wjsK
আকাশের কাছে
মুনতাসির মামুন ইমরান
ঘটনার শুরু হয়েছিল অনেক আগে। সময় ২০০৩। সবে এভারেস্ট বেসক্যাম্প থেকে ফিরে এসেছি। চারদিক থেকে মানুষের উত্সাহ উদ্দীপনায় দারুণ অনুভূতি জেগেছিল মনে। এভারেস্ট বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বাংলাভাষী আমার সঙ্গে আরেকজন যিনি ছিলেন তিনি আমার বন্ধু প্রতিম রিফাত ভাই। ভ্রমণ বিলাসী, পর্বতপ্রেমী কোনো বঙ্গবাসীর দর্শন হিমালয় কন্যা নেপালের সলোকম্ভুতে মিলেনি। এভারেস্ট একেবারে কাছে, এবার শুধু যাওয়ার অপেক্ষা, তবেই শীর্ষ-উচ্ছ্বাস জ্বরের মূলমন্ত্র এটাই।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতে থাকলো। পাহাড়ে যাচ্ছি আমরা সবাই, তবে এই পর্যায়ে দেশের বাইরে পা বাড়ালাম ইনডিয়াতে। পর্বতারোহণের ঝাল বুঝে গেলাম নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং-এ, উত্তরাঞ্চলে, বেসিক কোর্সের শিক্ষানবিস আমি। এ ঘটনার অনেক আগেই, সময়কাল ২০০৩-এর নভেম্বর। সদ্য পাস করা ইঞ্জিনিয়ার আমি। চাকরির খোজেও বোধকরি এতো সময় ব্যয় করতে হতো না যতোটা না লেগেছে কোনো মাউন্টেনিয়ারিং স্কুলে আমি যাবো তা বের করতে। যদিও এখন শুনতে পাওয়া যায়, আমাদের অনেকের পূর্ব পরিচিত এবং পরিচিতারা এসব মুল্লুক জয় করেছেন আগেই তবে
কার্যত ইনফরমেশন দিতে পারলেন না কেউ।
পর্বতারোহণের সূচনা হলো, টানা ২৮ দিনের শরীর এবং মন নিংড়ানো সাহসিকতায় বালি ঢেলে অতি কষ্টে অর্জিত বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সটা শেষ হলেও পালে হাওয়ার তোড় এতোই বেশি তখন, আবার উচ্চাভিলাষী মন নিয়ে এলাম চলে নিম বা নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেইনিং-এ। পাহাড়, এভারেস্ট তখন রীতিমতো ঢাকার টক অফ দি টাউন। দলে দলে লোক পাহাড়ে যেতে চায়। আমিও তাদেরই একজন, সত্যটা হলো এই যে, বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল ২০০৩-এর শেষের দিকে ব্যাপারটার সূত্রপাত ঘটাতে। এপৃলের এক সন্ধ্যায় রওনা হলাম ইনডিয়াতে। একা। উচ্চতর প্রশিক্ষণ তখন পর্যন্ত কেউ করেনি। তবে মিথ আছে এভারেস্ট নাকি জয়ই করে ফেলে ছিলেন আমাদের কিছু পূর্ব পুরুষ। সাহায্যের আশায় সবার কাছে গিয়ে নাকানি-চুবানি খেয়েই মনে হয় ঠিক পথে চলে এলাম ভাগিরথী কোলের উত্তরকাশী শহরে।
বেসিক পর্বতারোহণের জন্য রিফাত ভাই আমার সঙ্গে এবার। ইনডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং-এর রাজধানী হিসেবে খ্যাত এই উত্তরকাশী শুধু নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং-এর জন্যই যথেষ্ট ফেমাস। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, পৃন্সিপাল ছিলেন বিখ্যাত পর্বতারোহী অশোক অব্যি আর কোর্স ডিরেক্টর, নিরাজ রানা, ততো দিনে এই ডেম কেয়ার ভদ্রলোক ন্যাশনাল জিওগ্রাফির এভারেস্ট সে টাক্কার প্রোগ্রামের জন্য যথেষ্ট পরিচিত। যদিও ঢাকা শহরে আমাদের কাছে দার্জিলিং-এ অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট (এইচ এম আই) অনেক বেশি পরিচিত, নিকটবর্তী এবং কিছুটা সাশ্রয়ী বলে।
অ্যাডভান্স কোর্সগুলোতে মূলত থিওরিটিকাল ব্যাপারগুলো অনেক বেশি আসে এবং পর্বতারোহণ কলাকৌশলের বিকল্প (ইম্প্রভাইজ মেথড) ব্যবস্থাগুলোকে শেখানো হয়। কোর্সের শুরুতেই কানাঘুষা শুনতে পেলাম এবার মাউন্ট কেদার ডোম (৬৮৫০ মিটার) এ আমাদের এস্পিডিশান হতে পারে। গারওয়ালের এই বিখ্যাত পর্বতের নাম আগেই শুনেছিলাম।
মূল পর্বতের উদ্দেশে আরো ৬ দিন পর রওনা হলাম, পবিত্র ভূমি গঙ্গোত্রীর দিকে। ভাগিরথীর পাড়ে অমন সুন্দর শহর, ঠিক ছবির মতো। আকার আয়তনে ছোট্ট এবং বেশ ঘিঞ্জি। ধর্মীয় বাবাদের আশ্রমগুলোর থাকার জায়গা হিসেবে বেশ আর আছে প্রচুর পরিমাণে খাবারের দোকান। প্রসাদ বা ভোজ দেয়ার জন্যই এই দোকান। বাস থেকে নেমে স্থিত হওয়ার আগেই তুষারপাতে অভিযাত্রী দলের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রথমটায় বৃষ্টি তারপর শুরু হলো তুমুল তুষারপাত। পেজা তুলার মতো রাশি রাশি তুষার আমাদের একাকার করে পিঠের বোঝাটাকে আরো চাঙ্গা করে দিল। তুষার কিংবা বরফ যাই হোক না কেন তদুপরি রাস্তার যা অবস্থা হয়েছিল তা বর্ণনাতীত। একে এবড়ো খেবড়ো তারপর পায়ে চলা পথ বরফ গলা পানিতে হয়েছে আরো পিচ্ছিল আর কর্দমাক্ত।
হাটার মধ্যে থাকার কারণে কষ্টটাকে ঠিক অনুভব করতে পারছিলাম না। যখন চা পানের বিরতি দেয়া হলো একটুখানি আচ পেলাম তখন। আমাদের উচ্চতার ছাদের সমান উচু দোকানের ভেতর আসবাব বলতে গদি মোরা মাদুর ছাড়া আর কিছুই নেই। তাতেই কার আগে কে বসবে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি। পানি আর ঠাণ্ডায় কুচকে যাওয়া আঙুলগুলো দিয়ে চায়ের গরম মগ ধরেই সারা জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়- আমার মতো অনেকেরই যে এমনটা মনে হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছোট দোকানটাতে এতো মানুষের কারণেই দারুণ একটা ওম হয়ে উঠেছিল ভেতরটা। তবে বেশিক্ষণের জন্য না। কোর্স লিডারের বাশিতে আড়মোড়া ভাঙতে হলো সবার। আবার লাইন ফাইল ঠিক করে এগিয়ে চলা। চিরবাস। আমাদের প্রথম দিনে গন্তব্যের বর্ণনা দেয়াটা বেশ কঠিন। পাইন আর ফার গাছের সারির মাঝখানে সমতল যে স্থানটুকু সেখানেই তাবু থাকার কথা কিন্তু তাবু কোথায়। বরাবরের মতো ভীত মনে সবার পেছনে আমি। এ কোন বিশেষ ঝামেলায় এসে পৌছলামরে বাবা! থাকবোটা কোথায়? চারদিক কেবলই তুষার। মাটির দেখাই পেলাম না আর আমি করছি থাকার চিন্তা! পাইন গাছগুলোর মাটির কাছাকাছি কোনো পাইন কোণের দেখা পেলাম না। সবই ভরে আছে তুষারে।
অবশেষে ইন্সট্রাক্টরদের সহায়তায় বিখ্যাত ইনডিয়ান আর্কটিক টেন্টগুলো খুড়ে বের করলাম। আধুনিক যুগে এই তাবু ব্যবহার করার কি যুক্তি থাকতে পারে তা আমার মতো অনেকেই জানে না। তবে এ তাবুর দর্শন ইনডিয়ান যে কোনো এক্সপেডিশনে মাস্ট। গেল বারের (২০০৩) ইন্দো-নেপাল আর্মি এভারেস্ট এক্সপেডিশনে অশোক অ্যবি স্যারের দলের সঙ্গে লোত্সে ফেস অফ দি উঠেছে এই তাবু। গোলাকার তাবুতে মাত্র একটি খুটি। দু্থফিট তুষার সরিয়ে তেরপলের ওজনদার এই তাবু দাড়া করাতে উপকারের মধ্যে যেটা হলো, আমরা ঘামলাম। বাক্স পেটরা রেখে পানির খোজে বের হতে না হতেই বাশি এলো গরম চা। পড়িমরি অবস্থা। কেউ বা মগে কেউ বা বোতলে আমার মতো অনেকেই খাবারের পাত্রেই গরম চায়ের অমিয় ধারা গলায় দিয়ে ক্লান্তিতে পাইন গাছে ঠেস দিলাম। এ যাত্রায় দলে ভিড়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির অনুষ্ঠান গেম ফর ইট খ্যাত বৃটিশ স্টিভ ব্যকশেল। আমেরিকার গ্লেন। অস্ট্রেলিয়ার ডেভ, বঙ্গ দেশীয় আমি আর বাকিরা স্থানীয়।
গঙ্গোত্রীর উচ্চতা ৩০৪২ মিটার আর গো মুখ ৩৮৯০ মিটার। আমাদের আজকের গন্তব্য। চিরবাস থেকে আঠার কিলোমিটার। খাটি ট্রেকিং রুট। প্রচুর তীর্থযাত্রীর দেখা মেলে এ পথে তবে বৈরী আবহাওয়ায় তীর্থ যাত্রার চেয়ে প্রাণপাখির যত্ন খাচার ভেতর নেয়ার চেষ্টাই সবাই করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হাটছি তো হাটছি। এটা মানতেই হবে দারুণ পায়ে চলা পথ। তবে শেষটার কথা এখন চিন্তা করেই মন খারাপ। আবার সেই বরফ-তুষার খোড়াখুড়ি। পা দুটোকে দুরমুশের কাজে ব্যবহার করে তাবুর ভেতরটা সমান করা। বরফগুলোকে যথা সম্ভব কেটে ফেলা। আর পাথরের ঢিবিগুলোকে সযতনে রক্ষা করা। চারপাশের তুষারের মাঝে এই স্থানগুলোই ছিল সবার নজরে। খাওয়ার সময়, বিশ্রামের সময়, আড্ডার সময়, ফুরসতে, একটু বিরামের জন্য এর চেয়ে মোহনীয় আর কি হতে পারে যা কিঞ্চিত উষ্ণ আর শুকনো।
কেদার ডোম এক্সপেডিশনের খসরা হিসেবে আমরা সকাল সকাল বের হয়ে যেতাম রুট ওপেন করতে। গো মুখ আমাদের বেসক্যাম্প। সব সুবিধাই আছে। লাইট, টিভি, মেডিকাল। তবে সব পোর্টেবল এন্টারটেইনমেন্ট, খুব প্রয়োজনেই কেবল বের করা হয়! গঙ্গার গঙ্গোত্রী নামের যে হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার থেকে গঙ্গার সূচনা আমরা সেখানেই পৃএক্সপেডিশন স্নো আর আইস ক্রাফটগুলো করা হতো। কালচে নীলাভ আইসগুলো বিশ্রী রকমভাবে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। মোটেও সুখকর লাগলো না প্রমত্তা পদ্মার মা এই গঙ্গার সূচনা দেখে। কঙ্কর মেশানো মেটে রঙের হিম ধরা পানির অনেক ছোট ধারা একসঙ্গে হওয়ার আমরণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গঙ্গাকে সৃষ্টি করার জন্য।
নীলাভ আইস ওয়ালগুলোতে আরোহণের কতো স্বপ্নই না আমার মতো কতো শত জনের। তবে বিনা দ্বিধায় বলা যায়, দেখে করার চেয়ে বুঝে করতে চাওয়াটা অনেক সঙ্গিন। আইস এক্স এর ফেলুর বা টিপ আর ক্রাম্পনের দাতগুলোকে দেয়ালে এক পা আটকে দিয়ে অন্য পায়ের বলে এগিয়ে যেতে হয়। এতে যেমন খুব জোরালভাবে ক্রাম্পনটাকে আটকে দিলে মুশকিল তেমনি হালকা করে আটকালেও পড়ে যাওয়ার ভয় অবধারিত। প্রতিটি পদক্ষেপ মাপা। এর ফলাফল চল্লিশ মিটার ওয়ালে সফল আরোহণ আর জগতের সকল ক্লান্তির আধার হয়ে সবাক হয়ে সচল থাকার নিদারুণ চেষ্টা। এ ক্লান্তি দৈহিক, এ ক্লান্তি একাধারে প্রচণ্ড মানসিক।
অ্যাডভান্স ক্যাম্প করার জন্য তপোবনে। বাংলা সাহিত্যে কতো কথায় যে এই শব্দের আবির্ভাব হয়েছে তা আমার চেয়ে ভালো সবাই জানেন। তবে সত্যি কথা বলতে কি এর সৌন্দর্যটা উপভোগের জন্য যে শ্রম প্রয়োজন তা কতো জন লেখক বা সাহিত্যিক দিয়েছেন বা দিতে পেরেছেন তা বলাটা বেশ মুশকিল। কেননা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,২০০ মিটার উচ্চতায় আরোহণের জন্য যে কষ্টসাধ্য এবং বিপদ সঙ্কুল আরোহণ করতে হয় তার ধকল থেকে যায় ফিরে না আসা পর্যন্ত। তপবনে সব ক্লান্তি হাওয়া। এক কথায় অসাধারণ। বিশাল ভ্যালি। পেছনে ফেলে আসা গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার, তার পরেই রক্তবর্ণ গ্লেসিয়ার, লাগোয়া উত্তর-পূর্ব দিকে ভাগিরথী পর্বতমালা। একে একে ভাগিরথী এক, দুই, তিন। ঠিক উল্টোদিকে হিমালয়ান মেটারহর্ন নামে খ্যাত ্তুশিবলিঙ্গ ্থ তার ঠিক ডানে অপরাজেয় থেলেসাগর এবং মেরো পর্বত শৃঙ্গ। ছবির মতো সুন্দর কিন্তু বিশ্রী রকম সত্যি যে কোনো পর্বত কারো চেয়ে কম ভয়াবহ না। একটা কথা না বললেই না, থেলেসাগরে এখন পর্যন্ত সফল ইনডিয়ান সামিট হয়নি, যেমনটি হয়নি শিবলিঙ্গ পর্বতে। সূচাত্র পর্বগুলো কিন্তু তেমন একটা উচু না। সবাই কম বেশি ৬৫০০ মিটারের বেশি বা কম। তবে মজার বিষয় হলো এর ৫০০০ মিটার অব্দি যাওয়া খুব একটা কঠিন হয় না তবে বাকিটা, আল্লাহর ইচ্ছা !
ইসরেলি বাবার এক আশ্রম আছে এখানে। বড় পাথরের আড়ালেই তার ডেরা তবে ছবি তোলা একেবারেই নিষেধ। তপোবন মূলত বিশাল একটা মালভূমি। লম্বায় কোনো মতেই মাইলখানেকের ছোট হবে না। অমর গঙ্গা নামে এক জলধারা বয়ে গেছে। গঙ্গা উপরে এবং বছরের কোনো সময় এটা শুকায় না বলে এ রকম নামকরণ। আমাদের ভাগ্য বেশ খারাপই বলা চলে, জল শুকে যায়নি তবে হয়ে গেছে বরফ। পানীয় জলের জন্য হন্যে হয়ে খুজে বের করা হলো উত্স। বিশাল মেস টেন্টটাতে রান্নার কাজ হয় আর আমরা তিনজনের ছোট দলের প্রতিটির জন্য একটি করে তাবু্
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



