somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য রচনা = দু’অক্ষর জ্ঞানের ডিগ্রী পাশ বউ

১৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১২:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(সহব্লগার সাহসী সন্তানের উৎসাহে পোষ্ট করা হলো)
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

পরিবারের মুরুব্বীদের পছন্দ মত ডিগ্রী পাস করা পাত্রী জোগাড় করা হলো। তাদের সুবিধামত সময় নিয়ে দিন তারিখ ঠিক করে ধুম ধামের সাথে বিবাহ সম্পন্ন হলো। বউ দেখতে খুব সুন্দরী নয়, তবে অসুন্দরীও নয়। পাড়ার লোকজন নববধুর মুখ দেখে মোটামুটি ভাল চেহারা বলেই প্রশংসা করে। সুন্দরী না বললেও কেউ অসুন্দরী বলে নাক সিটকায় না। বাবা মা’র পছন্দ অনুযায়ী বউ ঘরে তোলায়, নববধুকে তাদের কথা মতই চলতে হয়। নববধুর ইচ্ছা বা আমার ইচ্ছামত চলতে দেয়া হয় না। মুরুব্বীদের নিয়ম কানুনের মধ্যেই দুইজনকেই চলতে হয়। এর হেরফের হলে খবর করে ছাড়ে। আবার সুবিধাও আছে, তাদের কথামত চলার কারণে, বাজর খরচ খাওয়া-দাওয়া সব কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনে। টাকা-পয়সার যত টানাটানিই হোক, এসব ঝামেলা আমার উপর নেই। তাই সংসার কি জিনিষ আমার পক্ষে বোঝা মুশকিল।

কয়েক বছর পরে ঢাকায় বাসা নিয়েছি। ছোট ছোট দু’টি সন্তানসহ সস্ত্রীক থাকি। বাবার ঘাড়ে যত দিন ছিলাম রাজার হালেই ছিলাম। সংসারের ঝামেলা ছিল না। মাস শেষে বেতনের কিছু টাকা তার হতে তুলে দিলেই হতো। এই টাকা পেয়েই তিনি খুশি হয়ে যেতেন। অল্প টাকা পেয়ে বাবা খুশি হতেন দেখেই মনে করতাম সংসারের ব্যয় বহন করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু ঢাকায় বাসা নেয়ার পরেই আমার সেই ধারনা পাল্টে গেল। তিন মাসেই মনে হলো বউ নয়, এটা যেন একটা হস্তী পালন করছি। হস্তী অনেক খাবার খায়, দুই, চার, দশটা আস্ত কলাগাছ চিবিয়ে খেয়ে ফেলে, তবুও মনে হয় তার পেট ভরে না। সে তুলনায় আমার বউয়ের খাবার সামান্য। মাত্র দুইছটাক চালের ভাত। কিন্তু বউয়ের দুই ছটাক চালের খাদ্য সরবরাহ করতে গিয়ে মনে হলো, এর চেয়ে হস্তী পালন অনেক ভালো। হস্তীর দুই চার দশটা কলাগাছের বাইরে আর কিছু লাগে না। কিন্তু বউয়ের দুই ছটাক চালের বাইরে এত আনুসঙ্গিক জিনিষপত্র লাগে, সেগুলো জোগাড় করতে করতে পয়সার অভাবে মাঝে মাঝে জান না বেরোলেও তিড়িংবিড়িং লাফালাফি উঠে যায়। কুলোতে না পেরে রাগে, দুঃখে, গোস্বায় নিজেই না খেয়ে বসে থাকি। নিজে না খেয়ে থাকলে কি হবে কোনো লাভ হয় না। যত কষ্টই হোক না কেন, আবার নিজেকেই সব জোগাড় করতে হয়।

প্রত্যেক দিন সকাল বেলা বাজারের ব্যাগটা হাতে ধরিয়ে দিয়েই গিন্নি বলবে চাল আন, ডাল আন, নুন আন, তেল আন, মাছ আন, সবজি আন, আদা আন, রসুন আন, পিয়াজ আন, মরিচ আন, ইত্যাদি শুধু "আন"। সকাল বেলার এসব "আন" চাহিদা কম বেশি পুরণ করে আধাশুন্য পকেটে অফিসে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই দিন গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়। বিকাল বেলা বাসায় ফিরলে, সকালের মত অত বড় ফর্দি না দিলেও, কিছু না কিছু "আন" বলে চাহিদা দিয়ে বসে থাকে। অনেক সময় ঘুমানোর আগেও দু’একটি এরকম "আন" চাহিদার ফরমাশ আসে।

তিন মাসের আলাদা সংসারে "আন আন" শব্দ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেলাম। সেদিন মাস শেষ, ২৯ তারিখ। হাতে একটি পয়সাও নেই। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়েই গড় গড় করে চাল, ডাল, শাক-শব্জির নাম বলেই বলল তাড়াতাড়ি আন। একে তো হাতে পয়সা নেই তারোপর এতোগুলো জিনিষের নাম বলে "আন" বলায় মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। বউয়ের বলার ভঙ্গি দেখে বাপের উপর রাগ হলো। বাপ কেন আমাকে বিয়ে করিয়ে সংসার ঝামেলায় ফেলল? কিন্তু বাপ তো এখানে নেই, রাগ দেখালে লাভ হবে কি! তাই বাপের রাগটা বউয়ের উপর ঝাড়লাম। ডাক দিয়ে বললাম, এই শোন, আমার বাবা যখন তোমাকে দেখতে গিয়েছিল, তখন কি তুমি ডিগ্রী পাস ছিলে?
একথা শুনে বউ বসা থেকে তিড়িং করে দাঁড়িয়ে গেল। গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ডিগ্রী পাস ছিলাম মানে, শুধু ডিগ্রী পাস নই, ভালভাবে পাস ছিলাম।
বললাম, কেমন পাস?
বউ হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, এসএসসিতে ফাস্ট ডিভিশন, এইচ এসসিতে ফাস্ট ডিভিশন, ডিগ্রীতে সেকেন্ড ডিভিশন। আপনি মনে করেছেন কি? লেখা পড়ায় আপনার চেয়ে অনেক ভাল ছিলাম।
আমি মুখটা বিকৃত করে বললাম, এত ডিভিশন, এত ভালো লেখা পড়া, বাস্তবে তো সে লক্ষণ দেখি না?
একথা শুনে গিন্নি যেন বারুদের মতো জ্বলে উঠল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, লক্ষণ দেখেন নাই মানে! আপনি কি বলতে চান?
আমি তখন গলাটা নরম করে বললাম, আমি বলতে চাই তুমি ডিভিশন নিয়ে ডিগ্রী পাস করে যা শিখেছ, সে সব দুই অক্ষরের বেশি নয়।
বউ চোখ বড় বড় করে বলল, তার মানে?
তার মানে "স্বরে-আ" আর "দন্ত-ন" অর্থাৎ "আন"। এই দুই অক্ষরের "আন" শব্দ ছাড়া আমার ডিগ্রী পাস করা বউয়ের মুখ দিয়ে এই তিন মাসে অন্য শব্দ খুব একটা পাইনি। কাজেই মনে হলো তুমি ডিগ্রী পাশ করে শুধু দুইটি অক্ষরই শিখে এসেছো। একথা বলে গিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখি গিন্নি চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম আর দু’এক কথা বললে হয়তো গিন্নির মুখটা এটমের মত বাস্ট হবে নয়তো হার্ট ফেল করবে। গিন্নির মুখ বাস্ট হওয়া বা হার্ট ফেল করার ভয়ে, খালি পকেটেই ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাজারের দিকে হন হন করে দ্রুত দৌড়াতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম, সংসার চালাতে গিয়ে টাকা পয়সার অভাব দেখা দিলে বউয়ের ডিগ্রী পাস সার্টিফিকেট তো দূরের কথা নিজের ডিগ্রী পাস সার্টিফিকেটটাও মূল্যহীন মনে হয়।

০০০ সমাপ্ত ০০০
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১:১৪
৪৭টি মন্তব্য ৪৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×