
সিরিয়াল কিলার বলা হয় সেই সকল কুখ্যাত ব্যক্তিদের যারা একের পর এক মানুষ হত্যা করেছে নিজ হাতে। নিজের রাগ, ক্ষোভ, যৌন চাহিদা, দুনিয়ার প্রতি ঘৃণা, ভালবাসায় ব্যর্থতা সহ বিভিন্ন কারণে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলাররা এই ধরনের মানুষ হত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। জাভেদ ইকবাল তেমনি এক সিরিয়াল কিলার। পাকিস্তানের ইতিহাসের বিকৃত মস্তিষ্কের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এবং কুখ্যাত এক সিরিয়াল কিলার জাভেদ ইকবাল। যিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার একজন খুনী ছিলেন। তাকে দেখে কেউ কোনোদিন ভাবতেও পারেনি, ভদ্রবেশে তিনি শিশুদেরকে বলৎকার ও হত্যা করতে পারেন! জাভেদের জীবন সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কোনো তথ্য নেই। ধারণা করা হয় ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন জাভেদ ইকবাল। তিনি বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন। তার বাবা মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন নামকরা ধনী ব্যবসায়ী। জানা গেছে, সাদামাটা জীবন ছিল জাভেদের। সুখেই জীবন কাটছিল তার। ১৯৭৮ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং কলেজে থাকাকালীন ব্যবসা শুরু করেন। খুবই ধনাঢ্য ব্যক্তি তার বাবা একজোড়া ভিলা কিনেছিলেন, যেখানে জাভেদ ইকবাল তার স্টিল-রিস্টাটিং ব্যবসায পরিচালনা করতেন। ব্যাবসায়িক জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন যৌন অপরাধে অভিযুক্ত হন তিনি। তবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই নিজেকে বের করে আনেন। কিন্তু ধর্ষণের এক মামলায় জেলে যেতে হয় তাকে। এ ঘটনায় কেঁদে কেটে মারা যায় তার মা। জাভেদ তার মাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যুতে শোকাগ্রস্ত জাভেদের মনে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। খুনের নেশা মাথায় চাপে তার। তিনি নিজের সঙ্গেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, ১০০ শিশুকে হত্যা করবেন ও তাদের মায়েদের কাঁদাবেন। জাভেদ ভয়ানক সেই প্রতিজ্ঞা পূরণে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের টার্গেট করতেন। কোনো শিশুকে একলা পেলেই তাকে প্রলোভন দেখিয়ে ভিলায় নিয়ে বলৎকারের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করতেন জাভেদ। এমনকি তিনি লাহোরের রাস্তায় ঘোরাফেরা করা দরিদ্র ছেলেদেরকেও একের পর এক ধরে এনে একইভাবে হত্যা করেন। মাত্র ১৮ মাসে সে প্রায় একশ বালককে হত্যা করে । জাভেদের ভাষ্য মতে, তার সব ক্ষোভ ছিল শিশুদের উপর। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ইকবাল শুধু ছেলে শিশুদেরকে বলৎকার করে হত্যা করতেন। তিনি কোনো কন্যাশিশুর ক্ষতি করেননি। তিনি বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ছেলে শিশুদেরকে কাছে ডাকতেন। বালকদের আকৃষ্ট করতে জাভেদ একটি ভিডিও গেমসের দোকান খুলেছিল। সস্তায় বা বিনামূল্যে গেমস খেলার টোকেন দেয়া হতো সেখান থেকে। এভাবে স্থানীয় বালকদের আখড়া হয়ে ওঠে দোকানটি। সেখানে মাঝে মাঝে মেঝেতে ১০০ রুপির নোট ফেলে রাখতো জাভেদ। এরপর ১০০ রুপি চুরি হয়েছে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে তল্লাশি করতো। এভাবে চোর সাব্যস্ত করে পাশের একটি ঘরে নিয়ে বলৎকার করতো। একের পর এক শিশুকে বলৎকার ও নির্যাতন করে নির্মমভাবে খুন করতে থাকেন। পরে অবশ্য গেমসের দোকানটি বন্ধ করে দিতে হয় জাভেদকে। এলাকাবাসীরা তাদের সন্তানদেরকে আর গেমসের দোকানে যেতে দেননি, এতে অনেক অর্থ খরচ হচ্ছিলো অবিভাবকদের। পরে ভিডিও গেমসের দোকানের ফেলা টোপ থেকে সরে গিয়ে জাভেদ একটি অ্যাকুরিয়ামের দোকান ও জিমনেসিয়াম খুলেন। এরপর জাভেদ গরিব, রাস্তায় রাত কাটানো বালকদের টার্গেট করা শুরু করে। আবার পত্রিকা মারফত পত্রমিতালি করেও বালকদের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করতো জাভেদ। এরপর নিজের বাসায় নিয়ে ওই বালকদের বলৎকার এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করতো। হত্যার পর মৃতদেহগুলোকে কেটে টুকরো টুকরো করে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ব্যবহার করে দ্রবীভূত করে ফেলতেন জাভেদ। আমেরিকান সিরিয়াল কিলার জেফ্রি ডাহারও এই অ্যাসিডের ব্যবহার করে মৃতদেহ নষ্ট করতেন। এসিডে ডুবিয়ে রাখার ফলে শরীরের অংশগুলো তরল হয়ে গেলে তিনি সেগুলোকে আবর্জনা স্তূপে ফেলে দিয়ে আসতেন। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ হয়ে যতক্ষণ না পর্যন্ত তার প্রতিবেশীরা তাকে অভিযোগ করতো ততদিন পর্যন্ত তিনি এই দেহবাশেষ পরিষ্কার করতেন না। শরীর পচে গন্ধ হয়ে গেলে তিনি সেগুলো রাভি নদীতে ফেলে দিতেন।

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে জাভেদ ইকবাল তার কৃতকর্মের কথা স্বীকার করে বিষদ আকারে একটি চিঠি লিখেন। এরপর চিঠিটি তিনি পুলিশ এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রেরণ করেন। ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ধরা দিয়েছিলেন জাভেদ। তবে সরাসরি পুলিশ স্টেশনে না গিয়ে উর্দু সংবাদপত্র ডেইলি জাঙ-এর অফিসে হাজির হন তিনি। তিনি নিজের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেননি। সেখানে গিয়ে নির্লিপ্তভাবে তিনি বলেছিলেন, আমি জাভেদ ইকবাল, ১০০টি বাচ্চার হত্যাকারী। ” I am Javed Iqbal, killer of 100 children … I hate this world, I am not ashamed of my action and I am ready to die. I have no regrets. I killed 100 children. ” তিনি তার অপরাধের বিষয়ে স্বীকারও করেন আদালতে। তিনি এই পৃথিবীকে ঘৃণা করেন, তিনি আর বাচতে চান না তিনি মরার জন্য প্রস্তুত। তিনি ১০০ জনকে হত্যা করেছেন এর জন্য তার কোনও পরিতাপ নেই। তিনি লিখেছিলেন তার ঘরে তার নিজের লেখা একটি ডায়েরী ও ৩২ পৃষ্ঠার নোটবুক আছে, যেটিতে তিনি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত লিখে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাইলে ৫০০ শিশুকেও হত্যা করতে পারতাম কিন্তু তা করিনি। এটা আমার জন্য কঠিন ছিল না। কারণ আমি চেয়েছিলাম ১০০ শিশু পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখতে। এরপর জাভেদ ইকবাল ভরা আদালতে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। এমনকি তিনি কোন শিশুদেরকে হত্যা করেছেন সে বিষয়েও তালিকা করে রাখেন। সব প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তি আদালতে জানান ইকবাল। জাভেদের দেওয়া তথ্য অনুসারে খোঁজ নিয়ে পুলিশ মাত্র দুইটি মৃতদেহের কঙ্কাল উদ্ধার করে। বিচারের রায় ১৭ বছরের সাজিদ আহমেদ ছিলেন জাভেদ ইকবালের প্রধান সহযোগী। আরও দুই যুবককেও সহযোগী হিসেবে রেখেছিলেন জাভেদ। সবাইকেই পুলিশ পরবর্তীতে গ্রেফতার করেন ১০০ শিশুকে হত্যার দায়ে।

এমন ঘটনা সামনে আসতে পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম হয়। জাভেদকেও শিশুদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেভাবে হত্যার দাবি তুলতে থাকে মানুষজন। পরে ২০০০ সালের ১৬ মার্চ বিচারপতি আল্লাহ বকশের প্রাথমিক রায়ে মানুষজনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটে। শরিয়াহ আইন মেনে তিনি রায় দেন, ভুক্তভোগীদেরকে তিনি যেভাবে হত্যা করেছেন; তাকেও ঠিক সেভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। যে চেইন দিয়ে শ্বাসরোধে ১০০ শিশুকে হত্যা করেছেন জাভেদ; সেটি দিয়েই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। এরপর তার দেহকে ১০০ টুকরো কেটে মৃত ছেলেদের অভিভাবকের সামনে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে ডুবিয়ে দেওয়া হবে। তবে বিচারকের এ রায় রায় বাস্তবায়নের আগেই ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর জাভেদ ইকবাল এবং তার প্রধান সহযোগী সাজিদ আহমেদ জেলখানায় আত্ম হত্যা করেন। এভাবেই যবনিকাপাত হয় ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার জাভেদের উপাখ্যান।
সূত্রঃ পৃথিবীর ইতিহাসের পনেরজন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার নম্বর-১৩
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মে, ২০২১ দুপুর ১২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




