'70-র ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়। আওয়ামী লিগ পূর্ব পাকিস্তানের মোট 169টি আসনের 167টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিধিমতো আওয়ামী লিগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হলো না। 12 ও 13 জানুয়ারি '71 ইয়াহিয়া খান নবনির্বাচিত আওয়ামী লিগ নেতৃবৃন্দের সাথে জাতীয় পরিষদ প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য এক বৈঠকের আহ্বান জানালেন। 17 জানুয়ারি তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে পৃথক আলোচনায় বসেন। 27 ও 28 জানুয়ারি ঢাকায় মুজিব-ভুট্টো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান এই বৈঠকে 15 ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার জন্য আহ্বান জানান।
13 ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করলেন পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রনয়নের উদ্দেশ্যে 3 মার্চ সকাল 9টায় ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তান জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের। কিন্তু 15 ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলি ভুট্টো ঘোষণা করলেন তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বয়কট করবেন। 19 ফেব্রুয়ারি '71 রাওয়ালপিন্ডিতে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইয়াহিয়া খান কেন্দ্রীয় মন্তীসভা বাতিল ঘোষনা করলেন 22 ফেব্রুয়ারি। সেই সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। অপসারিত হলেন পূর্ব বাংলার গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস, এম, আহসান। প্রাদেশিক সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল সাহেবজাদাকে গভর্নরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হলো।
এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব এক সংবাদ সম্মেলন আহবান করলেন। সেখানে তিনি 2 মার্চ ঢাকায় এবং 3 মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতালের ডাক দিলেন। সেই সঙ্গে জানালেন 7 মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন তিনি- সেখানে চুড়ান্ত কার্যক্রম ঘোষণা করা হবে। 1 মার্চ '71 ঢাকার ফার্মগেটে নিরস্ত্র জনতার ওপর পুলিশ গুলি বর্ষন করল। 2 মার্চ ঢাকায় হরতাল পালন করলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। শেখ মুজিব সরকারের এই হীন চক্রান্তের তীব্র নিন্দা করলেন। শত শত সভা আর শোভাযাত্রায় মুখরিত হয়ে উঠল ঢাকা শহর। হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হল-'ষড়যন্ত আর নয়, পরাধীনতার গ্লানি আর সইব না, চাই মুক্তি, চাই স্বাধীনতা'।
2 মার্চ '71 ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের কলা ভবনে ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৃহত্তম ছাত্র সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হলো। সহ-সভাপতি আ,স,ম আব্দুর রব এই সভায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন। এ সভায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। সেদিন ছাত্রলীগ সাধারণ সমপাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন। শেখ মুজিবর রহমানকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হলো। শেখ মুজিব অবিলম্বে সামরিক আইন তুলে নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানালেন। হরতালকারীদের ওপর তীব্র পুলিশি জুলুম শুরু হলো- চলল বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। স্বাধীনতাকামী শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠল ঢাকার রাজপথ। তবুও সামরিক জান্তার গুলির মুখে বীর বাঙালীরা এগিয়ে গেল দৃপ্ত পদক্ষেপে। শুরু হলো সর্বাত্মক আন্দোলন। মিছিল, শ্লোগান ও শোভাযাত্রায় প্রকমপিত ঢাকা নগরী।
বেলা পৌনে 11টায় ফার্মগেটে বেয়নেট চার্জ ও গুলিতে হতাহত হলো 9 জন। রাত ন'টা থেকে সান্ধ্য আইন জারি করা হলো। ছাত্র জনতা তা অমান্য করে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় অগণিত মশাল মিছিল বের করলেন। সেনাবাহিনী বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করল মিছিলে। ছাত্র-জনতা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যারিকেড তৈরি করল। তেজগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র আজিম মোর্শেদ (22) শহীদ হলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় যাদের হাসপাতালে নেওয়া হলো, তাদের মধ্যে ছিলেন 1.তেজগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের 7ম শ্রেনীর ছাত্র মামুন (12), 2.ফার্মগেট ইসলামিয়া স্কুলের ছাত্র মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ বাচ্চু (11), 3. শ্রমিক ও বাস্তুহারাদের স্বেচ্ছাসেবক, কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশর্্ববর্তী বস্তির বাসিন্দা আলী হোসেন (16), 4. নুরনবী (10), 5. চাঁন মিয়া। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। কিন্তু তাদের পূরো পরিচয় জানা যায়নি। সারারাত নির্বিচার গুলি চলল, আর সেই আওয়াজকে ছাপিয়ে আকাশবাতাস প্রকমপিত করে তুলল মুক্তিকামী জনতার শ্ল্লোগান।
ক্রমেই আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠল পরিস্থিতি। প্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গুলিবর্ষনের খবর এল। ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পরিবর্তে পার্লামেন্টারি গ্রুপের 12 জন নেতার বৈঠক ডাকলেন 3 মার্চ, কিন্তু এ ডাক প্রত্যাখ্যান করলেন শেখ মুজিব। 3 মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের সময় জনাব ফারুক ইকবালকে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনী। (চলবে)
ছবি : '70 নির্বাচনের ফলাফল শুনছেন শেখ মুজিব সঙ্গী আওয়ামী লীগ নেতারা 2. অসহযোগের রাজপথ 3.ভোট দিচ্ছেন এক মহিলা 4. বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাবেশ যেখানে ওঠে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


