দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বুধবার ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস কোম্পানির সঙ্গে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১’ নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের আনুষ্ঠানিক চুক্তি করেছে বিটিআরসি।

অনুষ্ঠানে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ এবং থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মি. জ্যঁ লইক গ্যাল তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগরে সচিব মো, ফয়জুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী বেগম তারানা হালিম, বিশেষ অতিথি ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ এমপি প্রমুখ।

উপগ্রহের বাজার মূল্যায়ন, বাজারজাতকরণ, কাঠামো তৈরি, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূস্থিত দুটি স্টেশন, পরিচালনা, ঋণের ব্যবস্থা করবে থ্যালেস এলেনিয়া। সব মিলে থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস ২৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাবে। গত মার্চে এ দরপত্র ডাকা হয়। ইউরোপের শীর্ষ স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেলিস অ্যালেনিয়া স্পেস ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত। থেলিসের প্রধান কার্যালয় ফ্রান্সের কানে। গত ২০ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থ্যালাস স্পেসকে কাজ দেয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও কারিগরি দিক দিয়ে এগিয়ে থাকায় থ্যালেসকে কাজ দেয়া হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল কানাডার এমডেএ (২২ কোটি ২০ লাখ ডলার)। আগামী ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি স্যাটলাইটের জন্য অরবিটাল স্লট ইজারার চুক্তি করে বিটিআরসি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০১২ সালে একনেক ৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা আনুমানিক ব্যয়ে এই প্রকল্প অনুমোদন করে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর আপত্তির কারণে বিটিআরসি গত বছরের মার্চে ২ হাজার ৯৬৭ দশমিক ৯৬ কোটি টাকার একটি সংশোধিত প্রস্তাব পেশ করে। এটাই ব্যয় ধরা হয়। এরপর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এ প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে সরকার দেবে ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ঠিকাদার কোম্পানিকে (বিডার্স ফাইন্যান্সিং’) সরবরাহ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’ ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপগ্রহের নকশা তৈরির কাজ শুরু করেছে। ভূমি থেকে উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণের জন্য গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) নিজস্ব জমিতে দুটি ‘ভূ স্টেশন’ নির্মাণ করা হবে। বিটিআরটিসি বলছে, বর্তমানে দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ মুদ্রা বিদেশে পাঠাচ্ছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে এই টাকা দেশেই থেকে যাবে। আবার স্যাটেলাইটের অতিরিক্ত ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব হবে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ আরও কয়েকটি দেশে স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দেয়া যাবে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) বাংলাদেশকে নিরক্ষ রেখার ১০২ ডিগ্রি স্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ তাতে বাধা দেয়। দেশগুলোর আপত্তির মুখে বাংলাদেশ বিকল্প উপায় খুঁজতে থাকে। বিকল্প হিসেবে ৬৯ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তাব দেওয়া হয় বাংলাদেশকে। কিন্তু বিকল্প প্রস্তাবেও আপত্তি তোলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন। সর্বশেষ ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রিতে (পূর্ব) চূড়ান্ত স্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু এই স্লটটিও খালি ছিল না। স্লটটি ছিল ইন্টারস্পুটনিকের। কিন্তু অর্থের সংস্থান না হওয়ায় রাশিয়ার মহাকাশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পুটনিকের নিজস্ব দুটি স্লটের বিপরীতে (৮৪ ও ১১৯.১ ডিগ্রিতে) দুই মাসের একটি শর্তহীন চুক্তিও করে বাংলাদেশ সরকার। ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের এই অরবিটাল স্লটের (নিরক্ষরেখা) জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনসকে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব অরবিটাল স্লটে (৮৮-৯১ ডিগ্রি) এরই মধ্যে রাশিয়ার দুটি, জাপান ও মালয়েশিয়ার একটি করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেণ করা হয়েছে। অরবিটাল স্লটের ৮৮-৮৯ ডিগ্রি এখনও খালি থাকলেও অরবিটাল স্লট বরাদ্দদানকারী সংস্থা আইটিইউ ওই জায়গা বাংলাদেশকে বরাদ্দ দেয়নি। এর আগে মহাকাশে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের জন্য অরবিটাল স্লট বা নিরক্ষরেখা (১১৯.১ ডিগ্রি) লিজ নেয় বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। অরবিটাল স্লটের লিজের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনের মধ্যে গত ১৫ জানুয়ারি একটি চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী 'বঙ্গবন্ধু-১' স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া যাবে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার; যার ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের ও ১৪টি সি ব্যান্ডের। এসব ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। বাকিগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাড়া দেয়া হবে।
সুত্র
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



