আপনি পাহাড় বেয়ে উঠছেন ! এমন সময়ে পাহাড়ের পাদদেশে একটা হ্রদ দেখতে পেলেন ! একটু পানি খাওয়ার জন্য হ্রদের কাছে গিয়ে যেই পানি খেতে যাবেন তখনই দেখতে পেলেন হ্রদের কিনারে মানুষের মাথার খুলি পড়ে রয়েছে ! এবং তাকিয়ে দেখলেন কেবল একটা না ! সারা লেক এবং লেকের কিনারে মানুষের মাথার খুলি, হাতের হাড় পায়ের হাড় !
কেমন লাগবে শুনি ?
যদি খুব বেশি সাহসী না হন তাহলে ঘুরে দৌড় মারার সম্ভাবনা শত ভাগ ! সাহসী হলে হয়তো দাড়িয়ে রহস্য বোঝার চেষ্টা করবেন ! তবে মনে একটা প্রশ্ন আপনার জাগবেই যে এই জনমানব শূন্য পাহাড়ে এতো গুলো মাথার খুলি আসলো কিভাবে ?
আসলে ঠিক এমন একটা ঘটনাই ঘটেছিল ১৯৪২ সালে ! ভারতের রুপকুন্ডে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭০০০ ফুট উচ্চতায় পাহারের পাহেরের পাদদেশে একটা ছোট্ট উপত্যকায় এমন এটা লেকের সন্ধান পান ব্রিটিশ ফরেস্ট গার্ডের একটা দল ! জমাট বাঁধা সেই লেকের পানিতে এবং এর আশে পাশে দেখা যায় বেশ কিছু মানুষের হাড় মাথার খুলি আর কত কিছু !
যখন গ্রীষ্মকালে বরফ গলা শুরু করে তখন আরও হাড় গোড় খুলি আবিস্কার হয় ! প্রায় ২০০ লোকের কঙ্কাল পাওয়া যায় সেই লেক থেকে ! সেখান থেকেই কঙ্কালের হ্রদ বা স্কেলেটন লেক নামে জায়গাটা পরিচিত !
স্কেলেটন লেক উত্তর ভারতের নেপাল সীমান্তের কাছে অবস্থিত যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৮০০ মিটার উপরে অবস্থিত এবং বেশির ভাগ সময়েই বরফে ঢেকে থাকে ! প্রথম বারের মত যখন কঙ্কাল গুলো আবিস্কার হয় তখন প্রথমেই ধারনা করা হয় যে সেগুলো হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কোন জাপানিজ সৈনিকদলের হয়ে থাকবে ! যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হয়তো পালিয়ে কিংবা লুকিয়ে থাকার সময়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকবে !
আবার কেউ কেউ মনে করলো আসলো কঙ্কাল গুলো ভারতীয় সৈন্যদের ! কাস্মীরের জেনারেল জরাওয়ার সিং এবং তার দলের ! তিব্বত যুদ্ধ চলা সময়ে হঠাৎ করে জেনালের জটাওয়ার সিং তার সৈন্য দল নিয়ে গায়েব হয়ে যান ! ধারনা করা হয় যে এই লেকে এসে বিরূপ আবাহাওয়ার কারনে জেনারেল মারা পড়েন !
কিন্তু স্থানীয় মিথ আছে যে কঙ্কাল গুলো আসলে হিমালয় দেবীর অভিসাপের ফলে মারা কোন বিদেশী পর্যটক কিংবা বনিক দলের ! মিথ বলে হিমালয় দেবী তার এলাকায় বহিরাগতদের কিছুতেই সহ্য করতেন না ! একবার একদল লোক হিমালয় দেবীর এলাকায় ঢুকে পড়ে তখন ক্ষিপ্ত হয়ে দেবী তাদের উপর পাহাড় ধস নামান !
এরকম আরও অনেক কথা প্রচলিত আছে ! অনেক টা সময় এই কঙ্কাল লেকের রহস্যটা রহস্যই রয়ে যায় ! কিন্তু ২০০৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একদল বৈজ্ঞানিক কঙ্কাল হ্রদের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায় ! এবং আশ্চার্য এক আবিস্কার করে বসে ! তারা সেখান থেকে বেশ কয়েকটি কঙ্কাল নিয়ে আসে যেটাতে কিছু মাংস এবং চুল লেগেছিল ! সারা বছর বরফ দিয়ে আচ্ছাদিত থাকার কারনে সেগুলো কোন রকমে টিকে আছে !
ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আশ্চার্য একটা তথ্য সামনে আসে !
হাড় খুলী গুলো প্রায় ১২০০ বছর পুরোনো ! ৮৫০ এডি সময়কার ! ভাবা যায় ?
এবং আরও একটি চমকানোর মত তথ্য পাওয়া যায় সেই সমস্ত হাড়গোড় পরীক্ষা করে ! তা হলো কঙ্কালগুলো দুটি আলাদা বৈশিষ্ট্যের দলভুক্ত। একদলের ডিএনএর বৈশিষ্ট কাছাকাছি পর্যায়ে অর্থাৎ তারা একই শ্রেনী কিংবা পরিবারের অন্তভুক্ত এবং অন্য দল সম্ভবত তাদের গাইড জাতীয় কেউ ছিল যারা ঐ দলটাকে পথ দেখিয়ে এই উপত্যকা পার করিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল !
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে তারা কিভাবে মারা গিয়েছিল ? কেউ কি তাদের কে হত্যা করেছিল ? কঙ্কাল গুলো পরীক্ষা করে আরও জানা যায় যে গোল জাতীয় শক্ত কিছু আঘাতে তাদের মৃত্যু হয়েছে এবং সেই গোল জাতীয় জিনিস টা খুব বেশি বড়ও নয় ! টেনিল বলের কাছাকাছি হবে ! এবং আঘাত গুলো কেবল মাথায় আর কাধে ! সারা শরীরে আর আঘাত নেই ! এর অর্থ, কেবল একটাই হতে পারে যে উপর থেকে হঠাৎ করে কিছু তাদের উপর পরেছে ! এবং মাথা গোজার ঠাই না পেয়ে তারা সেই শক্ত গোলাকার কিছুর আঘাত পেয়ে মারা গেছে !
ধারনা করা হয় যে কোন বরফ নয় বরং প্রচন্ড শিলা বৃষ্টির কারনে সেই অভিযাত্রীদের মৃত্যু হয় ! হ্যা এটা সত্যি যে শিলা বৃষ্টির শিলাখন্ডের আয়তন স্বাধারনত এতো বড় হয় না কিন্তু পরিসংখ্যান বলে যে বড় শিলাখন্ড কিংবা শিলাবৃষ্টির অভিজ্ঞতা পৃথিবীর মানুষের আছে ! সব থেকে ভয়ানক যে শিলাবৃষ্টি হয়েছিল ইএসএতে যার শিলাখন্ডের দৈর্ঘ্য ছিল আট ইঞ্চি এবং ওজন ছিল প্রায় দুই পাউন্ড ! তাছাড়া ইতিহাতের সব থেকে ভয়ানক শিলাবৃষ্টিটি হয়েছিল এপ্রিল ৩০, ১৮৮৮তে উত্তর ভারতের জেলা গুলোতে । এতে প্রান হানি হয় প্রায় ২৩০ জনের এবং এই বৃষ্টিতে শিলাখন্ড গুলো প্রায় কমলালেবুর মত বড় ছিল !
তাই ধারনা করা হয় কঙ্কাল হ্রদের মানুষ গুলোর উপর এই শিলাবৃষ্টিই আঘাত এনেছিল এবং উপত্যকার কোথাও মাথা গোজার মত স্থান না পেয়ে তারা মারা গিয়েছে ! আসলে কঙ্কাল হ্রদের মানুষ গুলো কিভাবে মারা গিয়েছিল তার রহস্য হয়তো কোন দিনই জানা যাবে না ! এভাবে রহস্য হয়ে বেঁচে থাকবে আমাদের পৃথিবীর বুকে !
কয়েকটি ভিডিও দেখতে পারেন
ভিডিও এক
ভিডিও দুই
ভিডিও তিন
ভিডিও চার
তথ্য সুত্রঃ
Skeleton Lake of Roopkund, India
Mystery Solved – The Skeleton Lake of India
The Skeleton Lake of Roopkund, India
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



