
আরবী শব্দ ইস্তেকামত এর আভিধানিক অর্থ হলো দীনের উপর অবিচল থাকা, সিরাতুল মুসতাকিম এর পথে চলা । প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। দ্বিনের ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা কাম্য নয়। ইসলামের বিধান পালনের সুফল প্রাপ্তি এবং আল্লাহর পরীক্ষায় দুদুল্যমান হওয়া ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়। প্রিয় নবী (সঃ) এর ঘোষণায়, ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ইসলামি জীবন বিধানের ওপর অবিচল থাকা’ পরকালের মুক্তি লাভের উপায়। প্রকৃত মুসলমানের সব থেকে বড় কাজ ও সুমহান বৈশিষ্ট্য হলো স্বীয় দ্বীনের (ইসলামের) বিধানের ওপর অটল ও অবিচল থাকা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামের আদর্শ বাস্তবায়নে যত্নশীল হওয়া। কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে না থেকে তাঁর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণ করা। আর পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেনঃ তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৯) ।মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। আর সব সময় সঠিক পথের ওপর অটল ও অবিচল থাকা ইসলামের অনিবার্য দাবি। হোক তা মসজিদে, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, চাকরিস্থলে, হাট-বাজারে কিংবা ঘরে। সর্বাবস্থায় আল্লাহ মুমিনদের দ্বিনের ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপনে সন্দিহান হওয়া এবং সুসাব্যস্ত সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার পর আবার তা পরিত্যাগ করা ইসলাম ও ঈমানদারের কাজ নয়; বরং তা অবিশ্বাসী ও মুনাফেকি চরিত্রের লোকের কাজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেই নারীর মতো হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর তার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯২)। তাসফিরবিদরা বলেন, এ আয়াতে মহান আল্লাহ দ্বিনের ব্যাপারে অধঃপতনের নিন্দা করেছেন। বিশেষত আল্লাহমুখী জীবন পরিহার করে পুনরায় পাপের দিকে ফিরে যাওয়া আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। দ্বীন তথা ইসলামি জীবন-ব্যবস্থার ওপর অটল-অবিচল থাকা এবং তা যথাযথ পালন করতে পারা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এক বড় নিয়ামত। সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপনে সন্দিহান হওয়া এবং সুসাব্যস্ত সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার পর আবার তা পরিত্যাগ করা ইসলাম ও ঈমানদারের কাজ নয়; বরং তা অবিশ্বাসী ও মুনাফেকি চরিত্রের লোকের কাজ। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, (তাহলে তার হৃদয় ও মন) প্রশান্তি লাভ করে। আর যদি কোনো পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকাল (দুনিয়া) ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত। আর এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি।’ (সুরা হজ : আয়াত ১১)। তাই দ্বিনের ব্যাপারে দুঢ় থাকতে হবে আমৃত্যু। দ্বিনের ওপর দৃঢ় থাকার কতিপয় সহায়ক আমলঃ

১। দোয়া করাঃ মুমিন রমজানের পরও একটি সুন্দর জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। আল্লাহর অনুগ্রহেই কেবল মুমিন বিভ্রান্তির হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করবেন না এবং আপনার কাছ থেকে আমাদের করুণা দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮)
২। আল্লাহভীতির জীবন যাপন করাঃ দীর্ঘ এক মাস রোজা আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)। সুতরাং রমজান-পরবর্তী জীবনে যদি আল্লাহর ভয় অন্তরে রেখে চলা যায়, তবে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা সার্থক বলে গণ্য হবে। আর আল্লাহভীতিই মুমিনজীবনে সাফল্যের মাপকাঠি।
৩। আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষাঃ রমজান মাসে যেসব নেক আমল করা হতো, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা মুমিনের দায়িত্ব। মহানবী (সা.) আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহিত করেছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা সাধ্যানুযায়ী (নিয়মিত) আমল করবে। কেননা তোমরা বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দেওয়া বন্ধ করেন না। মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি (সা.) কোনো আমল করলে তা নিয়মিতভাবে করতেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৮)
৪। মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ঃ সমাজের অনেকে রমজান মাসে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং রমজানের পর মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না—এটি নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেসব মানুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যারা মসজিদে উপস্থিত না হয়ে ঘরে নামাজ আদায় করে। তিনি বলেন, ‘যদি ঘরে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা না থাকত, তবে আমি এশার নামাজে দাঁড়াতাম এবং দুই যুবককে নির্দেশ দিতাম, যারা (জামাতে অংশ না নিয়ে) ঘরে আছে তাদের পুড়িয়ে দিতে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮৭৯৬)
৫। কোরআনচর্চা অব্যাহত রাখাঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পরবর্তী যুগের সব মনীষী রমজান মাসে কোরআনচর্চা বাড়িয়ে দিলেও বছরের কোনো সময় তাঁরা কোরআনচর্চা থেকে একেবারেই বিরত থাকতেন না। ইসলামী আইনজ্ঞরা কোরআন থেকে বিমুখ হওয়াকে হারাম বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কোরআন পরিত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুল বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এই কোরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৩০)
৬। সুযোগ হলে নফল রোজা রাখাঃ রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসে গুরুত্বের সঙ্গে ছয় রোজা পালন করতেন। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা শাওয়ালের ছয় রোজার মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৪)। এ ছাড়া মহানবী (সা.) আইয়ামে বিজ তথা চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমার বন্ধু (সা.) আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সওম পালন করা, দুই রাকাত সালাতুদ-দুহা আদায় এবং ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ পড়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৮১)।
৭। আল্লাহওয়ালাদের সংস্রবঃ /sb] আল্লাহওয়ালা ও আল্লাহমুখী মানুষের সংস্রব মানুষকে সুপথে থাকতে সহায়তা করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরাটতাওবা,আয়াতঃ ১১৯)।
৮। প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করাঃ
প্রকাশ্যে ও গোপনে সবসময় এবং সর্বস্থানে অন্তরে আল্লাহর ভয় পোষণ করা। কারণ এর মাধ্যমেই ব্যক্তি নিজেকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে অগ্রসর হয়। তাকওয়া তথা আল্লাহভীরুতার উপর সৎ কাজ নির্ভরশীল। আবু যর গিফারী (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,‘তোমাকে আমি আল্লাহভীরুতার উপদেশ দিচ্ছি, কারণ তা সবকিছুর মূল। তুমি জিহাদ করবে, কারণ তা ইসলামের বৈরাগ্য। আর তুমি অবশ্যই আল্লাহর যিকর এবং কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবে। কারণ তা হচ্ছে আসমানে তোমার আত্মার প্রশান্তি স্বরূপ এবং যমীনে তোমার স্মরণ স্বরূপ’। উক্ত হাদীছে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীরুতাকে সবকিছুর মূল তথা ভিত্তি বলা হয়েছে। এটা প্রজ্ঞার মূল। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) তার খুৎবায় বর্ণনা করতেন, ‘সর্বোত্তম পারিতোষিক হচ্ছে আল্লাহভীরুতা এবং প্রজ্ঞা ও হেকমতের মূল হচ্ছে আল্লাহভীতি’।
৯। ধৈর্যধারণ করাঃ
ইহ-ও পরকালীন সকল বিষয়ে ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার হুকুম প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন’ (বাক্বারাহ ২/১৫৩)। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)-কে আদেশ করেন, ‘জেনে রেখো অবশ্যই সাহায্য ধৈর্যের সাথে রয়েছে’। ইসতিক্বামাত তথা দ্বীনের উপর অটল থাকার ব্যাপারে ধৈর্য বিশেষ গুরুত্ব রাখে। ছাহাবায়ে কেরাম যে ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে দ্বীনের উপর অটল থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার বড় কারণ ছিল ধৈর্য। ওমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, ‘আমাদের জীবনের কল্যাণ পেয়েছিলাম ধৈর্যের মাধ্যমে’। আলী (রাঃ) বলেন, ধৈর্যের সম্পর্ক ঈমানের সাথে তেমন, যেমন শরীরের সাথে মাথার সম্পর্ক। যদি মস্তিষ্ক কেটে দেওয়া হয় তাহ’লে শরীর অকেজো হয়ে যায়। ঠিক সেভাবে যদি ধৈর্য শেষ হয়ে যায়, তাহ’লে ঈমানও শেষ হয়ে যায়। তাই নিজের ইচ্ছা মত চলা যাবে না। চললে পথভ্রষ্ট হতে হবে।

দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেনঃ
‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব; ছাব্বিত ক্বালবি আলা দ্বীনিকা।’ হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন। তাই ইসলামের বিধি-বিধান ও প্রিয়নবির সুন্নতের অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে অটল ও অবিচল আত্মবিশ্বাস সঙ্গে। আর মুমিনের জীবনের অপরিহার্য বিষয় হলো- দ্বীন তথা সঠিক পথ ও মতকে আঁকড়ে ধরা এবং তার ওপর অটল ও অবিচল থাকা। আর এ জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও আবশ্যক কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশ মোতবেক দ্বীনের ওপর অটল এবং অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। দ্বীনের ওপর অবিচল ও অটল থাকতে আল্লাহর দরবারে প্রিয় নবীর শেখানে দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্রঃ তাওহীদের ডাক
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০২১ রাত ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


