somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দীন শরৎ বলে

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পশ্চিমাকাশে গোধূলীর স্বর্ণালী আলো যখন শেষ বিন্দুতে উঁকিঝুকি মারে তখন গ্রামের কর্মঠ মানুষ সারা দিনের জমানো ক্লান্তি সূর্যের কাছে বিসর্জন দিয়ে ঘরে ফিরেন। কেউ দু’মুটো ভাত পেটে দিয়ে বিছানায় শরীর বুলান রঙ্গীন স্বপ্ন নিয়ে। আবার কেউবা পাশের বাড়ির বৈঠকখানায় খুঁপির নিমুঝিমু আলোতে জড়ো হোন একতারা-দু’তারা আর ডপকি হাতে নিয়ে। তাঁরা গান বাঁধেন, সুর করেন আবার তারাই গান ধরেন।

আমরা যারা ছোট ছিলাম তাঁরা তাদের গায়ে গা ঘেসে নিশ্চুপ বসে গান শুনতাম। গান চলতো একের পর এক। ভিন্ন ধাচের, ভিন্ন লেখকের, ভিন্ন সুরের। একতারা, দু’তারার হৃদয়কাড়া টুংটাং আওয়াজ, ডপকির তাল আর গায়কের ধরাজ কণ্ঠ মনের মধ্যে শীতল অনুভূতি সৃষ্টি করতো। ভাবকাতুর মানুষ মাথা ঝুলিয়ে গানের ছন্দেছন্দে উপভোগ করতেন সন্ধা গড়িয়ে গভীর রাতের এই আয়োজন।

তখন থেকেই একজন লেখকের নাম কেন জানি মনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল। তাঁর প্রতিটি গানেই একই সুর, একই ছন্দ, এই লয়। আর তখন শ্রোতা এবং গায়কের অনুভূতিও একই সুতোয় বাঁধা পড়ে। তিনি শরৎ চন্দ্র দাশ। গানের ভনিতাতে ‘দীন শরৎ’ নামেই পরিচিত। তাঁর লিখা মনঃশিক্ষা ও বিচ্ছেদ গানগুলো এখনও মানুষের মনে ভাবের রস যোগায়, বিচ্ছেদের করুন সুর মনে রক্তক্ষরণ ঘটায়। তিনি লিখেছেন অসংখ্য ধামাইল গান, লিখেছেন মনঃশিক্ষা, আর অসাধারণ ভঙ্গিমায় গুরু শিষ্যের প্রশ্ন-উত্তর নিয়ে দেহতত্ত্বের গান।

বাংলার লোকগীতিতে যেমন ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ সবার কাছে সুগৃহীত, ঠিক তেমনি বাংলার দেহতত্ত্ব অথবা মনঃশিক্ষা গানের পরতে পরতে ‘দীন শরৎ বলে’ ভনিতাটি সুপ্রতিষ্ঠিত। তাইতো বাংলার ভাবকাতুর মানুষের হৃদয়ে এক সুউচ্চ স্থান দখল করে আছেন দীন শরৎ চন্দ্র দাশ। সেটা হোক এপার বাংলা অথবা ওপার বাংলায়। ছোটবেলায় টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দু’চোখ হারানো এই ভাবুক কবির প্রতিটি গানেই বিরহ আর আধ্যাত্মবাদের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। তাইতো তিনি বিরহবোধ থেকেই রচনা করেছেন হৃদয়ছোঁয়া চিরন্তন পঙক্তিমালা। তাঁর একটি গানে অতি চিন্তার কুফল মনে কীভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে তা ভেঁসে উঠেছে সুচারুভাবে। তিনি লিখেছেন-

চিন্তা হইতে চিতা ভাল, চিতায় মরা মানুষ পুড়ে
এগো জিয়ন্তে পুড়াইয়া মারে, চিন্তায় যারে ধরে।

তাঁর মনঃশিক্ষা পর্বের গানগুলোতে তিনি জীবনে সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দিয়েছেন মনোরম সব শব্দ প্রয়োগ করে। মানব মনের ছয়টি রিপু যেমন- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য কীভাবে জীবনকে কলুষিত করে, কীভাবে অন্ধকারের গভীর তলে ঠেলে দেয় তা অবলীলায় লিখে গেছেন তিনি।

ছয়টি বলদ হালে জুড়ি, ভক্তি লাঙ্গলে কষে ধরি
দীন শরৎ বলে কৃষি কর, গুরু বীজ বপন করি।

আমাদের আদিগ্রন্থ চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে বাউল সাধকগণ তাদের গানে যেমন রূপক বা তাত্ত্বিক শব্দের ব্যবহার করেছেন সেক্ষেত্রেও কম যাননি আমাদের অন্ধবাউল দীন শরৎ চন্দ্র দাশ। তিনিও তাঁর গানে অনেক শব্দ রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন।

গুরু-শিষ্যের প্রশ্ন-উত্তর পর্বের গানগুলোতে শিষ্যের জিজ্ঞাসু মনের খোরাক যোগিয়েছেন তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় গুরু। শিষ্যের মন-মানসে যেমন রয়েছে দেহতত্ত আর মনঃশিক্ষা নিয়ে জানার কৌতূহল ঠিক তেমনি তাঁর গুরুও দিয়েছেন তাত্ত্বিক সব প্রশ্নের সঠিক সমাধান। এই সাধকের গানে আছে নিগুঢ় তত্ত্বকথা আর আছে জীবনে চলার পথের দিক নির্দেশনা। তাঁর একটি গানে তিনি গুরুর কাছে জানতে চেয়েছেন-

এমন উল্টা দেশ গো গুরু কোন জায়গায় আছে
আকাশ পানে গাছের গোড়া, নিচ দিকে তার ডাল মেলিয়াছে ।

সে দেশের যত নদ-নদী, ঊর্দ্ধদিকে জলের স্রোত যায় নিরবধি
আছে নদীর নিচে আকাশ বাতাস, তাতে মানুষ বাস করতাছে ।

শিষ্য তাঁর গুরুর কাছে এমন একটি দেশের কথা জানতে চেয়েছেন যেখানে আকাশ পানে গাছের গোড়া আর নিচ দিকে তার ডালপালা ছড়িয়ে আছে। উল্টা দেশ মানে এখানে মাতৃগর্ভের কথা উঠে এসেছে। মাতৃগর্ভে সন্তানের দশ মাস দশ দিন আলো-বাতাস ছাড়া ঘোর অন্ধকারে বেঁচে থাকার চিরন্তন দৃশ্য বর্ণনা করেছেন তিনি।

লেখক শরৎ দাশ তাঁর গানে ‘এই দেশ’ আর ‘সেই দেশ’ নামে দুটি দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘সেই দেশ’ মানে যেখানে আমাদের সৃষ্টি আর ‘এই দেশ’ হচ্ছে আমাদের এই আলো বাতাসপূর্ণ পৃথিবী। মুখে আহার না করে, নাকে নিঃশ্বাস না নিয়ে, মলমূত্র ত্যাগ না করে যে দেশে বেঁচে থাকা যায়, সে দেশকে তো উল্টা দেশেই বলা যুক্তিযুক্ত। সে দেশের নিয়মনীতি তো অন্যরকম, স্বতন্ত্র। আবার সেই উল্টা দেশ থেকে এই দেশে মানুষ অবিরত আসছে! লেখকের কথায়-

সে দেশে যত লোকের বাস, মুখে আহার করেনা কেউ নাকে নাই নিঃশ্বাস
মলমূত্র সে ত্যাগ করে না, আবার আহার করে বাঁচতেছে ।

দীন শরৎ বলে হইলেম চমৎকার, চন্দ্র সূর্যের গতি নাই দেশে ঘোর অন্ধকার
সেই দেশের লোক অবিরত, এই দেশে আসতেছে ।

এবার শিষ্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তাঁর গুরু। যেখানে আছে গুরুর আক্ষেপ জড়ানো কথা। যে দেশে আমরা উর্দ্ধ পদে অধমুন্ডে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে বাস করেছি সে দেশকেই আমারা ভূলে যাই। সেই দেশকে ভূলে যাওয়া মানেই তো মা’কে ভূলে যাওয়া। দীন শরৎ এর গানে আছে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া, আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শব্দে গভীর জীবনবোধ। যা শাশ্বত। চিরন্তন।

মনরে সেই দেশের কথা এখন ভূলে গিয়েছ
উর্দ্ধ পদে অধমুন্ডে সেই দেশে বাস করেছ ।

(সেই দেশে) বিন্দুরূপে পিতার মস্তকে ছিলে, কাম রসে গর্ভবাসে প্রবেশ করিলে
রজ শুক্রের মিলন হয়ে তুমি স্থুলাকার ধরিয়াছ ।

ধর্মতত্ত্বে আছে আমাদের এই জড় জগৎ ক্ষিতি, অপ, তেজঃ মরুৎ এবং ব্যোম এই পাঁচটি উপাদান দ্বারা ঘটিত। যেখানে ক্ষিতি অর্থ মাটি, অপ অর্থ জল, তেজঃ অর্থ আগুন, মরুৎ অর্থ বায়ু এবং ব্যোম অর্থ শূণ্যলোক। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে এই পাঁচ উপাদানকে একত্রে পঞ্চভূত অথবা ভূতবাদ নামে আখ্যায়িত করা হয়। আমাদের শরৎ চন্দ্র দাশ মানব জন্মে এই পঞ্চভূতের প্রভাব তাঁর গানে গভীর ভাবে এঁকে দিয়েছেন।

ক্ষিতি, অপ, তেজঃ মরুৎ, ব্যোমেতে হল পঞ্চমাসে পঞ্চপ্রাণ ভৌতিক দেহেতে
সপ্তম মাসে গুরুর কাছে মহামন্ত্র লাভ করেছ ।

মায়ের গর্ভে নেই চাঁদ-সুরুজের আলো। আছে নিকষ কালো আঁধার। সেই তমসাচ্ছন্ন জলে ছিল আমাদের আবাস। এই পৃথিবীর কোথাও এভাবে কারো বেঁচে থাকার কথা নয়। তবে সেই দেশে মানুষ দিব্যি দশমাস দশ দিন বাস করেছে। বেঁচে থাকার জন্য আহার দরকার, সেই দেশে আহার করার রীতিনীতি একটু অন্যরকম। লেখকের কথায় -

চন্দ্র সূর্যের নাহিক প্রকাশ, জলের নিচে অন্ধকারে ছিলে দশমাস
ছিলে নাভিপদ্মে মাতৃনাড়ী, তাই দিয়ে আহার করেছ ।

অনেক সাধনার ফল আমাদের এই মনুষ্য জনম। অন্ধকার কারাগার হতে অনেক সাধনার দ্বারা আমাদের এই দেশে আগমন। কিন্তু এই জগত-সংসারে আসার ক্ষানিক পরেই আমরা আত্মসুখের জন্য দিশেহারা। এই দেশে কী রেখে গেলাম, কী দিয়ে গেলাম তার হিসেব নেই। আমাদের পরম সুখ লাভের জন্য আমরা কারো চরম ক্ষতি করতে দ্বিধাবোধ করিনা। তাই দীন শরৎ বলেছেন ‘ তুমি মিছে মায়ায় ভুলে রইলে, যাবার উপায় কি করেছ’।

দীন শরৎ বলে সাধনার ফলে, অন্ধকার কারাগার হতে এ দেশে এলে
তুমি মিছে মায়ায় ভূলে রইলে, যাবার উপায় কি করেছ ।

নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া গ্রামে এই সাধককবি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারানো এই সাধক আজ কালের স্রোতে আমাদের মনের আড়ালে চলে যাচ্ছেন। যার গান শুনে মনে শিহরণ লাগে, বড় আপন লাগে, সেই গান আর আপন কৃষ্টি তাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দৃষ্টি এখন পশ্চিমা সংস্কৃতিতে। অবশ্য তাতে আমাদের অবাক হওয়া ছাড়া আর কীই-বা করার আছে !

ছবিঃ গুগল



১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"জামায়াতে Cockroach" ............... বাংলাদেশের নতুন Cockroach পার্টি

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:০১

রবীন্দ্রনাথ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাও চেয়ে থাকেন (তর্কের খাতিরে) তো তাতে *জামায়াতে cockroach এর কোন বা/লটা ছিড়লো…? জামায়াত যেমন বাংলাদেশ চায়নি, তেমনি পাকিস্তানও চায়নি। মওদুদী এর নাম নামকরন করেছিলো নাপাকিস্তান….।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদির আকাশে সংঘাতের কালো মেঘ আর প্রবাসীদের পুরনো বন্দিদশা: আমাদের শ্রমবাজারের নতুন সংকট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮

বাইরে যুদ্ধাবস্থা, রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতিদের লাগাতার ড্রাফট-মিসাইল হামলা, আর অন্যদিকে সৌদি আরবগামী ফ্লাইটগুলো একে একে বাতিল বা স্থগিত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে আবারও এক মারাত্মক অন্ধকারের ছায়া নেমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×