
করোনা মহামারিতে থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। পুরো মানব জাতি এক অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে বিপর্যস্ত। উৎপাদন এবং চাহিদা না থাকায় অর্থনীতিতে কমেছে সাধারণ মানুষের আয়। সবকিছু বন্ধ থাকায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পাঁচ কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে। ফলে দেশে ৪২ শতাংশ মানুষ গরিব হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর অর্থনৈতিক প্রতিঘাতে দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে বলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এর জরিপে উঠে এসেছে। তারা করোনার আগে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপর থেকে ঝুঁকিতে ছিল। সানেম ২০২০ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সারা দেশে ৮ বিভাগের ৬৪টি জেলার ৫ হাজার ৫৭৭টি পরিবারের ওপর গবেষণাটি চালায়। তবে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও দেশে দ্রুতহারে বেড়েছে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ। বৈশ্বিক অর্থনীতির পঙ্গু দশায় অধিকাংশই ধুঁকছে প্রবল অর্থকষ্টে, ব্যবসায় দেখা দিয়েছে আর্থিক মন্দা, দেউলিয়া হয়ে উঠে যাচ্ছে একাধিক সংস্থা, কাজ হারিয়ে বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। এমতাবস্থায় ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী যেন কিছু মানুষের উপর তার ঝাঁপি উজার করে দিয়েছেন। ধনীরা হয়ে উঠছেন আরও ধনী। ২০২০ সালের মার্চে যখন দেশে মহামারি করোনার আবির্ভাব শুরু হয়, তখন ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫টি। বছরে দেশে নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন ১০ হাজার ৫১ জন। মহামারি করোনার বছরে দেশে নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন ১০ হাজার ৫১ জন।২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি বা তার বেশি টাকা আমানত আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৫১টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গত বছর শেষে মোট কোটিপতি ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ৯৩ হাজার ৭৯০টি। ২০১৯ সালে কোটিপতি হিসাব ছিল ৮৩ হাজার ৮৩৯টি। ২০২০ সালের কোটিপতি হিসাবধারীদের মোট আমানতের পরিমাণ ৫ লাখ ৯৫ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৫৮ লাখ ১২ হাজার ৯৬৬টি। এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৪৪ শতাংশ টাকাই তাদের দখলে। প্রতিবেদনে দেখা গেছেঃ

১ কোটি ১ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৮৭৫টি।
বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৭ হাজার ৯৫৬টি।
৫ কোটি ১ টাকা থেকে ১০ কোটির মধ্যে হিসাব রয়েছে ১০ হাজার ৪৭২টি।
এর আগে ২০১৯ সালে যা ছিল ৯ হাজার ৪২৬টি।
১০ কোটি ১ টাকা থেকে ১৫ কোটির মধ্যে হিসাব ৩ হাজার ৫০৭টি।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ হিসাবধারী ছিল ৩ হাজার ১৮৪ জন।
১৫ কোটি ১ টাকা থেকে ২০ কোটির হিসাবধারী ১ হাজার ৬৩২ জন। আগে যা ছিল ১ হাজার ৪৭২ জন।
২০ কোটি ১ টাকা থেকে ২৫ কোটির মধ্যে হিসাব রয়েছে ১ হাজার ১৩৩ জনের। ২০১৯ সালে যা ছিল ৯৯৭ জন।
২৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৩০ কোটির মধ্যে ৭২৫ জন। এর আগের বছর এ হিসাবধারী ছিল ৫৮৮ জন।
৩০ কোটি ১ টাকা থেকে ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে হিসাবধারী ৩৮৪ জন। এর আগের বছর যা ছিল ২৪৬ জন।
৩৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৪০ কোটির মধ্যে হিসাবধারীর সংখ্যা কমেছে।
ডিসেম্বর শেষে এমন হিসাবের সংখ্যা ২৯৪টি। আগের বছর এমন হিসাবধারী ছিলেন ৩৮৪ জন। গত এক বছরে
৪০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৮টি, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিল ৩৫৮টি।
এই সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৯০ জনে দাঁড়িয়েছে।
২০১৯ সাল শেষে যা ছিল ১ হাজার ২৮৩ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেনঃ সমাজে বৈষম্য ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। কোটিপতির সবাই অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করেছে এমন নয়। তবে এসব অর্থের উৎস খুঁজে দেখা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, মহামারির বছরেও কোটিপতির সংখ্যা বাড়ার এই পরিসংখ্যান সমাজে বেড়ে চলা বৈষম্যের চিত্রকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ দেশের মোট অর্থ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে পুঞ্জিভূত হয়ে আছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো ব্যাংকে যে কোনো পরিমাণ অর্থ জমা রাখলেও কোনো প্রশ্ন করা হবে না, এমন বিধান রাখা হয়েছে। এর প্রভাবেও কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই চিত্র শুধু আমাদের দেশেই নয় করোনায় বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সম্পদও বেড়েছে। কোভিড-১৯–এ সারা বিশ্ব পর্যুদস্ত হলেও বিশ্বের শতকোটিপতিরা্ মহামারিতেও তাঁদের সম্পদ বাড়িয়েই চলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব স্টাডিজ নতুন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন শতকোটিপতিদের সম্পদ বেড়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলার (এক লাখ কোটিতে এক ট্রিলিয়ন)। সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ ৩৪ শতাংশ। অথচ ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সে সময় ফোর্বস-৪০০–এর ধনীরা যে পরিমাণ সম্পদ হারিয়েছিল, তা উঠিয়ে আনতে তিনটি বছর লেগেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশির ভাগ শীর্ষ ধনীর সম্পদ বাড়লেও কয়েকজনের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে যথেষ্ট বেশি। যেমন গত ১৭ মার্চ থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমাজনের জেফ বেজোসের সম্পদ বেড়েছে ৬৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জেফ বেজোস এখন বিশ্বের শীর্ষ ধনী, যাঁর সম্পদের পরিমাণ ১৮২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে সম্পদ বৃদ্ধির দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন টেসলা ও স্পেস এক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এলন মাস্ক। করোনাকালে তাঁর সম্পদ বেড়েছে ৪১৪ শতাংশ। আর এতে তাঁর সম্পদ ২৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে এক লাফে বেড়ে হয়েছে ১২৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। তিনি এখন বিল গেটসের সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী।
সূত্রঃ
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০২১ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




