
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিঘাতে তছনছ গোটা বিশ্ব। দেশে দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। দেশে দেশে শোকের মাতমে ভারি হচ্ছে বাতাস। এরইমধ্যে ভারতে গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। যা দৈনিক সংক্রমণের দিক থেকে যক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে আরও চার হাজার ২৮০ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। বুধবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো করোনাবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন মৃত্যু নিয়ে দেশে মোট ১০ হাজার ৬৮৩ জনের মৃত্যু হলো। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তসহ দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৭ লাখ ৩২ হাজার ৬০ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭ হাজার ৭২ জন করোনামুক্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৩ জন। তবে সব্ চেয়ে আতঙ্কের কথা ভাইরাসটির নতুন ধরন ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট’ বা তিনবার রূপ পরিবর্তনকারী ধরন। ভারতে শনাক্ত করোনাভাইরাসের এই ধরন নিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। করোনার ‘ডাবল মিউটেশন’ (আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, এমন ব্যক্তিকেও আবার আক্রান্ত করতে সক্ষম) এর আতঙ্ক কাটিয়ে উঠার আগেই ভারতে শনাক্ত হয়েছে ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট’। কোভিড-১৯ ভাইরাসের তিনটি আলাদা স্ট্রেন মিলে তৈরি নতুন এই ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রামক ক্ষমতাও প্রায় তিনগুণ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বেশ কয়েটি রাজ্যে এরইমধ্যে ভাইরাসের ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট’ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার তিনটি আলাদা ধরন একীভূত হয়ে সৃষ্টি হওয়া ভাইরাসের এই নতুন ধরনটির সংক্রমণ ক্ষমতাও প্রায় তিনগুণ বেশি। যার কারণে ভাইরাসের নতুন ধরনে আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার অবনতিও হচ্ছে খুব দ্রুত। ইতিমধ্যে করোনা সংক্রমণে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে ভারতে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে ভারত। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার সকালে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ১৪ হাজার ৮৩৫ জন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দৈনিক সংক্রমণ।
তাদের মতে, ভাইরাসের ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ধরনটি সঠিক সময়ে শনাক্ত না হওয়ার কারণেই হয়তো ছড়িয়ে পড়েছে এই ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট’। নতুন এ ধরনটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে খুব বেশি তথ্য নেই। তবে ভাইরাস যত ছড়ায় সেটির মিউটেশনের বা রূপান্তরিত হওয়ার হারও তত বৃদ্ধি পায়। যার কারণে নতুন এই ধরনে সংক্রমিত হচ্ছে শিশুরাও।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা নতুন স্ট্রেনের কারণেই বিশ্বে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। সংক্রামক শক্তি অনেক বেশি তো বটেই। নতুন স্ট্রেনে আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার অবনতিও খুব দ্রুত হচ্ছে। তাদের মতে, ডাবল মিউট্যান্ট স্ট্রেন ঠিক সময়ে ধরতে না পারার কারণেই হয়তো অগোচরে এতটা ছড়িয়ে পড়েছে এই ট্রিপল মিউট্যান্ট। ভাইরাস যত ছড়ায় সেটির মিউটেশনের হারও তত বৃদ্ধি পায়। এই নয়া স্ট্রেনটি শিশুদেরও আক্রান্ত করছে। তবে নতুন ভ্যারিয়্যান্ট নিয়ে খুব বেশি তথ্য নেই বিজ্ঞানীদের কাছে। তাই সময় মতো লাগাম টানতে না পারলে এবার সংক্রমণ সুনামির আকার ধারণ করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আপাতত ভাইরাসের নতুন এই ধরনের বিরুদ্ধে একের পর এক টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তবে সবার আগে প্রয়োজন নিয়মিত জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ধরনটির চরিত্র বিশ্লেষণ। তবে ভাইরাসটির জিনোমে ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন, বিয়োজন- মহামারীর স্থায়িত্ব নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি তা চলমান ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইনে বড় ধরনের বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রশ্ন হলো, তৈরি হওয়া নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট কেন এতো শক্তিশালী? কেন নতুন ভ্যারিয়েন্ট টিকাগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে ফেলার হুমকি দিচ্ছে? এভাবে ভ্যারিয়েন্ট যদি তৈরি হতেই থাকে, তাহলে আগামী পৃথিবী কেমন হবে? যদিও এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা খুব কঠিন। কারণ ভাইরাসের মিউটেশন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সে কয়েকহাজার অ্যামিনো এসিডের অদল-বদল হয়েছে। আর এসব মিউটেশনের ফলে ওই প্রোটিনের ভৌত-কাঠামো এবং আণবিক সম্পর্ক পরিবর্তন ঘটেছে। যার ফলে এর কাজেও পরিবর্তন এসেছে। আগে যে জিন দশটি কোষে নিজেদের মেলে ধরতে পারতো, মিউটেশনের ফলে তার সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৫০টি কোষে। ২০১৯ সালে উহানে করোনাভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকে অনবরত এর জিনোম সিকোয়েন্স পরিবর্তিত হচ্ছে। শুরুতে স্পাইক প্রোটিনের ৬১৪ নম্বর অ্যামিনো এসিড অ্যাসপারটিক এসিডে পরিবর্তন হয়ে গ্লাইসিন বা D614G হয়েছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে (সূত্র ১)। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এ মিউটিশনটি দ্বারা বিশ্বব্যাপী মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছিল। যদিও এ মিউটেশনটি আরবিডির বাইরে ঘটেছে।২০১৯ সালে উহানে করোনাভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকে অনবরত এর জিনোম সিকোয়েন্স পরিবর্তিত হচ্ছে। শুরুতে স্পাইক প্রোটিনের ৬১৪ নম্বর অ্যামিনো এসিড অ্যাসপারটিক এসিডে পরিবর্তন হয়ে গ্লাইসিন বা D614G হয়েছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এ মিউটিশনটি দ্বারা বিশ্বব্যাপী মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছিল। যদিও এ মিউটেশনটি আরবিডির বাইরে ঘটেছে।

আমরা জানি, যেকোনও প্রোটিনের কার্যকারিতা নির্ভর করে, কাঙ্ক্ষিত প্রোটিনের সাথে তার সম্পর্ক কেমন সেটির উপর। মানে প্রোটিন-প্রোটিন ইন্টারএ্যাকশনের উপর নির্ভর করে এর কার্যকারিতা। করোনাভাইরাসের নতুন ধরনগুলোয় মিউটেশন হওয়ার কারণে, স্পাইক প্রোটিনের আভ্যন্তরীণ অ্যামিনো এসিডগুলোর মধ্যে আন্ত:সম্পর্ক এবং কনফিগারেশনে পরিবর্তন আসে। ফলে এ প্রোটিনটির আরবিডি এবং আমাদের শরীরে চামড়ায় থাকা অ্যাঞ্জিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম২ (এসিই-২) গ্রাহকের সাথে দ্রুত লাগতে পারে, এবং কোষ থেকে অন্য কোষে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। যার কারণে, এসব মিউটেশনের ভ্যারিয়েন্ট অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে করোনা ভাইরাসের উপদ্রব শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বের ২১৩ দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছরের ১১ মার্চ কোভিড-১৯ কে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে। করোনাভাইরাস তার রূপ বদলাবে, বর্ণচোরা হবে, তবে তার বর্ণ চিহ্নিত করতে হাজার হাজার গবেষক গবেষণাগারে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ভ্যারিয়েন্টগুলোর বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভ্যাকসিন অচিরেই তৈরি হবে- সেটা দুরাশা নয়। তবে এর আগে হয়তো প্রাণ-সংহার অব্যাহত থাকবে। আর এজন্য ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।
সূত্রঃ Triple mutation Covid variant in India
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০২১ বিকাল ৩:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




