
পোড়াবাড়ির চমচম ও ভাসানীর বেগুন টালের কাহিনী (পর্ব-১)
পোড়াবাড়ির চমচম এবং পোড়াবাড়ির হাট (পর্ব-২)
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
এই কইছা ডাকাতের অনেক কাহিনী আমি ছোট বেলায় বাবার কাছে শুনেছিলাম। তার শিষ্য নাকি আসাম পর্যন্ত ছিল। তবে সে কোন গরীব লোকের বড়িতে ডাকাতি করতো না। বড় বড় জমিদার বাড়ি ডাকাতি করতো। তার শিষ্য আমাদের এলাকায়ও ছিল। বর্ননা অধিক হওয়ায় তার কাহিনী এখানে বলা সম্ভব হলো না। কোনদিন সময় সুযোগ হলে সে কাহিনী লিখব।
বৃদ্ধের সাথে আরো অনেক কথা হলো। এক পর্যায়ে বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দোকানের বাইরে এসে দেখি একটি রিক্সাও নেই। রিক্সাওয়ালা আমাকে দোকানে বসিয়ে রেখে ভাড়া নিয়ে চলে গেছে। রিক্সা না পেয়ে হাটের চারদিকে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটি বন্ধ দোকানের সামনে পেতে রাখা বাঁশের টংয়ের উপর বসে রইলাম। এমন সময় তের চৌদ্দ বছরের এক ছেলে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, বড় ভাই, আপনি কই যাইবেন?
Ñ টাঙ্গাইল যাবো।
Ñ আপনি কি রিক্সার জন্য বইয়া রইছেন?
Ñ হ্যাঁ।
-- এখন রিক্সা তো পাইবেন না, পাইলেও অনেক দেরি করতে হইবো।
-- কতক্ষণ দেরি করা লাগবে?
-- ঠিক নাই, আধা ঘন্টাও লাগতে পারে, আবার দুই ঘন্টাও লাগতে পারে।
ছেলেটির কথা শুনে হতাশা বোধ করতে লাগলাম। দুই ঘন্টা বসে থাকলে তো আমাকে রেখেই ওরা বাস নিয়ে ঢাকায় চলে যাবে। তখন যাবো কি করে? এ কথা মনে হতেই পোড়াবাড়ির চমচম খাওয়ার স্বাদ যেটুকু পেয়েছিলাম তা উবে গেল। মুখটা শুকিয়ে গেল। আমার হতাশা ভাব দেখে ছেলেটি নিজের থেকেই বলল, রিক্সার জন্য বইসা না থাইকা হাইটা যান।
Ñ অনেক রাস্তা, এতো রাস্তা হাঁটবো কি করে?
Ñ আপনি রাস্তা দিয়া না যায়া এই সোজা ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়া হাঁটা ধরেন। তাইলে অর্ধেক রাস্তা।
Ñ আমি তো এই রাস্তা চিনি না।
Ñ আমি ওই দিকেই যামু। আমার সাথে চলেন। আমি রাস্তা চিনায়া দিমু।
যানবাহনের কোন ব্যবস্থা না দেখে ছেলেটির সাথে পথ ধরলাম। ক্ষেতে ধান নেই। কৃষকরা ধান কেটে নিয়ে গেছে, শুধু ধানের নাড়া পড়ে আছে। কোন কোন ক্ষেতে হাল চাষ করেছে। হাঁটতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটির সাথে অনেক কথা হলো। মওলানা ভাসানীর বাড়ির সোজা দক্ষিণে যে গ্রাম, ওই গ্রামে ছেলেটির বাড়ি। ওরা তাঁতের কাজ করে। কাপড়ের টাকা আদায় করার জন্য পোড়াবাড়ির হাটে এসেছিল।
ছেলেটির সাথে গল্প করতে করতে কখন সস্তোষে চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। এসে দেখি আমাদের বাস নেই। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে রিপনসহ বাসের যাত্রীদের কাউকেই খুঁজে পেলাম না। রাস্তার পাশের দোকানীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পেলাম বাস অনেক আগেই চলে গেছে। বাস চলে যাওয়ায় পোড়াবাড়ি যাওয়ার আনন্দ বিষাদে পরিণত হলো। মনের দুঃখে এদিক ওদিক কিছুক্ষণ ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করে রাস্তায় চলে এলাম। রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বেই মওলানা ভাসানীর বাড়ি। মওলানা ভাসানীর বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলাম। গিয়ে দেখি একজন বৃদ্ধা উঠানে একটি ব্রেঞ্চে বসে আছেন। পরনে কচু পাতা রঙের সাধারন মোটা শাড়ি। উঠানের পশ্চিম পার্শ্বে দশ বারো জন লোক বড় বড় ডেকচিতে খিচুরী রান্না করছে। বৃদ্ধা উঠানের মাঝখানে বসে রান্নার তদারকি করছেন। অনেক লোকই বাড়ির ভিতরে ঢুকে তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করছে। আমি একজনকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, উনি মওলানা ভাসানীর স্ত্রী। ওনার নাম আলেমা ভাসানী। ভাসানীকে কখনও সশরীরে দেখিনি। তার স্ত্রীকে দেখার সৌভাগ্য হওয়ায় মনে মনে খুব খুশি হলাম। সুযোগ বুঝে সোজা তার কাছে গিয়ে বললাম, দাদী, কেমন আছেন?
আমার কথা শুনে আলেমা ভাসানী আমার মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে থেকে বলল, ভাল আছি, দাদা কোত্থিকা আইচাও?
আমি বললাম, ঢাকা থেকে।
আলেমা ভাসানী ঢাকা থেকে এসেছি শুনে আফসোস করে স্নেহ ভরা কণ্ঠে বললেন, আহারে দাদা, ঢাকা থিকা আইচাও, অনেক কষ্ট কইরা আইচাও। একটা ব্রাঞ্চি দেইহা বইসা জিরাও। খিচুরী পাক হইলে দাদা খায়া যাইও। একথা বলার পরপরেই কিছু নেতা এসে তার সামনে দাঁড়ালো। সাথে অনেক লোক ছিল। তাদের ভির বাট্টায় আমি আর কোন কথা বলার সুযোগ পেলাম না। বাড়ির ভিতর হঠাৎ করেই লোকজনে ভরে গেল। তবে এই মহিলাকে জীবনে কোনদিন দেখিনি, তার সাথে পরিচয় দেয়ার মত কোন সুত্রও নেই, প্রথম কথাতেই তিনি আমাকে আপন নাতীর মত যেভাবে দরদ মাখা আদর দিয়ে কথা বললেন, তাতে আমার মনটা আনন্দে ভরে গেল। টাঙ্গাইল আসার কষ্টটা যেন সার্থক হলো। মনে মনে ভাবলাম, বড় নেতাদের যেমন চরিত্র, তাদের স্ত্রীরাও তাদের থেকে ব্যাতিক্রম নয়। সব মানুষকে সহজেই তারা আপন করে নিতে পারেন। এই গুনের অধিকারী হওয়ার কারণেই তারা নেতা হতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং তাদের নেতৃত্ব সবাই গ্রহণ করে।
আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাড়ির ভিতর থেকে বাইরে চলে এলাম। এসে সোজা ভাসানীর মাজারে চলে গেলাম। সেখান থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের দক্ষিণ পার্শ্বে এসে দেখি বিশাল একটি টিনের ঘর। ঘরের বেড়া নেই। চারদিকে খোলামেলা। সেই ঘরের ছায়ায় বসে এলাকার বয়াতিরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে দলবলসহ বাউল গানের আসর বসিয়েছে। ঢোল, করতাল, দোতারা, একতারা আর খুঞ্জুরির তালে সবাই মাতোয়ারা। গানের ছন্দ দিয়েই একজন আরেকজনকে পাল্টাপাল্টি প্রশ্নোত্তর করছে। কেউ কেউ মজার মজার চুটকি বলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। চুটকিগুলো আমার কাছে খুব ভাল লাগল। একজন বয়স্ক ছোট খাটো বয়াতী ফাটা বাঁশের মত গলা চরিয়ে হাদীস কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে গান গাচ্ছে। পাগোল পাগোল ভাব। তার বেসুরো গান শুনে রসিকতা করে অনেকেই হাততালি দিচ্ছে। মানুষের হাততালি পেয়ে পাগোল আরো জোরে গলা চরিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছে। পাগোলের গান শুনে আর তার ভাব ভঙ্গি দেখে না হেসে পারলাম না। পাগোলের গানের আসর থেকে বের হয়ে ঘুরে ঘুরে সব দলের গানই শুনলাম। কিছু বয়াতির গাওয়া গান আমার কাছে খুবই ভাল লাগল।
গানের আসর থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে এলাম। রাস্তায় কয়েকটি রিক্সা দাঁড়ানো ছিল। একজন রিক্সওয়ালা আমাকে দেখে টাঙ্গাইল যাবো কিনা প্রশ্ন করতেই আমি যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে গেলাম। আমাকে রিক্সায় উঠতে দেখে আরেকজন লোক আমার সাথে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তিনিও ঢাকা থেকে এসেছেন। দুইজন একসাথেই রিক্সায় রওনা হলাম। ভদ্রলোক রিক্সায় উঠেই রিক্সওয়ালাকে বললেন, এই ভাই রিক্সাওয়ালা, ভাল মিস্টি পাওয়া যায় কোন দোকানে?
রিক্সাওয়ালা রিক্সা চালানো অবস্থায় মুখ পিছনে না ঘুরিয়েই উত্তর দিলেন, পাঁচ আনির মিস্টির দোকানে।
ভদ্রলোক খুশি হয়ে রিক্সাওয়ালাকে বললেন, আমাদের পাঁচ আনির মিস্টির দোকানে নিয়ে যাও।
রিক্সাওয়ালা আমাদের পাঁচ আনির একটি মিস্টির দোকানের সামনে নামিয়ে দিল। মোটা শাল কাঠের খুঁটির উপরে টিনের চৌচালা ঘর। চালসহ টিনের বেড়ায় জং ধরেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘরটি অনেক পুরানো। ভিতরে কিছু লোক বসে ভাত খাচ্ছে। তখন প্রায় দুইটা বাজে। আমিও ভিতরে গিয়ে একটি টেবিলে বসতেই বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল, কি খাবেন?
বললাম, ভাত খাবো। কি কি আছে?
Ñ কবুতরের মাংস, মুরগীর মাংস, খাসীর মাংস, রুই মাছ, কই মাছ, শিং মাছ, এক নিঃশ্বাসে সব তরকারীর নাম বলে দিল।
কবুতরের কথা শুনে জিহ্বায় পানি চলে এলো। লোভ সামলাতে না পেরে তাড়াতাড়ি বললাম, কবুতরের মাংস দাও।
একটু পরেই বেয়ারা ভাত এবং কবুতরের মাংস দিয়ে গেল। বাটি থেকে মাংস প্লেটে ঢেলে ভাত দিয়ে খেয়ে দেখি অসম্ভব স্বাদ হয়েছে। দুই প্লেট ভাত খাওয়ার পরও মুখের রুচি কমছে না। অতিরিক্ত আরও এক বাটি কবুতরের মাংস এবং আরো দুই প্লেট ভাত খেয়ে নিলাম। অনেক দিন পর মনে হলো তৃপ্তিসহকারে ভাত খেলাম। এর আগেও অনেক কবুতরের মাংস খেয়েছি কিন্তু এতো স্বাদ কখনও পাইনি।
খাওয়া শেষে মনে মনে ভাবলাম খাওয়ার সময় তো হুশ ছিল না. ডবল ডবল খেয়েছি, না জানি কত টাকা বিল হয়েছে? কিন্তু বিল খুব বেশি নয়। কবুতরের মাংস চৌদ্দ টাকা করে দুই প্লেট আঠাশ টাকা, ভাত চার প্লেট ছয় টাকা, ডাল, পানি ফ্রি। সর্বসাকুল্যে চৌত্রিশ টাকা। কবুতরের মাংশ খেয়ে যেমন তৃপ্তি পেলাম, খাবারের বিল দিয়েও তেমনি তৃপ্তিবোধ করলাম। বিল দিয়ে বাইরে এসে রিক্সা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলাম। বাসে চরে ঢাকায় যখন ফিরলাম তখন রাত হয়েছে। মেসে গিয়ে দেখি তখনও রিপন বাসায় ফেরেনি। রাত দশটার দিকে রিপন এলে আমাকে রেখে আসার জন্য মেজাজ গরম করে কিছু বলতে যাবো, কিন্তু সুযোগ পেলাম না। আমি কিছু বলার আগেই দেখি সে মেজাজ গরম করে উল্টো আমাকে দু’কথা শোনাচ্ছে। আমার জন্য নাকি একঘন্টা বাস দেরি করেছে। এর জন্য নেতারা তাকে অনেক গাল-মন্দ করেছে।
এসব কথা শুনে আমি রিপনকে কিছু বলতে যাবো এমন সময় উপেন দা আমাদের ঝগড়ার অবস্থা দেখে মুচকী মুচকী হেসে বললেন, পরামানিক বাস ফেল কইরা যা কষ্ট পাইছে আর রিপন হেরে রাইখা আইসা যা কষ্ট পাইছে তার চায়া বেশি কষ্ট পাইলাম আমি। একজন পোড়াবাড়ির হাটে যায়া মদন লালের দোকানে বইসা বিশাল বিশাল মিস্টি খাইল, আরেকজন ভাসানীর বাড়ির খিচুরী খায়া পেট ফুলায়া আইল অথচ আমাগো জন্য দুইজনের একজনও কিছু নিয়া আইলো না। আমি হেই দুখেই মইরা যাওয়ার অবস্থা।
দাদার খোটা মারা কথা শুনে রিপন চুপ হয়ে গেল। দাদার কথা শুনে আমার গরম মেজাজ আর গরম হলো না। মুহুর্তেই ঠা›ডা হয়ে গেল। আমিও চুপ হয়ে বসে রইলাম।
০০০ সমাপ্ত ০০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

