somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নুরুন নাহার লিলিয়ান
আমার গল্পটা হোক পৃথিবীর সেরা গল্প ।কারন আমি হতে চাই একজন সত্যিকারের জীবন শিল্পী ।

উপন্যাস " মারিজুয়ানা" পর্ব ১০ -নুরুন নাহার লিলিয়ান

১৪ ই এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



উপন্যাসঃমারিজুয়ানা ১০
নুরুন নাহার লিলিয়ান

আঁধার রাতের গা ঘেঁষে গুঞ্জন গান গাইছিল ।আর জোনাক পোকা গুলো মন খুলে উড়ে উড়ে মায়াময় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল । সবাই মনোযোগ দিয়ে গান শুনলেও নাতালি মনোযোগ দিয়ে গরুর মাংসের ঝোলের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল । হয়তো ভাবছে কিভাবে এতো ঝাল তরকারী রুটি দিয়ে খাবে ।জাপানি নাতালির হাত দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস নেই । সে জাপানি ( চপস্টিক ) দিয়ে খায় । ছোট বেলা থেকে জাপানি সংস্কৃতিতে এভাবেই বড় হয়েছে ।অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হাত দিয়ে খুব কষ্টে ঝাল গরুর মাংসের সাথে তন্দুর খেয়ে নিল ।

ওদিকে নেশাম মনোযোগ দিয়ে নিজের বউয়ের গান শুনতে শুনতে তৃপ্তি মিটিয়ে তন্দুর রুটি দিয়ে গরুর মাংস খেয়ে নিল । শফিকের বার বার মোবাইল ফোনে আসছিল । কখনও বিদেশ থেকে । আবার কখন ও বাংলাদেশের কোন বন্ধুর ।গান শেষ করে গুঞ্জন দেখল চোখে জল নিয়ে ছল ছল চোখে মারিজুয়ানা শফিকের দিকে তাকিয়ে আছে । ওদিকে শফিক রুমের সামনে বারান্দায় হেঁটে হেঁটে কার সাথে যেন কথা বলছে । মারিজুয়ানা তেমন একটা খেল না । গুঞ্জন ঠিক বুঝতে পারছে না কি বলবে ।তারপর ও আন্তরিকতার খাতিরে জিজ্ঞেস করল ,” ভাবি খাচ্ছেন না ?”
মারিজুয়ানা ছল ছল চোখে উত্তর দিল ,” জি ভাবি খাচ্ছি । ঠাণ্ডা হয়ে গেলে খাবার ভাল লাগে না ।”
গুঞ্জন ও বলল ,” একদম ঠিক । বিশেষ করে গরুর মাংস । কিন্তু এটা যে শক্ত মনে হচ্ছে কোন মহিষের মাংস । ”
মারিজুয়ানা বলল ,” হুম । এটা মহিষের মাংসই ভাবি ”
গুঞ্জন অবাক হয়ে বলে ,” সত্যি ”
তারপর দুজন এক সাথে হেসে উঠে ।নির্বিকার মানুষ নেশাম খেয়ে দেয়ে চুপচাপ রুমে চলে গেল । শফিকে মোবাইল ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে । গুঞ্জন আড় চোখে তাকিয়ে দেখে নাতালি নাক মুখ ডুবিয়ে মহিষের মাংসের ঝোলে নিজের বিরক্তিকর স্বাদ নিচ্ছে । জাপানিরা সাধারনত বিদেশী বা নতুন খাবার দেখলে কৌতূহলী হয় । নতুন খাবারের স্বাদ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ।কিন্তু নাতালি কিছুটা ভিন্ন । অবশ্য তার শরীরে অর্ধেক বাংলাদেশের আর অর্ধেক জাপানি রক্ত প্রবাহিত হয় । বেড়ে উঠেছে জাপানে । তারপর ও অনেক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশিদের মতো ।
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল ,” খুব ঝাল তাই না ?”
নাতালি বিরক্তিকর মুখ নিয়ে বলল ,” হুম ! ঝাল আর শক্ত !”
অন্য সব জাপানি হলে হয়তো বলতো , ” না না একদম ঝাল না । খেতে খুব মজা ”
জাপানিরা মিথ্যে প্রশংসা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে পারে । আর এটা করার মতো শৈল্পিক গুনটা তাদের জাতিগত ।
কিন্তু নাতালি তাদের মতো না । বরং অনেকটাই বাঙালিদের মতো । গুঞ্জন মনে মনে লক্ষ্য করল তাঁর বলার ধরন । এরা খুব সুন্দর করে প্রশংসা করতে পারে । কিন্তু বাংলাদেশিদের মত বেশ স্পষ্টভাষী
তারপর যে যার রুমে চলে গেল ।
রুমে ফিরে মারিজুয়ানা একদমই ঘুমাচ্ছে না । এর মধ্যে সে কয়েকবার উঠে পানি খেল । মনেহল শফিক কে কিছু একটা বলার জন্য তাঁর গলা বার বার শুকিয়ে যাচ্ছে । অন্ধকার রুমে পানি খায় আর ঘুমন্ত শফিক কে দেখে ।
আধো ঘুমে থাকা শফিক হঠাৎ চোখ খুলে জিজ্ঞেস করে ,” কি সমস্যা তোমার ?”
মারিজুয়ানা রাগী মুখে কঠিন কণ্ঠে বলে ,” না । কি হবে আমার ! সব তো আপনাদের ব্যাপার !
শফিক রেগে গিয়ে উঠে বসে ,” মানে কি ?” কি হয়েছে ?”
মারিজুয়ানা অভিমানী কণ্ঠে বলল ,” আপনার মেয়ে বাংলাদেশে আসলে আপনি আমাকে চোখেই দেখেন না । আমি খেতে চাইলাম বিরিয়ানি আর আপনি নিয়ে আসলেন মহিষের মাংস ।কারন আপনার মেয়েকে নতুন স্বাদ দিবেন । আপনার মেয়ে ও খায়নি । ”
শফিক বলল ,” আচ্ছা । আর কি সমস্যা ?”
মারিজুয়ানা বলল ,” আপনার মেয়ে বড় রুম চয়েজ করল ।আর সাথে সাথে তাকেই বড় রুমটা দিয়ে দিলেন । আমার পছন্দের কোন মূল্য নেই !”
শফিক ঘুমন্ত কণ্ঠে বলল ,” দেখ তুমি সামান্য বিষয় নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছো!এক রাতের জন্য এই হোটেলের রুম বড় হলেই কি আর ছোট হলেই কি ! ঘুমাও !”
মারিজুয়ানা কান্না করতে করতে বলে ,” আপনার মতো বহুরূপী ব্যাডা জীবনে একটা ও দেখি নাই ।”
শফিক ঘুমের ঘোরে বলে ,”বহুরূপী ব্যাডা কেমনে দেখবা ! আমার মতো এতো বহুরূপের সংসার তো করোনি । এখন ঘুমাও ।ঝামেলা করো না । ভোরে উঠতে হবে ।”

মারিজুয়ানা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করতে থাকে । অনেকটা সময় এমন করেই যায় । তারপর সব নিরব হয়ে এলে নিজেই চুপচাপ শফিকের পাশে এসে শোয় ।শফিক আর মারিজুয়ানার মাঝের দুই ইঞ্চি দূরত্ব যেন মহাসমুদ্র তৈরি করে রেখেছে । পেছন ফিরে শুয়ে আছে শফিক । মারিজুয়ানার একদম ঘুম আসছে না ।অচেনা অন্ধকার রুমে কেমন জাগতিক জীবনটাকে অসহ্যকর মনে হচ্ছে ।বুকের ভেতরে বয়ে যাওয়া মহাসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কেমন উদ্ভ্রান্ত করে রেখেছে ।নিজের জীবনের প্রতি ভীষণ অভিমান পেয়ে বসে । আর একবার ও স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে না শফিক নামের এই নোংরা লোকটাকে । বেশ কিছুক্ষন এমন করে এপাশ ওপাশ করতে থাকে । এমন করতে করতে কখন যে দূর দিগন্ত থেকে ভোরের আজান ভেসে আসছে টেরই পায়নি । তখন ও শফিক কি গভীর চিন্তাহীন ঘুমে আচ্ছন্ন ।ভোরের আজানের কিছুক্ষন পরে শফিক এপাশ ফিরে শোয় । তারপর একটা নির্ভরশীল হাত মারিজুয়ানার গায়ে রাখে । পেছন ফিরে শুয়ে থাকা মারিজুয়ানা নিস্তব্ধ শব্দহীন চোখের জলে বালিশ ভাসায় । কি এক অদ্ভুত কারনে শফিকের হাতটা গাঁ থেকে সরাতে পারে না ।

সবাইকে খুব ভোরে উঠতে হবে । কারন পশুর নদী হয়ে সুন্দর বনের ভেতরে যেতে হবে ।
ফজর আজানের পর পরই সবাই প্রস্তুত হল ।এতো ভোরে উঠে কোথাও যাওয়া খুব রোমাঞ্চকর হলেও ঘুম কাতুরে মানুষের জন্য খুব কষ্টের ।ডঃ নেশাম সহজে ঘুম থেকে উঠতে চায় না ।রাত জেগে কাজ করার অভ্যাস থাকলে ও ভোরে উঠা তাঁর জন্য ভীষণ কঠিন । সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে । নেশামের জন্য দশ মিনিট দেরি হল । নাস্তা করার মত সময় নেই । তবুও রুমে আগের দিনে এনে রাখা কলা ,বিস্কুট আর ব্রেড খেয়ে সবাই প্রস্তুতি নিল । রুম থেকে বের হয়ে গুঞ্জন দেখল নাতালি খুব গুছিয়ে হলুদ সবুজের মিশ্রণে সুন্দর একটা কামিজ পরেছে । বুকের ওড়না বেশ আট সাট করে গুছিয়ে নিয়েছে ।অন্যদিকে মারিজুয়ানা যেন একদম ভিন্ন কেউ ।ব্লাক জিন্স টি শার্ট গলায় রেড স্কার্ফ বেশ আকর্ষণীয় ভাবে জড়িয়ে নিয়েছে । এতো সুন্দর একটা ড্রেস পড়েও কেমন ম্লান দেখাচ্ছে । বাসী মুখে কাক ডাকা ভোরে সবাইকে কেমন অদ্ভুত নিষ্পাপ লাগছে ।

এক এক করে সবাই নৌকায় উঠে বসল । দুতলা ছোট পাল তোলা নৌকার মতো । খুব সুন্দর সাজানো গুছানো রঙিন নৌকা । সেখানে মুটামুটি মাঝি সব ধরনের ব্যবস্থা রাখে । খাবার দাবারের ব্যবস্থা ও আছে । কেউ সুন্দর বনের ভেতরের নদীর গলদা চিংড়ি খেতে চাইলে মাঝি রান্না করে খাওয়াবে । খাওয়া দাওয়ার পর কেউ ফ্রেস হতে চাইলে নৌকায় এটাচ টয়লেটের ব্যবস্থা ও আছে । ভোরের ফুর ফুরে বাতাস । আলো আঁধারি মাথার উপরের বিস্তীর্ণ আকাশ ও যেন নৌকার সাথে ভেসে চলেছে ।পশুর নদীর স্রোত টেনে নিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের দিকে ।খুব আরাম করে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে । সবার মধ্যে এক অনাবিল রোমাঞ্চকর আনন্দ । ঢেউয়ের সাথে খেলা করতে করতে নৌকা এগিয়ে যেতে লাগল ।তবে মাঝে মাঝে একটু আধটু ঢেউয়ে দোল ও খায় । যখন দূর থেকে কোন বড় জাহাজ ভেসে যায় । দূর থেকে ভেসে আসা ঢেউ নৌকা কে দুলিয়ে যায় । আচমকা দুলনিতে সবাই মজা পেলে ও গুঞ্জন ভয়ে চিৎকার করে উঠে ।

চলবে …।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১০:৫৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি, যার অর্থ খারাপ বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া এবং ভালো বা সৎ মানুষকে রক্ষা করা। এটি মূলত সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু টুথপেস্ট নয়—মোড়ক ছেঁড়ার মুহূর্তেই ছড়াচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

লিখেছেন মুনতাসির, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩০

টুথপেস্ট নিয়ে আলোচনা সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা আরও অনেক বড়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি সিন্থেটিক পণ্যই এখন মাইক্রো বা ন্যানোপ্লাস্টিক তৈরি করতে পারে—এমনকি একটি চিপসের প্যাকেট ছেঁড়ার মুহূর্তেও,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো নামে মিথ্যা অপবাদ কাম্য নয় তবে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৯


ঘটনাটি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘিরে। পরিবাগ ওভারব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কী-বোর্ড কাহিনী: ডেল কেবি২১৬

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:০০


আমি ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কী-বোর্ড ব্যবহার করছি। দেশে থাকতে কী-বোর্ড তেমন প্রয়োজন পড়েনি। মাঝে মধ্যে কেনা হতো। একবার বাংলা লিখার জন্য "বিজয়" সফটওয়্যারের প্রলোভনে, বিজয় এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×