দৃশ্য — ০৫ (পালিশ করা সংস্করণ)
সতর্কতা: এই উপন্যাসের চরিত্র ও কাহিনি কাল্পনিক; তবে কথামালা শিক্ষনীয়, উপকারী এবং সত্যঘন।
রফিক তার কুটিরে ফিরে এল। দরবেশের সাথে সেই আশ্চর্য সাক্ষাৎ তার অন্তরকে যেন নতুন আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল। সে আলো এখনো তার হৃদয়ে জ্বলজ্বল করছে—মৃদু উষ্ণতা, অপরিমেয় তৃপ্তি, আর অদ্ভুত এক শান্তি নিয়ে।
কুটিরে এসে সে ধ্যান শুরু করলো। ধ্যানের ভূমিকার মতোই সে আস্তে করে নিজের লেখা এক কবিতা পাঠ করলো—
“আপনার চেহারা এত সুন্দর,
দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে মন চায়।
হায়, যদি আপনাকে অনন্তকাল দেখতে পারতাম,
তারপরও আমার মন ভরত না।
আপনার বিরহে আমি গলে যাই, ক্ষীণ হয়ে যাই—
অবশেষে বিলীন হয়ে যাই আপনার প্রেমে।”
কবিতা পাঠ করে রফিক গভীর মগ্নতায় ডুবে গেল। ঠিক তখনই ফজরের পূর্ব-আলো আকাশে সাদা রেখা তুলে দিল। জঙ্গলের ভিতরেই সে পবিত্র ফজরের নামাজ আদায় করলো।
মানুষের এই বৈচিত্র্যময় দুনিয়ার প্রতিটি ঘটনাই শিক্ষণীয়। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, চিপায়-চাপায় এমন সব রহস্য লুকিয়ে আছে যা বিজ্ঞান আজও আবিষ্কার করতে পারেনি। বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, কিন্তু সে সীমাবদ্ধ—বিশেষত রূহানিয়াত সম্পর্কে।
রূহ অতি সূক্ষ্ম। অগণিত সাধনা ছাড়া এর দরজা খুলে না। যারা সাধনা করেনি, তারা রূহ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এজন্য কিছু বিজ্ঞানী রূহকে অস্বীকার করেই বসে। যে পথে হাঁটেনি, সেই পথের খবর সে জানবে কীভাবে?
যেমন পূর্বদিকে যাত্রা করা পথিক পশ্চিমের খবর জানে না—
তেমনি দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকা ব্যক্তি আখিরাতের কথা বুঝে না। একজন কবি ঠিকই বলেছেন—
“যে ব্যক্তি যাত্রী নয়, তার থেকে যাত্রার খবর নিও না।”
নামাজ শেষ করে রফিক তার দৈনিক যিকির ও আমলে মগ্ন হলো। কিন্তু আজকাল কেন জানি যিকিরে মন বসে না। সে জানে—এটা শয়তানির কুমন্ত্রণা। তাই মন না বসলেও সে যিকির ছাড়ে না; বরং আরও বেশি করে।
প্রতিদিনের মতো বিকেলে সে জঙ্গলের আঁকাবাঁকা নদীতীর ধরে হাঁটতে বের হলো। সেখানে প্রায়ই তার মুখোমুখি হয় এক নাস্তিক—চাদগাজী। রফিক তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়, অথচ লোকটি পথ আটকে দাঁড়ায়—
চাদগাজী:
“কি অবস্থা আপনার? এখনো পাগলামি ছাড়েন নাই মনে হয়! পুরা কালের রূপকথা নিয়ে পড়ে আছেন। বেদুইনের মতো পোশাক পরেন! একটু আধুনিক হন আমাগো মতো।”
রফিক (মনে মনে):
আমার শরীর কত আরামে থাকে যদি তুমি জানতে, বুড়া মিয়া! দুনিয়ার সব আরাম ভুলে যেতে।
রফিক:
“আমার অবস্থা ভালোই, চাদগাজী সাহেব। আপনার হেদায়েত কামনা করি। তবে আপনি হেদায়েত পান বা না পান—তা আমার উপর দায় নয়।
আমি বেদুইনের পোশাকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাই। আপনি কোট-টাইয়ে সেটা পাবেন না। নাস্তিকতা ছেড়ে দিন। ইমানের স্বাদ গ্রহণ করুন—তাহলে হারিয়ে যাবেন এমন এক ভালোবাসায় যার কোনো কূল-কিনারা নেই।”
চাদগাজী হাসল:
“ধর্ম মানুষের বানানো। নবীজি আরবদের একটা রাজ্য বানাতে চাইছিলেন—তাই ধর্ম আবিষ্কার করলেন!”
রফিক:
“আপনার মুখে একটুও বাজে না এমন কথা বলতে? ইতিহাসে এর কোনো সনদ নেই।
আপনার কাজ দুনিয়া চাটা; জান্নাত-জাহান্নামের দরকার নেই।
আমার সামনে থেকে সরে যান। আগুনের গন্ধ নিয়ে এসেছেন! দূর হোন—ছাগল কোথাকার!”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে রফিক নদীর ধারে ঘাসের ওপর মাগরিব পড়লো। মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত নামাজে মগ্ন থাকলো। তারপর কুটিরে ফিরলো। রাত্রি নামতেই তার অন্তরে আলো জ্বলে উঠল। শেখ সাদীর সেই বাণী মনে পড়ল—
“অন্ধকার রাতে আল্লাহর আশেকগণ
আলোকিত দিনের মতো উজ্জ্বল হন।”
রাত্রিকে সে ভাগ করে নিয়েছে—
এক অংশ নামাজ, এক অংশ কুরআন, এক অংশ দুরুদ, এক অংশ যিকর, এক অংশ মোরাকাবা।
দিনের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে রাতই তার সত্যিকারের জগৎ।
---
দৃশ্য — ০৬ (পালিশ করা সংস্করণ)
রফিক এবার গভীর ধ্যানে বসল। প্রতিদিন সে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ধ্যান করে; আজকের বিষয়—
“শয়তান কীভাবে মানুষকে আক্রমণ করে এবং নিয়ন্ত্রণে নেয়।”
চোখ বন্ধ করতেই অন্তর-দৃষ্টি উন্মুক্ত হলো। সেখানে শয়তান তার ধ্যান ভাঙতে এসে দাঁড়ালো।
কিন্তু রফিকের আত্মিক শক্তির সামনে সে টিকতে পারল না। মুহূর্তেই সে পরাভূত। তখন শয়তান চিৎকার করে উঠলো—
শয়তান:
“আমাকে ছেড়ে দাও! আমি তোমাকে এমন কিছু রহস্য জানাবো, যা তোমার উপকারে আসবে!”
রফিক ধীর কণ্ঠে বলল—
রফিক:
“হে ইবলিশ! তুমি কিভাবে মানুষকে করায়ত্ব করে নাও?”
শয়তান:
“আমি কাউকে জোর করতে পারি না। আমি শুধু ফুসলাই।
যারা আমার ডাকে সাড়া দেয়, তারাই ফাঁদে পড়ে।
আর যারা আমার কথা শোনে না, তারা আমার জাল ছিন্ন করে পবিত্রতার জগতে পা রাখে।”
রফিক:
“তোমার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কী?”
শয়তান:
“মানুষের কাম-প্রবৃত্তি।
আমি নারীদেরকে তাদের দৃষ্টিতে রঙিন, সুশোভিত করে দেখাই—
তারপর সে মনে মনে কুচিন্তা করে, অন্তর নষ্ট হয়—
এটাই আমার লক্ষ্য।
মানুষের অন্তরকে মারেফতের অযোগ্য করে দিতে পারলেই আমি জিতি।
আমি চাই তারা জাহান্নামে আমার সঙ্গী হোক।”
রফিকের অন্তর ক্ষোভে কেঁপে উঠল—
রফিক:
“হে দুরাচার! কেন মনুষ্যজাতিকে এমন কষ্ট দাও?”
শয়তান:
“মানুষ যখন নামাজে সিজদায় যায়, তখন আমি হিংসায় গলে যাই।
বেনামাজিরা আমার বন্ধু—তাদের আমি কষ্ট দিই না।
যারা নামাজ পড়ে, যিকির করে, নেক আমল করে—
আমি শুধু তাদের পেছনেই লেগে থাকি।
তাদের আমি ছাড়ি না!”
রফিক শয়তানের কথাগুলো শুনে আরও দৃঢ় হয়ে উঠল—
তার রূহানী যুদ্ধের পথ আরও পরিষ্কার হয়ে গেল।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৮:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





