7 মার্চ '71 সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বাসভবনে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাক্ষাত করেন। এ বৈঠকে রাষ্ট্রদূত তার সরকারের সিদ্ধান্তের কথা শেখ মুজিবকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তা হলো- 'পূর্ব বাংলার স্বঘোষিত স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সমর্থন করবে না। এদিকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (লোকে লোকারণ্য) বিকেল প্রায় সাড়ে চারটায় বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এলেন। তার ঐতিহাসিক সেই বক্তৃতার অংশ বিশেষ এখানে তুলে ধরছি :
...1952 সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। 1954 সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। 1958 সালে আইউব খাঁ মার্শাল 'ল জারি করে 10 বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে।...... দেখে যান কীভাবে আমার গরীবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের ওপর গুলি করা হয়েছে। কীভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সামরিক আইন মার্শাল 'ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত পাঠাতে হবে। আর জনগনের প্রতিনিধির কাছে মতা হস্তান্তর করতে হবে। আর তারপর আমরা বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কীনা। এর পূর্বে আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারি না..... আমি প্রধানমন্ত্র্রীত্ব চাই না, দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট কাচারি, আদালত, ফৌজদারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে।...... এরপর যদি একটা গুলিও চলে, এরপর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তাহলে তোমাদের প্রতি অনুরোধ রইল- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। তোমরা আমাদের ভাই- তোমরা ব্যারাকে থাক। তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি করবার চেষ্টা করোনা। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।.....এবং তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাক। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।'
(আমার যোগ : বাবা বক্তৃতার হাইলাইটগুলো তুলে ধরছেন। প্রাসঙ্গিক বিধায় আমি পুরোটা আলাদাভাবে পোস্ট করলাম ছবি আকারে)।
এই জনসভায় শেখ মুজিব বক্তৃতা দানকালে চার দফা দাবির কথা উত্থাপন করেন- 1. সামরিক আইন প্রত্যাহার। 2. সেনাবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন। 3. নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ। 4. প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
রেসকোর্সে 7 মার্চের এই ভাষণ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে সরাসরি সমপ্রচার হবার কথা ছিল। ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক জনাব আশরাফউজ্জামানের নেতৃত্বে তার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সামরিক জান্তার চক্রান্তে সেদিন তা সমপ্রচারিত হয়নি। ও-বি টিম টেপরেকর্ডারে ভাষণটি পুরো টেপ করে নেয়। জনাব আশরাফ রেসকোর্স ময়দান থেকে ফিরে বেতারের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেন এবং সবাইকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে 7 মার্চ '71 ঢাকা বেতার কেন্দ্রের তৃতীয় অধিবেশন প্রচারিত হয়নি। রেডিও পাকিস্তান ও অল-ইন্ডিয়া রেডিওর ইতিহাসে এটাই প্রথম অসহযোগের ঘটনা। রাতের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর রেকর্ডকৃত ভাষণ প্রচারের শর্তে সমঝোতা হয়। পরদিন 8 মার্চ সকাল সাড়ে আটটায় রেকর্ডকৃত পুরো ভাষনটি ঢাকা বেতার থেকে সমপ্রচার করা হয়। একই সঙ্গে তা সমপ্রচারিত হয় প্রদেশের অন্যান্য বেতার কেন্দ্র থেকেও। কিন্তু চট্টগ্রাম বেতার টেলিফোনের সাহায্যে এই বক্তৃতা পুরোটা লিখে নেয়। এই অসাধারণ কাজটি সম্ভব হয় বার্তা সমপাদক সুলতান আলী, সহ-সমপাদক নজরুল ইসলাম ও অনুষ্ঠান সংগঠক আব্দুল হালিম সরদারের অসীম সাহসিকতায়। তাদের বীরত্বে ও সক্রিয় সহযোগিতায় 7 মার্চই সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের স্থানীয় সংবাদে পূর্ণতথ্য বিবরণী প্রচারিত হয়। সংবাদ পাঠক ছিলেন বদরুল হুদা চৌধুরী। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


