somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্রেজিডিক আত্মকথনঃ আমার বন্ধু

০১ লা মে, ২০১৪ দুপুর ১২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছেলেটির নাম ছিল জাভেদ; আমার প্রাইমারী লেভেলের বন্ধু। স্কুলের যে সব বন্ধুদের সাথে রেডি খেলার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকতাম তার মধ্যে সে ছিল অন্যতম। দুজনের বাসা একই পাড়ায় হওয়ায় আমাদের মাঝে অন্য রকম সখ্যতা ছিল। স্কুলের ছুটির ঘন্টা বাজলেই দুজন বস্তা আইসক্রিম হাতে নিয়ে বাসার পথে ভৌ দৌড় দিতাম।

জাভেদদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। একটা সময় অর্থনৈতিক দুর্দশায় তার স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকদিন স্কুলে না আসায় একদিন কিছু বন্ধুরা মিলে ওর বাড়িতে যাই। গিয়ে জানতে পারি ও একটা গ্যারেজে কাজ করা শুরু করেছে। স্কুলে নাকি আর পড়বে না। একথা শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে জাভেদের মাকে অনেক গাল দিয়েছিলাম। ছোট্ট মানুষ ছিলাম বলেই হয়তো ইমোশনটা বেশী ছিল। তাই ওদের নির্মম বাস্তবতা বুঝতে চেস্টা করি নি।

এর কিছুদিন পর আমি স্কুল পাল্টাই; জাভেদ যে গ্যারেজে কাজ করতো সেটা আমার স্কুলে যাওয়ার পথেই পড়তো। মাঝে মাঝে দেখা হতো ওর সাথে। গ্যারেজে কাজ করায় ওর শার্টে সবসময় কালি লেগে থাকতো। দেখা হলেই আমাকে বন্ধুদের কথা জিজ্ঞেস করতো; স্কুলের স্যারদের কথা জিজ্ঞেস করতো। স্যারদের মারের কথা উঠলেই বলতো -স্কুল ছেড়ে দিয়ে ভালোই নাকি করেছে সে; স্যারদের মার খেয়ে স্কুলে পড়ার কোন মানে হয় না; এইখানে মাস শেষে কিছু টাকা পায়। কাজ শেখে ঐটাই ভাল।

একদিন গ্যারেজে গিয়ে ওকে আর খুজে পায় না। গ্যারেজের লোকদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় জাভেদ আর ঐখানে কাজ করে না। সে নাকি নতুন এক ফ্যাক্টরিতে ঢুকছে। এ কথা শুনার পর আমি বের হয়ে আসি। তারপর জাভেদের সাথে দেখা হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

২০০০ সালের দিকে এক প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লাগে। খুব সম্ভবত তৎক্ষণাৎ ১১ জন পুড়ে মারা যায়। দুঃখজনক ব্যাপার ছিল ১১ জনের ৬ জনই ছিল আমাদের এলাকার। তাই সেবার এলাকা জুড়ে শোকের মাতম হয়েছিল । টানা কয়েকদিন গভীররাতে বারনিং ইউনিট থেকে এক একটা পোড়া লাশ আনতো। এনে আমাদের বাসার সামনের গ্যারেজে রাখতো। বাসার সামনে বড় মাঠ ছিল; সেটাতে জানাজা পড়ানো হতো।

লাশের মিছিল যখন থামবে থামবে করছে ; তখনই এলাকায় খবর আসে আরেকটি ছেলে মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছে; আজ রাতেই নাকি মারা যেতে পারে। আম্মা মারফত জানতে পারি ছেলেটি জাভেদ। আমার সেই ছোটবেলার বন্ধু। বিকেলেই জাভেদ মারা যায়; সন্ধ্যায় যথারীতি লাশ আমার বাসার সামনে এনে রাখে। বহুত চেস্টা করেছিলাম ওর লাশ দেখার। কিন্তু ছোট ছিলাম বিধায় তখন ওর লাশ দেখতে দেয়া হয় নি। পড়ে চাচার মুখে শুনেছিলাম ওর মুখটা নাকি পচে গিয়েছিল; চেহারা নাকি এতো বীভৎস হয়েছিল যে চেনা যাচ্ছিল না।

ওর মৃত্যুর পর অনেকদিন চরম ভয়ে দিন কেটেছে। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। এ রুম থেকে ও রুমে যেতে পারতাম না। একা বাথরুমে যেতে পারতাম না। টেবিলে পড়তে বসলে মনে হতো আমাকে পেছন থেকে ডাকছে। মোটকথায় মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সত্যি বলতে ঐ ঘটনার রেশ এখনো আমাকে তাড়া করে। এখনো ঘুমালে মাঝে মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজানোর দৃশ্য; গ্যারেজে লাশ রাখার দৃশ্য দেখতে পাই। তারপর ভয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি :

(অফটপিকঃ আমরা আবেগে শিশুশ্রম বন্ধ করার কথা বলি; আবেগ দিয়ে বাস্তব চলে নারে ভাই; বাস্তব বড়ই নির্মম; কোন বাবা মা অন্তর থেকে চায় না যে তার ছেলে স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে গ্যারেজে; কারখানায় কাজ করুক। একমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া শিশুশ্রম বন্ধ অসম্ভব।)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×