জন্মের পর স্বভাবতই প্রথম একটা শিশু তার মাকে দেখে( হয়তো আরও অন্য কাউকেও দেখে) তার পর ধারনা হয় নিজের সম্পর্কে। তার এই আত্মধারনা বা সচেতনতাকে তাহলে বলা যায় রিফলেকটেড এওয়্যারনেস বা প্রতিফলিত সচেতনতা।
যেহেতু জন্মেই শিশুর জানা কথা নয় সে কে তাই স্বাভাবিক ধারনায় একটি শিশুর প্রাথমিক সকল ধারনা শুরুই হয় মাকে দেখে এবং মা'র সকল কর্মকান্ড দর্শন এর প্রক্রিয়ায়। মার মুখের মিষ্টি হাসিতে অথবা মার নিবির আলিঙ্গনে, মধুর চুমুতে শিশু আনন্দ অনুভব করে এবং নিজের সম্পর্কে একধরনের প্রশান্তি তার মনের ভিতর নড়ে চড়ে ওঠে এবং আমরা ধারনা করে নিতে পারি সহজেই ঠিক সে সময় থেকেই শিশুর মধ্যে ইগো বা আমিত্ব বা আত্মঅহমিকার সূত্রপাত ঘটে যায়।
খেয়াল করে দেখলে বুঝা যাবে স্তুতি , ভালবাসা , আদর সোহাগ, যত্নআত্তি এসবের সুন্দর আলোড়নেই শিশু অনুভব করতে বা ভাবতে পারে তার নিজের আপন একটা অস্তিত্ব জগতে। এভাবে নিজের মাঝে একটা আত্মকেন্দ্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু সে কেন্দ্রটা প্রতিফলিত কেন্দ্র, নিজের নিজস্বতা ঘটিত কিছু নয়। সে নিজে জানেনা সে কে, সে কেবল সেটাই জানতে শুরু করে যেটা তার সম্পর্কে অন্যেরা জানাতে থাকে বা অন্যেরা তার সম্মুখে আচরণ করতে থাকে। মজার ব্যপারটা ওখানেই --সেই প্রতিফলন, সেই অন্যের চিন্তাভাবনা আর আচরণ ই হচ্ছে একটা শিশুর আমিত্ব(ইগো)।
প্রথমে কেবল মা ( মা বলতে পৃথিবীর জীবনে শুরুতে যে আসে), তারপর ধীরে ধীরে আরও অনেক মানুষ যোগ দেয় শিশুর দৃশ্যমান জগতে, পৃথিবীর পরিসর বাড়তে থাকে। এভাবে জগত এর পরিসর যত বৃহৎ হতে থাকে সেই আমিত্ব(ইগো) তত জটিল হতে থাকে কারন মতাদর্শ, কর্মকান্ড, আচরণ তখন প্রতিপলিত হয় শিশুর মধ্যে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে ইগো একটি একিউমুলেটেড ফেনোমিনা, ইগো অন্যদের সাথে বসবাসের একটি উপজাত বস্তু। তাই কোন শিশু যদি জন্মেও পরথেকেই একা থাকত ( ধরে নিলাম) সম্পূর্ণ , তাহেলে তার মধ্যে কথনই ইগো গড়ে উঠত না। তাই বলে আমরা এমন উদ্ভট বিশ্বাসও করতে পারিনা একা থাকলে শিশুর মধ্যে বাহ্যিক প্রতিফলন না ঘটে বরং আত্ম উদঘাটন ঘটতো।
সত্য কেবল মিথ্যের মধ্যে দিয়েই বোঝা যায়-- এ্ই মহা সত্য মানলেই মানতে হবে ইগোর আবশ্যকতা। সত্য সরাসরি বোঝা যায়না, একমাত্র বিভ্রম এর মধ্যে দিয়েই সত্য বোঝা সম্ভব। কিভাবে? প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে কোনটা সত্য নয়এবং তারপর সে মিথ্যেও মায়াজাল সরাতে পারলেই উপসহিত হবে সত্য। If you know the false as the false, truth will dawn upon you.
সমাজ মানে যা কিছূ আমাদের চারপাশে। আমি বাদে আমার চারপাশের আ সবকিছুই সমাজ। সমাজের সবাই , সবকিছু একজন ক্রমধাবমান শিশুকে রিফলেকটস করে। শিশু পরিবারের গন্ডির পরে যায় স্কুলের গন্ডিতে। সেখানে টিচার , সহপাঠী , বন্ধু সবাই রিফরেকটর হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এভাবে সংস্পর্শিত সবাই সমাজের আমিত্ব বা ইগোর মাঝে যুক্ত হয় এবং সবাই মিলে সবকছিু মিলে শিশুকে সমাজের উপযুক্ত হতে শেখায়। এর কারণ সবাই তারা শিশুটিকে নিয়ে চিন্তিত নয় চিন্তিত সমাজকে নিয়ে।
সমাজ চায়না কেউ আত্মজান্তা হয়ে ওঠ।বরং চায় সমাজের নিয়মে থেকে সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠুক। এভাবে সমাজ ও সমাজের চারপাশের সবাই মিলে সেই নৈতিকতা শেখানো চেষ্টা করে যা সমাজে উপযুক্ত করে গড়ে তোলে । ওই নৈতিকতাটাই হচ্ছে সেই রিফলেকটেড ইগো।
সমাজের নৈতিকতা সমাজের আপন স্টাইলে গড়া। সমাজ ঠিক করে দেয় কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক। কেউ কাউকে খুন করলে সে খুনী হযে যায় আবার সেই একই ব্যক্তি যুদ্ধের ময়দানে হাজার হাজার হত্যা কান্ড ঘটালেও সে খুনী হয়না। নৈতিকতা হচ্ছে সমাজের একধরনের পরিবেশ গত রাজনীতি এবং প্রত্যোক শিশুকে তার আপন সমাজের কূটনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতেই সমাজ শেখাতে চায়। সমাজ চায়না কেউতার নিজের মত করে সমাজের সে নীতির বাইরে আত্মবোদ্ধা হোক।
সমাজ মানুষের মধ্যে যে আমিত্ব তৈরী করে দেয় তা সমাজ নিজের প্রয়োজনেই করে যার দরুন সমাজ তাকে কন্ট্রোল করতে পারে। একটা শিশু সম্পূর্ণ অচেনা থাকে তার নিজের সম্পর্কে, তার একটা আত্মকেন্দ্র দনকার হয় এবং সমাজ সেই সুযোগে তার মধ্যে আমিত্ব ঢুকিয়ে দেয়।
যখন একটা শিশু স্কুলে প্রথম হয়ে, বা খুব ভাল রেজাল্ট করে বাড়ী ফেওে; সবাই তাকে ভীষণ আদর করতে থাকে, তাকে নিয়ে সবার ভীষন গর্ব হয়। এভাবে সবাই তার মাঝে একধরনে আমিত্ব বা ইগোর সূক্ষ্ম প্রবেশ ঘটায়।আর ঠিক উল্টো ঘটলে মানে অসফল হয়ে ফিরলে কেই তাকে অ্যাপরেসিয়েট করেনা , গর্ববোধ করেনা তার জন্য, সে নিগৃহিত হয়। ফলে সে পরবর্ততে ভাল করার তাগাদা অনুভব করে। গড়ে ওটা সেই আত্মকেন্দ্রটা আন্দেলিত হয়। ইগো সর্বদাই আন্দোলিত হয় কারন সে সর্বদাই খোঁজে অন্যের মাঝে নিজের অবস্থান। সমাজ পরিবেশ শিশুকে ওভাবেই ভাবতে শিকিয়েছে --"তুমি অন্যের চোখে কি।" এভাবে অন্যের দৃষ্টিতেই গড়ে ওঠে সেই আত্মকেন্দ্রটা।
এই কেন্দ্রটা নকল। কারন প্রত্যেক মানুষ তার আপন আত্মকেন্দ্র নিয়েই জন্মায় , যেটাতে অন্যের কোন হাত নেই।
এভাবে দেখা যাচ্ছে , মানুষের মাঝে দুইধরনের কেন্দ্র।
(ক) সেই আত্মকেন্দ্র যা একটা শিশু জন্মগত ভাবে নিয়ে আসে , যা তার সজীবতার অস্তিত্ব ভুবনে। সেটা মানুষের পূর্ণ নিজস্বতা। সোল, আত্মা।
(খ) অন্যটি সমাজ গড়ে দেয় , যার নাম আমিত্ব(ইগো)। এটা নকল জিনিষ এবং মহা কৌশলে বন্দী । এই ইগো দিয়ে সমাজ নিয়ন্ত্রন করে একজনকে। সে ইগোর অধীন চললে সব িঠক(সমাজ স্তুতি রচবে), না হলে সমাজ দাম দেবেনা, তখন ইগো আন্দোলিত হবে...নিজকে নিয়ে সংশয় দেখা যাবে নিজের মধ্যে , কষ্ট হবে।
প্রথমটাকে আমরা বলতে পারি অকৃত্রিম কেন্দ্র আর পরেরটা কে কৃত্রিম কেন্দ্র।
(চলবে...........2য় পর্বে শেষ)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



