রাতের আয়নায় ফেরী করে দেখি নির্ঘুম চোখের কালিতে লেপটে আছে তেপান্তরের নিষ্প্রভ চাহনি আর ভালোবাসাহীন নিরুদ্দেশ কথামালা। ফেরার কোনো পথ নেই। ফেরার আগে ভেঙে গেছে খড়নিবাস। আমার চড়ুইসংসার। এখানে লেপ্টে আছে তার ঘামের গন্ধ-কামের গন্ধ। গন্ধের ভেতর বেড়ে উঠে লিকলিকে অপ্রাপ্তির সাপ আর বাড়তে বাড়তে খুলিতে করে আশ্রয়। আমার জীবন এক উপত্যকা। ধূসর তেপান্তর। লাল সাদা নীল পুষ্পভরা প্রান্তর চেয়ে চোখ মেলে দেখি ধূসর কালচে ঘাসে একাকার। আমি নারীত্বকে আড়াল করি। তেপান্তর আমাকেই আড়াল করে করে যায়।
তেপান্তরের ছুটে চলা রোদের সড়কে, বাতাসের পানসী বেয়ে উদ্দাম জলের নদী পেরিয়ে কোনো এক মৃত অন্ধকারে। তার হিয়ায় বাস করে পরম বন্ধু, হাতে জড়িয়ে থাকে অনিন্দ বাস্তব, আর সে ছুটে চলে অন্ধকারের পানে। সে চলার শেষ হয়েছে তবু তেপান্তরের চলা শেষ হয় না।
আমি ডাকি আপন সুরে। সুরে সুরে ধূসর ঘাসে বাতাস খেলে। কেন ডাকি সে আমি জানি, আমি বুঝি। বোঝে না কেবল তেপান্তর। বুঝতে পারলে পালায়। আমি আবার খুঁজে আনি। পালাতে পালাতে তেপান্তর আর খুঁজতে খুঁজতে আমি, দুজনেই খুব ক্লান্ত। তবু আমার ক্লান্তি ক্ষমা করে না কেউ। না প্রভু, না তেপান্তর।
আমার ছিলো নিদমহলা বাড়ী। বাড়ি আমার আয়নামহল। জলের পুকুর। তালতমালের ছায়ায় ছায়ায় পদ্মভাসা। ভাসতে ভাসতে ডুব, ভাসতে ভাসতে হঠাৎ করেই চুপ। তমালছায়ায় জমে উঠে অবিশ্বাসের দাগ। বুকের পাঁজরে সে দাগ লালচে কালো, কালচে লাল। ফুরোয় শরত, ফুরোয় আমার গান। নিস্তব্ধ রাতে স্পর্শে ভর করে শীতের হাওয়া। তুষারপাত। এই পতনের যাতনা কেউ জানে না। লেখা থাকে না ইতিহাসে। কেবল খুব গভীরে রক্তক্ষরণ। নির্ঘুমরাতে দীর্ঘ সন্তরণ। ডুব সাঁতারে হঠাৎ এসে তেপান্তর। আমি ভুল করেই জেগে উঠি। এই ভুলের কোনো প্রস্থানপথ নেই। কেবল ঘোলা জল। লোনা দিনযাপন।
আয়না ঘরের উঠোন জুড়ে কেবল দীর্ঘশ্বাস। নুয়ে পড়া লজ্জাবতী পাতার পাশে হাসনাহেনার ঝাড়। সাপের বাসর। বাসর আমার পুড়ে পুড়ে যায় তাপদহনে। আমি তমালছায়ায় তুষারপাতে তেপান্তরে পুড়ি। তেপান্তর অন্য কোনো অন্ধকারের টানে ভরা রোদে পুড়ে। আমার চোখ রেখে সে অন্য চোখে থাকে। আমার চুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে অন্য ছবি আঁকে।তেপান্তর তিন ফসলের উন্মাদনা নিয়ে ঘোরে। অর্ধযুগপূর্বের কোনো এক চাষীর জন্যে বীজ জমিয়ে রাখে সুরক্ষিত গোলাঘরে। আমি তার পাই কিছু কিছু। মলিন আর পোকাকাটা অফসলি সম্ভাবনা। সে সম্ভাবনা বাড়েও না, কমেও না। কেবল পুড়ে পুড়ে পোড়ায়। আমি তেপান্তরের জ্বালায় পুড়ি। তেপান্তর অন্য জ্বালায় পোড়ে।
আমার তাতেই বরঙ সুখ। সুখের টানে অগ্নিদাহ, অবিরাম ভাঙে বুক। তবু আমার তাতেই বরঙ সুখ।
তোমার আমার নাইবা হলো যৌথরাত্রি ঘুম
তোমার আমার দূরে দূরে বাড়ি,
কাঁচের চুড়ি নাইবা ভাঙলে উথাল পাথাল চুম
তোমার জন্য একটা জীবন পেরিয়ে যেতে পারি
ধূসর তেপান্তর
আমার তোমার সুরের আড়ি, দূরে দূরে বাড়ি।
===============================
[তার জন্যে; যে আমাকে তার চোখ দিয়েছিল ধার, আর আমি দেখেছিলাম তার জীবনের ধূসর ডায়েরী]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৪ দুপুর ২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



