somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট বেলার সেই শীতের পিঠা উৎসব গুলো আজ আর নেই !

০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গতদিন বাইরে এতো ঠান্ডা ছিল যে সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সাহস করি নি । গনপরিবহনে যাতায়াত করেছি । কিছুটা পথ বাসে কিছুটা রিক্সায় আবার কিছুটা হেটে । আমার রাস্তায় এই হাটলে সব থেকে বড় যে সমস্যাটা হয় সেটা হচ্ছে সামনে যে খাবার চোখে পড়ে সেই জিনিসই আমার খেতে ইচ্ছে করে । ঝালমুড়ি থেকে শুরু করে পুড়ি, চপ ছোলা যা সামনে আসে সব কিছু । এটা আমার সেই ছোট বেলার অভ্যাস । সাইকেল হলে বারবার থেমে খাওয়াটা একটু ঝামেলার । সাইকেল চালানোর শুরুর পর থেকে তাই স্ট্রিট ফুড খাওয়া কমে গেছে অনেক । যাই হোক কাল যা সামনে এসেছে মোটামুটি সবই পেটের ভেতরে চালান দিয়েছি । একেবারে শেষে ফেরার পথে চোখ পড়লো পিঠার দোকানের দিকে । একটু আগেই ঝালমুড়ি খেয়েছি । তারপর মনে হল একটা খেলে কোন সমস্যা হবে না । বাসায় যেতে এখনও কম করে হলেও ঘন্টা খানেক সময় লাগবে । এতো সময় পেট খালি থাকবে নাকি !

দাড়িয়ে গেলাম পিঠা খেতে । তখনই চোখ গেল লোকটার দিকে । আমার থেকে কয়েক বছর বড়ই হবে । পরনে বাসায় পরা ট্রাউজার আর চাদর । বুঝতে কষ্ট হল না যে লোকটার বাসা আসে পাশেই । সে একটা হটপট নিয়ে এসেছে । গরম গরম পিঠা বানাচ্ছে আর সেই হটপটে ঢোকানো হচ্ছে । হিসাব করে দেখলাম কম করেই ১২/১৫টা ভাপা ও চিতই পিঠা সে নিলো। নিশ্চিত ভাবেই আজকে তাদের বাসায় পিঠা উৎসব হবে ।

যখন ছোট ছিলাম তখন শীতকালটা আমাদের কাছে বিশেষ পছন্দের ছিল এই পিঠা উৎসবের কারণে । বিশেষ করে ধুপি পিঠা কিংবা ভাপা পিঠা বানানোর দিন যেন পুরো বাড়িতে একটা আলাদা উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হত । কারণ ভাপা পিঠা বানানো একটা হ্যাপার কাজ ছিল । প্রথমেই চাল গুড়ো করতে হত । গ্রামে তখন ছিল ঢেকির প্রচলন । আমাদের বাসার পাশেই একজনের ঢেকি ছিল । প্রায়ই দিনই আমরা সেই ঢেকির আওয়াজ শুনতে পেতাম । চাল কুটে নিয়ে আসার পরে সেগুলো ছাদে কিংবা উঠনে রোদে দেওয়া হত । আমাদের বাচ্চাদের মাঝে মাঝে সেই চাল পাহারাও দিতে হত । চাল তৈরি হয়ে গেলে এরপর আসতো ঢাকনা কাঁটার ব্যাপার । আপনারা জানেন যে ভাপা পিঠার জন্য পানির ভাপ নিয়ে হাড়ির উপরে একটা ঢাকনা রাখতে হয় এবং সেই ঢাকনাতে ছিদ্র করতে হয় । বেশির ভাগ সময়ই সেই ঢাকনার একটা মাথা কেটে ফেলা হত । এই একটা কাঁটা ঢাকনা দিয়েই আশে পাশে সবাই ভাপা পিঠা বানাতো । আমরা ছোট রা সেই কাটা অংশ টুকু নিয়ে খেলা করতাম । তারপর সেই ঢাকনা হাড়ির উপরে বসিয়ে আলাদা ভাবে আটা দিয়ে আটকিয়ে দেওয়া হত যাতে করে কেবল একটা নির্দিষ্ট অংশ দিয়েই ভাপ বের হয় । অন্য দিক দিয়ে গরম ভাপ যদি বের হয় তাহলে পিঠা ভাল হবে না । মাঝে মাঝে সেই সংযোগ খুলে যেত তখন আবারও সেগুলো বন্ধ করতে হত ।

এরপর যখন সন্ধ্যা বেলা পিঠা বানানো হত ততখন আমরা ছোটরা রান্নাঘরে চুলার আশে পাশে ভিড় করতাম । আমার মনে আছে আমার জন্য আলাদা ভাবে গুড় দিয়ে পিঠা বানানো হত । আমি কেবল পিঠার গুড় দেওয়া অংশ গুলো খেয়ে বাকি টুকু খেতাম না । তাই পুরো অংশ টুকুই গুড় দেওয়া হত । এভাবে একের পর এক পিঠা বানানো হত তারপর সেগুলো সবাইকে সরবারহ করা হত । পুরো সময়টা একটা উৎসব মূখর পরিবেশ বিরাজ করতো !

কিন্তু এখন শহর অঞ্চলে এই ব্যাপারটা কল্পনাই করা যায় । এখানে পরিবেশ পরিস্থিতি কিংবা উপায়ও সম্ভবত নেই । অবশ্য এমনটা হবে সেটাই স্বাভাবিক । আর এখন প্রতিটি এলাকাতেই পিঠা ঘর থাকে। সেখান থেকেই মানুষ নানান ধরনের পিঠা খেতে পারে । আমি যেখানে থাকি সেখানেই প্রায় সাত আটটা দোকান বসে নিয়মিত । এতো কম কষ্টে যখন কাজ হচ্ছে তখন মানুষ কেন কষ্ট করবে । তবে গ্রামের দিেকও কিন্তু মানুষ এখন আর এতো পরিশ্রম করে না । আরও সহজ হয়ে গেছে সব কিছু ।

বছর দুয়েক আগে শীতের কথা । গ্রামে গিয়েছি । একদিন মা বলল যে আজকে ভাপা পিঠা বানানো হবে । কিন্তু আমি খেয়াল করে দেখলাম যে কোন তৎপরতা নেই । না চাল কুটা না ঢাকনা কাটা কিংবা অন্য কোন কাজ নেই । অথচ সন্ধ্যার একটু পরে ঠিক ঠিক আমার ঘরে পিঠা এসে হাজির হল । ভাবী একা হাতেই সব পিঠা বানিয়ে ফেলেছে । আগে পিঠা বানাতে কত ঝামেলা করতে হত এখন সেই সবের কিছুই করতে হয় না । যেমন পিঠার জন্য আটা আর ঢেকিতে ভাঙ্গতে হয় না । সেটা পাওয়া যায় কিনতে । আর এখন রাইস কুকারে খুব সহজেই পিঠা বানানো যায় । পাঁকা রান্না ঘরে রাইস কুকারের ভেতরেই পিঠা তৈরি হয়ে যাচ্ছে ।

বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে কত সহজ করে দিয়েছে অথচ আবার কত কিছু কেড়েও নিয়েছে । আমার ভাইয়ের ছেলে কোন দিন আমার মত পিঠা বানানোর ব্যাপারটা দেখে নি । সে ছোট থেকেই দেখেছে যে তার মা চট করে রাইস কুকারে পিঠা বানিয়ে তাকে দিচ্ছে । সে কোন দিন আমাদের মত সেই সকাল থেকে পিঠা খাওয়ার আয়োজনটা দেখতেই পাবে না । আমরা যে আনন্দের ভেতরে বড় হয়েছি সেটা হয়তো কোন দিন উপলব্ধি করতে পারবে না ।

pic source
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১২:১৭
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার বর্ণবাদী লরা লুমার এবং ভারতীয় মিডিয়া চক্রের বিপজ্জনক ঐক্য

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


লরা লুমার নামে আমেরিকায় একজন ঘৃণ্য বর্ণবাদী, কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আছেন। তিনি ট্রাম্পের অনুগত হিসেবে পরিচিত। তার মুখের ভাষা এত জঘন্য যে ট্রাম্পের অনেক ঘোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুকতারা

লিখেছেন সামিয়া, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১



তুমি আমাকে যে জায়গায় রেখে গিয়েছিলে, সেই জায়গাটা ধীরে ধীরে একটা ভূগোল হয়ে গেছে। সেখানে সময়ের নিজস্ব কোনো ঘড়ি নেই, ঋতুর আলাদা নাম নেই, কেবল স্থিরতা আছে, যেন দুপুরবেলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শূন্য বুক (পিতৃবিয়োগ)

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৪


চার
রোববার বেলা ১১টার মধ্যে জাহাঙ্গীর গেটের সামনে এসে পৌঁছাল গাড়ি। মৃণাল আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে বসেছিল। চালক উত্তরা এসে ফোন করেছিল। যাহোক, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে মা-বাবা আর মামার সঙ্গে বারডেমে চলল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওয়াশিংটন থেকে বেইজিং: বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫


মার্চ ২০২৬-এর ক্যালেন্ডার বলছে, বাংলাদেশের কূটনীতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে । একই সময়ে বাংলাদেশের তিনজন হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব আমেরিকার মাটিতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিউ ইয়র্কে ব্যস্ত নিজের ক্যাম্পেইনে। সেনাপ্রধান জেনারেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেইন্ড সালাউদ্দিন ওরফে শিলং সালাউদ্দিন ওরফে সংবিধান সালাহউদ্দিন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০


ট্রেইন্ড সালাউদ্দিন ওরফে শিলং সালাউদ্দিন যিনি দীর্ঘসময় ভারতের তত্ত্বাবধানে শিলংয়ে সংবিধানের ওপর পিএইচডি করেছেন ফলে উনি এখন সংবিধান সালাহউদ্দিন যার সুফল এখন আমরা পেতে চলেছি। ইতোমধ্যেই আপনারা লক্ষ্য করেছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×