গ্রামে আমাদের যৌথ পরিবার ছিল। আব্বারা তিন ভাই, আর আমরা চাচাতো ভাইরা সবাই মিলে ১২ জন, বিশাল পরিবার। আশির দশকের শুরুতে আব্বা গ্রামে পাকা দালান বানিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে শহরবাসী হওয়া শুরু করলাম। আশির দশকের শেষভাগে আমরা শহরে আসলাম, উদ্দেশ্য আমাদের পড়ালেখা, শহরের স্কুলে ভর্তি হওয়া। মা-বাবা সহ আমাদের যৌথ পরিবারের একাংশ শহরবাসী হলাম। এর কয়েকবছর পর চাচা শহরে আসলো। আরেক চাচার ছেলেরাও বিয়েশাদী করার পর শহরে চলে আসলো ২০০০ সালের দিকে।
অথচ গ্রামের বাড়ীতে সব ফ্যাসেলিটি আছে, ফ্রীজ, গ্যাসের সিলিন্ডার, পানির পাম্প, হাই কমোড, ডিশ কানেকশন। তারপরও কেউ গ্রামে থাকলো না। আব্বার খুব ইচ্ছে ছিল, সবাই গিয়ে গ্রামে কয়েকদিন থাকবো, বেড়াবো। কিন্তু কারো কোন সময় হয়ে উঠছিলো না। ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনীদের কারো পরীক্ষা, কারোও চাকুরীর ছুটি নাই, কেউ অন্য জেলায় থাকে, কেউ বা দেশের বাইরে, তাই কখনো কারো সময় হয়ে উঠে না। ৩-৪ বছর পর হঠাৎ কোন ঈদে সবার একসাথে হওয়া হয়। তারপরও কেউ না কেউ বাদ পড়ে যায়।
কিন্তু আমরা একবার সবাই একসাথে হয়েছিলাম, সেটা প্রায় ১০ বছর আগে, সবাই যার যত কাজ ছিলো, সব বাদ দিয়ে তুমুল বর্ষায় কাদামাখা হয়ে গ্রামে গিয়েছিলাম।কেউ ৫-৬ মাসের প্রেগনেন্ট অবস্থায়, কেউ অফিসের দরকারী মিটিং বাদ দিয়ে, কেউ পরীক্ষা বাদ দিয়ে হাজির হয়েছিলাম গ্রামে, কেউ ২ মাসের ছোট বাচ্চা নিয়ে। যে রাতে আব্বা মারা গিয়েছিল, তারপর দিন সকালে সবাই হাজির গ্রামের বাড়িতে। পুরো এক সপ্তাহ ছিলাম গ্রামে। ছোট ছোট ভাতিজা-ভাতিজী, ভাগ্নে-ভাগ্নী সবাই সারাবাড়ী ছুটে বেড়াচ্ছে, বৃষ্টিতে কাদা মাখামাখি হচ্ছে, একটা শোকাহত বাড়ীর পরিবেশটা তার ভুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবেশটা আব্বা দেখে যেতে পারলেন না।
এখনো আমরা গ্রামের বাড়ী যাওয়া হয় শুধু ঈদের দিন। সব কাজিন, চাচা চাচী, সবাই যাই। বছরে শুধু ঐ একদিন সবাই একসাথে হওয়ার চেষ্টা করি।
শেষবার গত ডিসেম্বরে গ্রামের বাড়ীতে গিয়েছিলাম ছেলেকে আব্বার কবর দেখানোর জন্য, কিন্তু আমাদের ঘরে যাওয়া হয় নাই, ঘরে তালা লাগানো ছিল, বিশাল বড়বাড়ী যেন মৃত্যুপুরী। আব্বার কবর থেকেই শহরে ফেরত আসলাম ভারাক্রান্ত মন নিয়ে।।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



