ইট বিছানো পথটা ছেড়ে মাটির পথ ধরে পথিক আরও অনেকখানি হেঁটে গেলো। তারপর যখন পশ্চিমে মুখ লুকাতে লুকাতে সূর্যটা সাঁঝের সংকেত দিল তখন পথিকের মনের সংকেত ঘন্টাতেও বেজে উঠল চার দেয়ালের ডাক।
আকাশের পরিধি ঘিরে নেমে আসছিল আঁধার। মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে নীরে ফিরছিল দিবাচরী পাখির পাল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে পথিক ণিক তাকিয়ে থাকল পাখীদের নীরে ফেরার দৃশ্যে।
ইস্! যদি পাখীদের মতো উড়ে বেড়তে পারত সে. ভাবে পথিক, তবে কত সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে চলে যেত পারত; দেখতে পারত তার পিপাসার্ত দুচোখ আরও বিস্তর সবুজ, নীল জলের প্রাচুর্য অথবা দুর্গম পাহাড়ের উপর কোন রঙিন ফুলের ঝাড় যে ফুল আজও দেখেনি হয়তো কেউ।
একসময় হাঁটতে হাঁটতে পোড়া ইটের উপরে আস্তরে গড়া কৃত্রিম ঘরে ফিরে আসে পথিক।
প্রথম আলো পত্রিকার প্রথমপাতায় বামেই চোখে পড়ে যায় ওয়েব সাইটটার নাম।www.ekhoni-shomoy.net.
কিন্তু একটু পরেই পথিকের মন চরমভাবে বিষন্ন হয়। কারণ যান্ত্রিক আধুনিকতার যে চরম প্রাপ্তি তাকে ঘরে বসেই পথের প্রতীতি ( উপলব্ধি) জাগাতো, এনে দিত ঘরের মধ্যেই ক্ষণিক মুক্ত জীবন, সেই ল্যাপটপটা বহু প্রচেষ্টার পরেও আজ আর বুট করা গেলোনা।
কম্পিউ প্রযুক্তির সবটুকু বিলিয়ে পথিক বুঝে গেলো ল্যাপটপের সঞ্চয় ভানডার অর্থাৎ হার্ডডিস্ক ড্রাইভটি অকেজো হয়ে গেছে। পথিক ক্ষণিক মুষড়ে পড়ে। হৃদয়ে অজান্তেরই শুকনো বাতাস বয়ে যায়।
পথপ্রভার লাবন্য ভরা মুখের প্রতিচ্ছবিটা চোখে ভেসে ওঠে। হার্ডডিস্কেই কেবল তার একখানা ছবি লোড করা ছিল। আর যে কখনও ছবি দেবেনা সে তুলতে। ওমনই বলেছিল।
কেনো যে ছবিটার একটা হার্ড কপি রাখলোনা! নিজের উপর নিজের তীব্র রাগ হচ্ছে পথিকের। তার উপর হার্ডডিস্কে ছিল কত কত সৃজন লেখা তোর , কত কত সংগ্রহ ভান্ডার।
না কিভাবে মেনে নেবে , এত সহজে হারিয়ে যায় সব!
উতলা মনে কিছূই ভাল লাগছিলনা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে পথপ্রীতিকে কল করেই ফেললো।
‘ কিরে দেখেছিস। আচ্ছা তুই ই বল এভাবে দূর্ণীতি দমন সম্ভব...?’
পথপ্রীতির মিষ্টি আবেগী কণ্ঠটা শূনে ই চোখে পানি আসতে চাচ্ছিল পথিকের। যথাসম্ভব মন শান্ত রেখে বলল,
‘প্রীতি, আমার ল্যাপটপটা নষ্ট হয়ে গ্যাছে।’
‘ মানে’
‘ গেছে, সব গেছে , সব হারিয়ে গেছে। কতদিনের সংগ্রহ, কত দিনের সৃষ্টি, কত লেখা , কবিতা...’
যদিও পথিক ভাবছিল পথপ্রীতির গলাটাও কেঁপে উঠতে চাইছিল, তারপরও সান্তনা শোনাতে চাইছিল;
‘ যে চলে যায় , যাক না। যাওয়াই তো মহা সত্য। এই দুনিয়ার নিয়মই তো এই । তাই না পথিক? মানুষই তো চলে যায় আর এ তো জড় সৃষ্টি। আবার শুরু কর। আবার সৃষ্টি কর। আর নেক্সট টাইম নিশ্চয় ব্যাক আপ রাখতে ভুলবিনা। ,মনে কর এ তোর ভূলের একটা ছোট্ট শিা । আরও বড় শিক্ষা তোর ঘাড়ে পরতে পরত। ’
‘ কি হতে পারত সে চিন্তা পথিক করে না। কি হচ্ছে তাই নিয়েই পথিক চিন্তা করে। কিন্তু কি হলো এটা। কেনো ? সৃষ্টি কি আর বারবার একই রকম হয় রে? ভুল কেনো হবে?’
‘ আরে মানুষ বলেই তো ভূল হবে। আমি এখন নিশ্চিত যে তুই মানুষ । তা না হলে কি আর ভুল করতি। ;
‘ হাসাবি না। মার খাবি।’
‘ ইসরে মাইর দেবে। পারলে আয় না। শোন ঐ সেই কাহিনীটা জানিস না। ঐ যে কোন বিজ্ঞানী , সম্ভবত নিউটন সাহেব ই মনে হয়, যা হোক। একবার তার গবেষনার শেষ পর্যায়ে তার আদরের কুকুর সব উপাত্ত্ব বা তত্ত্ব লেখা কাগজ নষ্ট করে ফেলল। কিন্তু তিনি মোটেও ধৈয্য হারা না হয়ে আবার প্রথম থেকে শুরু করেছিলেন এবং তাতে বরং তার গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল।’
‘জ্ঞান দিবিনা। আর আমিতো অত বড় কিছু নই রে। আমার সামন্য টুকুই আমার একান্ত , আমার ঐশ্বর্য। ’
‘ ঐশ্বর্য তো অভিষেকের রে। কাল না বিয়ে।
বাদ দে, শান্ত হ। পথপভ্রা কেমন আছে বল, আর ফোন টোন করেছিল?’
‘না । কিছু ভাল লাগছেনা।ঐ সেই কবিতাটা , “বিরুদ্ধ বিরূপতা”, তোকে যে শুনিয়েছিলাম । তুই বলেছিলি অসাধারণ। তোর না কবিতা মনে থাকে। একবার মনে করে লিখে দিবি। শালা কেনো যে কাগজ ছেড়ে ডিজিটাল কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। দূর। ’
‘ দেখ , এত আফসেট হবিনা। মনে এলে অবশ্যই লিখে দেবো। তোর মত মানুষের জন্য এটাই সত্য। যা ভালবাসবি তা তো তোদের জন্যে চলে যাবে বলেই তোরা ভালবাসিস। অন্যভাবে বললে আসলে যাওয়ার পরই তুই বুঝতে পারিস কেবল উহাতে তোর কত ভালবাসা, কত ভাললাগা। তোরজন্যে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
পথপ্রভা যদি না চলে যেত, না করত আজ সে অন্যের ঘর ; তুই কি জীবনেও বুঝতে পারতিছ ওর জন্যে তোর এই গভীর ভালবাসা।’
‘ কিসের সাথে কিসের তুল না?’
‘ ওটাই সত্য। একটু ভেবে দেখিস। যা তোকে আর সান্তনা দেবোনা। ওটা তোর জন্যে বরং আরও অভিশাপই।
তবে যা গেছে গ্যাছে , চিন্তা করে আর কি হবে। ফিরে পাবি?’
‘আবার সান্তনা। তবে দেখছি ডাটা রিকভার করা যায় কিনা। শুনেছি সম্ভব। দেখি।’
‘দেখ। আর সানন্তনা আমি দেবো না তো কে দেবেরে। বাসায় আয় । এখনি। মা ভাপা পিঠা বানাচ্ছে। হুঁ......., আরেকটা সারপ্রাইজও আছে।
‘ কি?’
‘ আগে আয় তো।’
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ১০:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




