলা ও শরীরে যেসব স্থানে ধারালো ব্লেডের আঘাত রয়েছে তা নিজের হাতে করা সম্ভব নয়। শরীরে সূক্ষ্মভাবে যে পোচ দেওয়া হয়েছে তা কিছুটা বাঁকাভাবে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। খুনি যেই হোক বাম হাত ব্যবহার করেছে। এই প্রতিবেদনের পর পুলিশি তদন্তে নতুন মোড় নেয়। পুলিশ বাম হাতের বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্ত করে। আবিষ্কার করে খুনি তাদের সামনেই রয়েছে। কারণ হতভাগ্য সালেহার স্বামী ডা. মুনির একজন বাঁ-হাতি।

(সালেহা বেগম)
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সাত ভাইয়ের এক বোন ছিলেন সালেহা। সালেহার ধনাঢ্য বাবা মেয়ের শিক্ষার্জনের বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা দেননি। তিনি বিত্তবান ছিলেন। ভেবেছিলেন বিত্তের জোরেই মেয়েকে ভালো একটা পাত্রের হাতে তুলে দেবেন। আর সে লক্ষ্যেই মেয়েকে সুখী করার সঠিক উপায় হিসেবে শিক্ষিত জামাই খুঁজতে শুরু করলেন। পেয়েও গেলেন। মেয়ের সুখের গ্যারান্টির জন্য সালেহার বাবা নিজের টাকায় ইকবালকে ডাক্তারি পাস করান। সূত্র মতে, বিয়ের সময় প্রচুর যৌতুকের সঙ্গে ইকবালকে হলুদ রঙের একটি ডাটসান ১৩০ প্রাইভেটকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরের ঘটনা বড়ই মর্মান্তিক। ডা. ইকবালের দৃষ্টি ছিল পরনারীতে। অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করেছিলেন সালেহা। প্রতিবাদ করেছিলেন স্বামীর দুশ্চরিত্রের বিরুদ্ধে। ১৯৭৮ সালের ১৮ এপ্রিল। দুপুরের পর কাজের মেয়ে মনোয়ারার সঙ্গে এক লজ্জাকর পরিস্থিতিতে ধরা পড়ে যান সালেহার কাছে। প্রতিবাদ করতেই ডা. ইকবাল সালেহার চুল ধরে আছড়াতে থাকেন। এ সময় সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাজের মেয়ে মনোয়ারাও। একপর্যায়ে দরজার ডাঁসা দিয়ে সালেহার মাথায় আঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান সালেহা। এরপর ধারালো ব্লেড দিয়ে তার গলা কাটতে শুরু করেন। সে সময় গ্রেফতার হওয়া কাজের মেয়ে মনোয়ারার ভাষ্যমতে, সে নিজেও দেখেছে গলা কাটতে। বাধাও দিয়েছে। কিন্তু ইকবাল তাকেই উল্টো কয়েকটা চড় দিয়েছেন। সালেহার গলা কেটে তারা সবাই বারান্দায় গিয়ে চিৎকার করতে থাকেন। বলতে থাকেন, সালেহা আত্মহত্যা করেছেন। কে কোথায় আছো আসো। এসব নাটক ইকবাল সাজিয়ে দিয়েছিলেন বাসার সবাইকে। জবাই করে ইকবাল প্রচার চালান সালেহা আত্মহত্যা করেছেন। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরদিন ভোর ৬টায় লাশ মর্গ থেকে ইকবালের কাছেই হস্তান্তর করা হয়। রিপোর্টে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু বলে চিকিৎসকরা রিপোর্ট দেন। রিপোর্টটি ছিল ভুয়া, যা পরে প্রমাণিত হয়। ডা. ইকবাল ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার তার বন্ধু। আগে থেকে সবকিছু তারা ঠিক করে রেখেছিল। তাই সালেহার ময়নাতদন্ত করা ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। ডাক্তাররা বললেন, সালেহা আত্মহত্যাই করেছে। এটি কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। লাশের দাফন হয়। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে ঘটনাটি অত্যন্ত সন্দেহজনক মনে হতে থাকে। সন্দেহ হয় বিদেশে অবস্থানরত সালেহার এক ভাইয়ের। পত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। সালেহার পরিবার আবারও ময়নাতদন্তের অনুরোধ জানান। দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত হয়। সেখানে আবারও মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলা হয়। তৃতীয়বার আবারও ময়নাতদন্তের আবেদন জানানো হলে তা গ্রহণ হয় না। কিন্তু অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার পরিবারের সঙ্গে তখন সালেহার পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। যে কারণে আবারও ময়নাতদন্ত করার আবেদনটি গ্রহণ করার ব্যবস্থা হয়। কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে এবার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত হয়। তিন সদস্যের একটি বোর্ড ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। এবার বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি হত্যা। মাথায় আঘাত করেই সালেহাকে হত্যার পর গলায় পোঁচ দেওয়া হয়েছে।

ওই সময়ে সালেহা হত্যাকাণ্ডটি ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এ ঘটনায় দেশের মানুষ নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশে সোচ্চার হয়েছিল। পত্রিকায় তাদের অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন না হলে হয়তো সালেহা খুনের ঘটনাটি প্রকাশ পেত না। অপমৃত্যু হিসেবেই থাকত। পত্রিকায় প্রতিবেদন হওয়ার কারণেই তৃতীয় দফা ময়নাতদন্ত হয় যাতে খুনের ঘটনাটি প্রকাশ পায়। এ কারণে ইকবালের পরিবার তাদের ওপর এমন ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে, ফাঁসির রায় কার্যকরের পর ইকবালের বাসায় গেলে সাংবাদিকদের দা নিয়ে ধাওয়া করেছিল ইকবালের স্বজনরা। তারপর ওই রকম করে আর সামাজিক সোচ্চারের ঘটনা খুব একটা দেখা যায়নি। যৌতুকের নির্মমতার ইতিহাসে সালেহা ও তার স্বামী ডা. ইকবালের নাম মনে পড়লে আজও মানুষের অনুভূতি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। সালেহার মৃত্যুর পর সামাজিক সোচ্চারের কারণে ১৯৮০ সালে যৌতুকবিরোধী আইন প্রণীত হয়। তবে এখনো অনেক পরিবারেই এ ধরনের পরকীয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেককেই হতে হচ্ছে প্রতিবাদের বলি। সমাজ থেকে চিরতরে উৎপাটিত হোক পরকীয়া বিষ বৃক্ষ। নিরাপদ হোক প্রতি্টি পরিবার।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



