ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ দেখা দিল 1964 সালে। 1966 সালে শেখ মুজিবর রহমান শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ছ'দফা আন্দোলন। 1966 সালের 8মে কয়েকজন আওয়ামী লিগ নেতাসহ শেখ মুজিবর রহমানকে বন্দী করা হয়। সে বছর 13মে ও 7 জুন যথাক্রমে আওয়ামী লিগ নেতাদের মুক্তির দাবিতে ও ছ'দফার স্বপ েক্ষ প্রদেশব্যাপী পূর্ন হরতাল পালিত হয়। মিছিলের ওপর পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী বেপরোয়া গুলি চালায়। ঢাকা সহ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বহুলোক হতাহত হয়।
ছ'দফা ও আগরতলা ষড়যন্ত মামলা :
7জুন 1968 সালে জেল থেকে মুক্তির পর শেখ মুজিবর রহমানকে আগরতলা মামলার আসামী হিসেবে জেলগেট থেকেই পুনরায় বন্দী করা হয়। 1969 সালের 15 ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে জেল হাজতেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বর্বর পাক দসু্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ডক্টর শামস্ উজ্ জোহাকে নিষ্ঠুরভাবে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আক্রোশ ও ক্ষোভ এক ভয়াবহ রূপ নিল। তারা ঢাকায় মর্নিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান (পরে দৈনিক বাংলা) অফিস পুড়িয়ে দিল। ব্যাপক সরকারী সমপত্তি বিনষ্ঠ হলো। প্রদেশব্যাপী গণজাগরনের জোয়ার এল, উপায়ান্তর না দেখে স্বৈরাচারি শাসকচক্র সান্ধ্য আইন জারি করে সেনাবাহিনী তলব করল। কারফিউ অগ্রাহ্য করে মিছিলের পর মিছিল বেরুল। প্রবল এই বিক্ষোভের মুখে সংগ্রামী জনতার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো আইয়ুব সরকার, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো তারা। '69 সালের 22 ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামীকেই মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন বিকেলে রেসকোর্সে (সোওরোয়ার্দি উদ্যানে) এক বিরাট জনসভায় ভাষণ দেন শেখ মুজিব। এরপর তিনি ও মওলানা ভাসানী আইয়ুব খানের প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য রওয়ালপিন্ডি গমন করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো সহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতারাও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এখানে শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক 6 দফা পুনরায় উত্থাপন করেন। কেউই তার এই প্রস্তাব মানল না। এমনি করে আইয়ুব খানের প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়।
স্বৈরাচারি ইয়াহিয়ার আগমন :
রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা থেকে নেমে যান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান আর সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা নেন আরেক জান্তা ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় এসেই সামরিক শাসন জারি করেন তিনি। জাতির প্রতি দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান 1970 সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন ও জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দান করেন।
1970 সালের 12 নভেম্বর রাত্রে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিনাঞ্চলের ওপর এক প্রলয়কারী ঘূর্নিঝড় ও সর্বনাশা সামুদ্রিক জলোচ্ছাস আঘাত হানল। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরপনায় দশ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। সেই সঙ্গে গৃহহীন হয় আরো ত্রিশ লাখ। এ ভয়াবহ দুর্যোগের খবর পেয়ে বিশ্ববাসী কল্পনাতীত ত্রানসরবরাহ নিয়ে এগিয়ে এল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার রইল সমপূর্ণ নিরব দর্শকের ভূমিকায়। কেউ সামান্য সমবেদনা দেখাতে দূর্গত এলাকায় একটি সৌজন্য সফর পর্যন্ত করল না। মওলানা ভাসানী তার কিছুসংখ্যক কর্মী নিয়ে দূর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং গঠন করেন রিলিফ কমিটি। শেখ মুজিব দুর্গত এলাকায় একনাগাড়ে নয়দিন ছুটে বেড়ালেন। তিনি জনগনকে স্বান্তনা ও কর্মীদের মাধ্যমে রিলিফ দেওয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা চালালেন। 26 নভেম্বর ঢাকায় ফিরে তিনি তৎকালীন শাহবাগ হোটেলে প্রায় দুশো দেশি-বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজিতে লেখা এক বিবৃতিতে দূর্গত এলাকায় তার সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেখানে তিনি কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাদের পূর্ব বাংলার প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তাদের ঘৃন্য অপরাধী ও উপনিবেশবাদের 'চেলাচামুণ্ডা' বলে আখ্যায়িত করেন। (চলবে)
ছবি: কিছু'69 গনআন্দোলনের, কিছু '70 এর ঘুর্নিঝড় পরবর্তী অবস্থার
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


