somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভ্রমন ব্লগঃ তৃতীয় বারের মত কেউক্রাডং ভ্রমন

২৬ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথমবার কেউক্রাডংয়ের চুড়াতে উঠেছিলাম ২০১৩ সালে । ভার্সিটির কয়েকজন বন্ধু মিলে সেই ট্যুর প্লান হয়েছিলো । এরপর অন্য অনেক স্থানে যাওয়া হলেও বান্দরবানের দিকে আসা হয় নি । গতবছর আবারও কেউক্রাডংয়ে উঠলাম যখন তখন মনে হল যে এবার থেকে প্রতিবছর একবার করে এই চুড়ায় উঠতে হবে । এই বছর করোনা না আসলে হয়তো আরও আগেই এই ট্যুরটা দেওয়া হত । শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার ২২ শে অক্টোবর বান্দরবনের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়ে দিলাম তৃতীয়বারের মত কেউক্রাডংয়ের চুড়ায় ওঠার জন্য ।

বহস্পতিবার রাতে বাসে উঠলাম আমরা । শুক্রবার সকাল বেলা পৌছালাম বান্দরবান । বলতে গেলে সারারাতই বৃষ্টি হয়েছে । সকালেও বৃষ্টি পড়ছিলো । সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চেপে বসলাম জীপ গাড়িতে । বান্দরবান শহর থেকে রোমা বাজার পর্যন্ত পাহাড়ি রাস্তা বেশ খারাপ । আগের বছরেরও রাস্তা এতো খারাপ ছিল না । পাকা রাস্তায় গর্ত ভর্তি । সেই জন্য ঝাকি লাগছিলো খুব বেশি । প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে কত টুরিস্ট গাড়ি যায় রোমা কিংবা থানচির উদ্দেশ্য । পর্যটন শিল্পের জন্য উন্নত রাস্তা ঘাট খুবই দরকারই একটা জিনিস । সরকার এসব দিকে কেন লক্ষ্য রাখে না কে জানে ।
রোমা থেকে আর্মি চেকিং শেষ করতে বেশ সময় লাগলো । গতদিন পুজার ছুটির কারণে অনেক ট্যুরিস্ট গিয়েছিলাম । রোমার আর্মিক্যাম্প থেকে তোলা একটা ছবি । দুরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে । পাশে একটা মন্দির ।



রোমা বাজার থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে রওয়ানা দিলাম বগালেকের দিকে । রোমা থেকে ৪০/৪৫ মিনিটের ভেতরে পৌছে গেলাম বগা লেগে । রোমা থেকে বগালেক পর্যন্ত রাস্তা ভাল। এই যাত্রাটা ভাল হল । বগাতে এসে আর্মি চেকিং করে আমরা কটেজে হাজির হলাম । বাইরে তখনও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে । কটেজটা একেবারে বগালেকের উপরেই । বারান্দাতে বসেই লেকের দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায় । প্রতিবছর এই কেউক্রাডংয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে এই বগালেকের মনরম দৃশ্য একটা কারণ । এতো চমৎকার দৃশ্য লেক আমি নিজ চোখে আর দেখেছি কিনা আমি মনে করতে পারি না । এক ভাবে তাকিয়েই থাকা যায় । অন্য কিছু ভাবা লাগে না । আর এই লেকের দৃশ্য একেক সময়ে একেক রকম মনে হয় ।
বগা লেকের এই দৃশ্যটা গত বছরের


এই ছবিটা গত শুক্রবারের । বৃষ্টির ভেতরে যখন বগা লেকে এসে পৌছালাম


আর এই ছবিটা আসার দিন তোলা ।



ইউটিউব ভিডিতে এক

ইউটিউব ভিডিও দুই


দুপুরেও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিলো । আমি মূলত কটেজের বারান্দাতে বসেই তাকিয়েছিলাম লেকটার দিকে । বিকেলের দিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল । আকাশও মোটামুটি পরিস্কার হয়ে গেল তখন । আমরা পুরো বগালেকে ঘোরাঘুরি করলাম । চা খাওয়া আড্ডা দেওয়া । দুইটা গ্রুপকে দেখলাম তারা বারবিকিউ করছে । রাতে খাওয়া শেষ করে আরও কিছু সময় আড্ডা দিয়ে কটেজে শুতে গেলাম । ভেবেছিলাম মেঘ কেটে গেছে যেহেতু তাই রাতে আর বৃষ্টি হবে না । আমাদের কয়েকজন তাই কটেজের বারান্দাতে শুয়েছিলো কিন্তু রাতে এমন ঝুম বৃষ্টি নামলো যে বলার কথা না ।


পরদিন শনিবার । সেদিন সকালেও প্রচুর বৃ্ষ্টি ছিল । আমাদের তো ভয়ই লাগছিলো যে এতো বৃষ্টির ভেতরে আমরা কিভাবে যাবো । তবে আটটার ভেতরেই বৃষ্টি থেমে গেল একেবারে । কিন্তু মেঘ পরিপূর্ন রইলো আকাশ । এটা আমাদের জন্য খুব বড় একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল । রোদ থাকলে পাহাড়ে হাটা খুবই কষ্ট কর । আবার খুব বৃষ্টি হলেও সমস্যা । নয়টার সময়ে আমরা রওয়ানা দিলাম কেউক্রাডংয়ের উদ্দেশ্যে । আমাদের কেউক্রাডংয়ের চুড়াতে পৌছাতে প্রায় ৫ ঘন্টা লেগে গেল। মাঝে যদিও ঘন্টাখানেক সময় গেল পথের চিংড়ির ঝর্নার পেছনে ।

পথে চলতে কিছু ছবি



আসলে ছবিতে এই সব সৌন্দর্য কোন ভাবেই ফটিয়ে তোলা সম্ভব না । আপনি এই ছবি গুলো দেখে আসল সৌন্দর্যের ১০ ভাগও উপলব্ধি করতে পারবেন না । নিজ চোখে তাকিয়ে দেখার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে সেটা কোন ভাবেই লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না ।

কেউক্রাডংয়ে পৌছে আবারও আমরা আর্মি ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করে কটেজে অবস্থান নিলাম । কেউ কেউ গোসল করলো । নিচ থেকে ঝর্নার পানি তোলা হয় পাম্পের সাহায্যে । প্রচুর ঠান্ডা পানি ।
শনিবার পুরো আকাশ ছিল মেঘলা । আর প্রচুর বাতাশ । আমরা চুড়ায় দাড়াতে পারছিলাম না কিছুতেই ঠান্ডার কারণে । ভাগ্য ভাল যে সাথে করে একটা চাদর নিয়ে গিয়েছিলাম তার টিকে ছিলাম কোন মতে ।
চুড়ায় দাড়িয়ে চারিদিকে তাকালে সব কিছু অন্য রকম মনে হয় । সব কিছু যেন বদলে যায় । আপনার মনে যত তীব্র কষ্টের অনুভূতিই থাকুক না কেন কিংবা আপনার জীবন যত কঠিনই হোক না কেন এই চুড়ায় দাড়িয়ে আপনি যখন সামনে তাকাবেন আপনার বাকি সব কিছু তুচ্ছ মনে হবে । কেবল মনে হবে জীবন চমৎকার । সত্যিই চমৎকার !

রাতে খাওয়া শেষ করে চুড়ায় কিছু সময় বসার আশা ছিল কিন্তু এতোই তীব্র বাতাস ছিল যে আমি কোন ভাবেই বসতে পারলাম না । আমার শীতের ভাবটা একটু বেশি । তবে অনেকে বসেছিলো ।

রবিবার শেষ দিন ।

খুব সকালে আমি ঘুম থেকে উঠলাম । গিয়ে হাজির হলাম চুড়ায় । তখনও সেখানে কেউ আসে নি। তখনও বেশ ভালই বাতাস হচ্ছিলো তবে আকাশ ছিল মেঘ মুক্ত । তাই বাতাস এতোটাও হাড় কাঁপানো ছিল না । আকাশ লাল হয়ে এল । এখনই সূর্য উঠবে । ছবি দিয়ে ভাল ভাবে বোঝা সম্ভব না । তবুও কিছু ছবি দিয়ে দিলাম



সূর্য উদয়ের আগের মুহুর্তের ভিডিও

পরিপূর্ন সূর্যোদয়ের ভিডিও


সকালে আমরা নাস্তা করলাম দার্জিলিং পাড়াতে । তারপর আবারও হাটা শুরু । আসার আগে আর্মি ক্যাম্প থেকে সাইন আউট করতে হল । এবার যেহেতু নামতে হচ্ছে তাই কষ্টের পরিমান উঠার থেকে কম । সময় লাগলও কম । দুপুর বারোটার আগেই পৌছে গেলাম বগালেকে । সেখান থেকে গোসল শেষ করে আর্মি ক্যাম্প থেকে সাইন আউট করে আবারও রোমা বাজারে । সেখানেও সকল ফর্মালিটিস শেষ করে দুপুরের খেয়ে রওয়ানা দিলাম বান্দরবন শহরের দিকে । রাতের খাবার খেয়ে উঠলাম বাসে । আজকে সকালে অর্থ্যাৎ ২৬ তারিখ ঢাকা পৌছে গেলাম । ভ্রমন শেষ হল ।

ভ্রমন বিষয় কিছু কথা ।

১. এইবার আমরা গিয়েছিলাম পুজার ছুটির সময় । তাই প্রচুর মানুষ ছিল যা ভ্রমনের আনন্দকে মাটি করে দিয়েছে কিছুটা । যেখানে লোক বেশি যেখানে মজা কম । গতবার যখন গিয়েছিলাম তখন কেউক্রাডংয়ের চুড়াতে মাত্র তিনচারটা গ্রুপ ছিল । নিরিবিলি চমৎকার ছিল বেশি । তাই চেষ্টা করবেন এই রকম ছুটির দিন গুলোতে না যাওয়ার জন্য । তাহলে আসল মজা পাবেন না ।

২. বগা লেক পর্যন্ত যেতে আপনাকে হাটতে হবে না । গাড়িতে করেই যেতে পারবেন । সুতরাং হাটতে না চাইলে কেবল বগালেক পর্যন্ত ভ্রমন করতে পারেন ।

৩. পুরো ভ্রমনে আপনাকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না মোটেও । সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত আর্মি পথ ঘাটের নিরাপত্তা দেয় । এই সময়ে হাটাহাটি করলে কোন সমস্যা নেই । গভীর রাত পর্যন্ত বগালেক কিংবা কেউক্রাডংয়ে বসে আড্ডা দিলেও কোন সমস্যা নেই । এছাড়া বগালেক এবং কেউক্রাডংয়ে ওয়াসরুমের ব্যবস্থা রয়েছে । বলবো না যে একেবারে হাইফাই অবস্থা তবে কাজ চালানোর মত বেশ ভাল । কটেজ বলতে সিঙ্গলে রুম পাওয়া যাবে না । এখানে একেকটা গ্রুপের জন্য আলাদা রুম বরাদ্দ থাকে । মাথাপিচু টাকা দিতে হয় ।

৪. এইখানে নিজে নিজে ট্যুর প্লান করাটা একটু কষ্টের । কারণ গাইড ঠিক, কটেজ ভাড়া সহ আরও নানা রকম ঝামেলা রয়েছে । এই জন্য গ্রুপের সাথে আসাই ভাল । এখন বেশ কিছু ট্যুর গ্রুপ রয়েছে যারা চমৎকার সার্ভিস দেয় । আমি ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স গ্রুপের সাথে এসেছিলাম । গতবছরেও এদের সাথে এসেছিলাম । এদের সার্ভিস ভাল এবং মান সম্মত । এখানে আপনি কেবল ভ্রমনের জন্য পেমেন্ট করবেন । আর কোন চিন্তা করতে হবে না আপনাকে । বাকিটা ওরা সামলাবে ।

২০১৩ সালে দেওয়া ট্যুরের ব্লগ পোস্ট


ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স গ্রুপের লিংক এছাড়া আরও বেশ কিছু আছে ফেসবুকে । যে কোন একটি গ্রুপের সাথে যেতে পারবেন । আমি গিয়েছি কয়েকটার সাথে তবে ট্যুরন্তের সার্ভিস সব থেকে বেশি ভাল মনে হয়েছে আমার কাছে ।

আজকের ভ্রমন ব্লগ এখানেই শেষ ।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১২:২৭
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ সকাল

লিখেছেন জুন, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৩৪


আমার ছোট বাগানের কসমসিয় শুভেচ্ছা।

আজ পেপার পড়তে গিয়ে নিউজটায় চোখ আটকে গেল। চীন বলেছে করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি ভারত আর বাংলাদেশে, তাদের উহানে নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মায়াময় ভুবন

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:২৯

এ পৃথিবীটা বড় মায়াময়!
উদাসী মায়ায় বাঁধা মানুষ তন্ময়,
অভিনিবিষ্ট হয়ে তাকায় প্রকৃতির পানে,
মায়ার ইন্দ্রজাল দেখে ছড়ানো সবখানে।

বটবৃক্ষের ছায়ায়, প্রজাপতির ডানায়,
পাখির কাকলিতে, মেঘের আনাগোনায়,
সবখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০


ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

কেন?
কারন আল্লাহ মুসলমানদের জন্য মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ করেছেন। ভাস্কর্য বানালে এক সময় এগুলা মূর্তি হয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিমায় পরিনত হবে। মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

উহানের দোষ এখন বাংলাদেশ বা ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:১৯



আমরা বাংলাদেশীরা বাদুড়ের জিন থেকে আসিনি ভাই । না বাদুড় খাই, না খাই প্যাঙ্গোলিন বা বন রুই । আমাদের কোন জীবাণু গবেষণাগার নেই , নেই জীবাণু অস্ত্রের গোপন... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দি সান", একটা বৃটিশ টেব্লয়েড, এদের কথায় নাচবেন না

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৭



বাংলাদেশে টেব্লয়েড পত্রিকা আছে, নাকি বাংলাদেশের সব পত্রিকাই টেব্লয়েড? টেব্লয়েড পত্রিকাগুলো ইউরোপ, আমেরিকায় স্বীকৃত মিডিয়ার অংশ, এরা আজগুবি খবর টবর দেয়; কিংবা খবরকে আজগুবি চরিত্র দিয়ে প্রকাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×