somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিশি কন্যার কান্না (ছোট গল্প)

০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


( সপ্তম বাংলা ব্লগ দিবস উপলক্ষে প্রতিযোগিতার জন্য পাঠানো গল্প।)
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

রাত দু’টার সময় পত্রিকার কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার জন্য গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। রাতে সাংবাদিক কর্মচারীদের বাসায় পৌঁছানোর জন্য অফিস থেকে দু’টি স্কুটার ভাড়া করা আছে। একটি স্কুটার দু’জন সাংবাদিক নিয়ে মীরপুর চলে গেছে। আরেকটি অচল হয়ে বসে আছে। সবাই চলে গেছে। শুধু আমি এবং কম্পিউটার অপারেটর সামছু যেতে পারিনি।

এক পর্যায়ে সামছু বলল, মানিক ভাই, গাড়ির জন্য বইয়া থাকলে রাত পার হইয়া যাইবো। তার থাইকা চলেন হাইটা যাই।

আমি যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হলেও সামছুর কথায় রাজী না হয়ে কিছুটা ভীতিভাব নিয়ে বললাম, এতো রাতে হেঁটে যাওয়া ঠিক হবে না। রাস্তায় নানা ধরনের বিপদ-আপদ হতে পারে!

সামছু আমাকে অভয় দিয়ে বলল, আরে মানিক ভাই, ডরান ক্যা? বারো বছর হইলো পত্রিকায় চাকরী করি। এরকম গাড়ীর সমস্যা হইলে মাঝে মাঝে হাইটাই যাই। কোনো দিন কোনো সমস্যায় পড়ি নাই। আর সমস্যা হইবো ক্যান? রাইত কইরা ঢাকা শহরের রাস্তায় থাকেই তো তিন “প”।

আমি সামছুর তিন “প” শব্দ শুনে কিছুটা আশ্চার্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তিন “প” মানে?

সামছু একটা হাসি দিয়ে বলল, আরে মানিক ভাই, পত্রিকায় চাকরী করেন অথচ তিন “প”-এর মানে জানেন না?

আমি জবাব দিলাম, না।

সামছু আমার না শব্দ শুনে বিজ্ঞের মত হাসি দিয়ে বলল, তিন “প”-এর অর্থ হলো-- ঢাকা শহরে রাত বারোটার পরে তিন পেশার লোক রাস্তায় ঘুরাফিরা করে। এই তিন পেশার লোকের তিন ধরণের শব্দ আছে এবং প্রত্যেকটা শব্দের প্রথমে “প” আছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, যেমন--?

সামছু হাসি হাসি ভাব নিয়ে বলল, যেমন-- পত্রিকা, পুলিশ আর পতিতা। এই তিন পেশার লোক ছাড়া অন্য কোন লোক খুব একটা থাকে না। এই জন্য তিন “প” কইলেই বুঝা যায় এরা কারা?

আমি সামছুর মুখে তিন “প”-এর ব্যাখা শুনে হেসে বললাম, আপনি সুন্দর একটা ব্যাখা দিলেন তো সামছু ভাই। আমিও তো এই বিষয়টি নিয়ে কখনো চিন্তা করিনি।

পত্রিকা অফিসের গেটেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামছু হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, চলেন এবার, হুদাহুদি বইসা থাইকা লাভ নাই। গাড়ি যদি কোন কারণে না আইসে, তাইলে সারা রাইত বইয়া থাইকা সকাল বেলা আমাগো হেই হাইটাই বাসায় যাইতে হইবো।

সামছুর কথায় আমিও তাই ভাবছিলাম। বসে না থেকে হেঁটেই বাসায় চলে যাব। ইতোমধ্যেই পত্রিকা ছাপা শুরু হয়েছে। সামছু সেদিকে খেয়াল করে বলল, মানিক ভাই, একটু দাঁড়ান। পত্রিকা যখন ছাপা শুরু হইছে, তখন দুইখান পত্রিকা নিয়া আইসি। বলেই সে প্রেসে চলে গেল। একটু পরেই ছাপাখানা থেকে দু’টি পত্রিকা এনে একটি আমার হাতে দিল আরেকটি নিজে নিল। সামছু তার পত্রিকাটি ভাঁজ করে বগল তলে নিয়ে বলল, এবার চলেন। রাইত বিরাইতে চলাচলের সময় পত্রিকা কাছে থাকলে পুলিশ খুব একটা ঝামেলা করে না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, পত্রিকা হাতে থাকলে পুলিশ কি করে বুঝবে আমরা পত্রিকার লোক?

সামছু লম্বা সুরে বলল, আরে-- যেহেতু আমরা পতিতা না, আবার পুলিশের পোষাকও গায়ে নাই, হাতে ছাপা খানার নতুন পত্রিকা, মনে ভয় ডর নাই, ডাটেফাটে হাঁটার ভাব দেইখা পুলিশ বুইঝা ফালায় এরা পত্রিকার লোক।

সামছুর এসব ব্যাখা শুনে আশ্বস্ত হয়ে বললাম, তাহলে চলেন?

দুই জন একসাথেই রওনা হলাম। সেগুন বাগিচা থেকে প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় উঠে পূর্ব দিকে হাঁটতে শুরু করেছি। বিএমএ ভবনের পূর্ব পার্শ্বে যেতেই গলির ভিতর থেকে মহিলা কণ্ঠে কান্নার আওয়াজ কানে এলো। গলির কাছাকাছি যেতেই দেখি এক মহিলা গলির মুখে দাঁড়িয়ে বাম হাত দিয়ে ডান হাত ডলছে আর শব্দ করে কাঁদছে।

মহিলার কাছাকাছি এসে সামছু হাবা গোবার ভাব নিয়ে মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, কি গো বইন? এতো রাইতে গলির মুখে বইসা কানতাছেন ক্যা?

সামছুর কথা শুনে মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভাই গো, হারা রাইত কষ্ট কইরা বিশটা ট্যাকা কামাই করছিলাম। মরার পুলিশ তাও জোর কইরা নিয়া গেল। দেইনা দেইহা রুলের বাড়ি দিয়া ডান হাতটা ভাইঙা দিয়া গ্যাছে। এহন আমি কাইলকা খামু কি? পোলাডার জ্বর, হেরে খাওয়ামু কি? বলেই সে হাত ডলতে ডলতে হুঁ হুঁ করে কাঁদতে লাগল।

সামছু এগিয়ে গিয়ে আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিল। আমি তাকে ধমক দিয়ে বললাম, এই সামছু ভাই, আসেন তো, রাত করে ওদের সাথে কথা বলতে আছে? রাস্তার লোকজন দেখলে কি ভাববে?

সামছু কোনো কথা না বলে আমার সাথে চলে এলো। হাঁটতে হাঁটতে বলল, মানিক ভাই, বেটিরে পুলিশ কড়া মাইর দিছে। দেখছেন না? হাতটা কেমন ফুইলা গ্যাছে?

আমি সামছুর কথায় তাচ্ছিল্য ভাব এনে বললাম, মাইর দিয়েছে না ভাল করেছে। পাঁজিরা রাত করে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে কেন? ওদের কারণে ঢাকা শহরের পরিবেশ নষ্ট। ওদেরকে আরো মার দেয়া দরকার। হাত পা ভেঙে গুড়া করে দেয়া দরকার।

সামছু মনে হয় আমার কথায় খুশি হতে পারল না, আবার সরাসরি বিরোধীতাও করল না। অনিচ্ছা সত্বেও আমার কথার সাথে তাল মিলিয়ে সম্মতিমূলক ভাব নিয়ে বলল, কথা ঠিকই কইছেন মানিক ভাই, এহন রাস্তা-ঘাটে এসব পাঁজির দল বাইরা গ্যাছে, পোলাপানের চরিত্র নষ্ট কইরা ফালাইতেছে, সরকারের উচিৎ এইগুলারে নিয়ন্ত্রন করা।

আমি আর এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বললাম না। সমছুও আর এ প্রসঙ্গ নিয়ে কোন কথা বলল না। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় যে যার বাসায় চলে গেলাম।

পত্রিকায় সীফটিং ডিউটির কারণে পরদিন দুপুরে ডিউটি ছিল। সকাল দশটার দিকে সামছু আমার বাসায় এসে হাজির। আমি তখন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছি। সামছু আসায় তাড়াতাড়ি কাপড় পরে একসাথেই বের হলাম।

আরামবাগের ভিতর দিয়ে মতিঝিলের দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে, ঐ রাস্তা দিয়ে বের হয়ে বিসিআইসি বিল্ডিংয়ের কোনায় আসতেই দেখি রাতের সেই মহিলা। ড্রেনের কিনারে বসে ছেঁড়া ত্যানা দিয়ে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট একটি বাচ্চার মাথায় পানি ঢালছে। বাচ্চাটি অত্যান্ত রুগ্ন। পাঁজড়ের হাড় গোনা যায়। চোখ দু'টো গর্তের মধ্যে। মাথার রগ জেগে আছে। বাচ্চাটি মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে। কিন্তু শরীরে শক্তি না থাকায় তার চিৎকার করা কান্না মিনমিনে আওয়াজ হয়ে অল্প দূরেই মিলিয়ে যাচ্ছে। মহিলার ডান হাতটি তখনও ফুলে আছে। বাচ্চাটির কান্নায় মহিলাটি চোখের পানি ছেড়ে কেঁদে কেঁদে বলছে, বাজানরে-- তুই যে কান্দোস, আমি এহন তরে কি খাইবার দিমু। রাইতে বিশটা ট্যাকা কামাই করছিলাম, মরার পুলিশে মাইরা-ধইরা নিয়া গেল। বাজানরে-- তুই যেমন খিদায় কান্দোস, আমারো তো খিদা লাগছে। তুই তাও কাইন্দা কাইন্দা মায়ের কাছে কইবার পারতাছোস। আমি আমার খিদার কথা কার কাছে কমু রে বাজান?
কথা শুনে সামছু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই বেটি কি হইছে?

মহিলা চোখের পানি ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভাইরে-- পোলার জ্বর, তারোপর খাওন নাই। পোলায় খিদার জ্বালায় কানতেছে।
সামছু আস্তে আস্তে বলল, পোলারে জ্বরের ওষুধ খাওয়ায় নাই?

মহিলা অসহায়ত্ব ভাবে বলল, পেটের ভাত জোটেনা ওষুধ কিনমু কি দিয়া?

সামছু আমার কাছে এসে বলল, মানিক ভাই, আমার কাছে ভাংতি নাই, আপনার কাছে দুইডা ট্যাকা আছে?
আমি বললাম, কেন, টাকা দিয়ে কি হবে?

সামছু বলল, ঐ বেডিরে দিয়া যাই। বেডির পোলা খিদার চোটে কানতেছে।

রাস্তায় তখন অনেক লোক যাতায়াত করছে। সবাই সামছুর দিকে কেমন নোংড়া ক্রুর দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। একজন কিছুটা স্পষ্ট করে বলেই ফেলল, আইজ কাইল মানুষের লাজলজ্জা উঠে গেছে। দিনে দুপুরে পতিতার সাথে ভাব করছে।

কথাটা আমার কানে আসতেই নিজেকে কেমন লজ্জিত মনে হলো। আমি সামছুকে টাকা না দিয়ে ধমক দিয়ে বললাম, এই সামছু ভাই, রাখেন তো আপনার টাকা। আপনি যে মহিলার সাথে কথা বলতেছেন, রাস্তার লোকেরা কি মনে করছে? সবাই আজেবাজে কথা বলছে। আপনার সাথে চলতে গিয়ে মানসম্মান নিয়ে টানাটানি লাগে। আপনার আসলে আক্কেল-পছন্দ কিছুই নেই। চলেন, এখানে আর একমুহুর্তও থাকা যাবে না।

আমার রোষান্বিত কথাবার্তা শুনে সামছু নিচমুখে মাথা দিয়ে পিছনে পিছনে চলে এলো। আর কোন কথা বলল না।

বিকাল বেলা অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরছি। সাথে সামছু আছে। বিসিআইসি ভবনের কাছে আসতেই কান্নার আওয়াজ কানে এলো। এগিয়ে গিয়ে দেখি সেই মহিলা বুক চাপড়িয়ে কাঁদছে। সামনে ত্যানা দিয়ে পুরো শরীর ঢেকে বাচ্চাটাকে রাস্তার এক পার্শ্বে শোয়ায়ে রেখেছে। ছিন্নমুল দু’তিনজন লোক পথচারীর কাছে বাচ্চার কাফনের জন্য টাকা চাচ্ছে। কিছু লোকজন জড়ো হয়েছে। শোয়ায়ে রাখা বাচ্চাটার চার পার্শ্বে অনেকে টাকা ছুঁড়ে দিচ্ছে। পাঁচ টাকা, দশ টাকা, দুই টাকা, এক টাকা অনেকগুলো পড়েছে। আমিও পকেট থেকে দশ টাকা বের করে দিতে যাব, এমন সময় সামছু আমার হাত খপ্ করে চেপে ধরে টাকাটা নিয়ে নিল। আমি কিছুটা উগ্রভাব প্রকাশ করে বললাম, সামছু ভাই-- টাকাটা বাচ্চাটার কাফনের জন্য দিব। আপনি নিলেন কেন?

সামছু একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, মানিক ভাই- এহন ট্যাকা দিলে লাভটা হইবো কি?

আমি বললাম, কেন?

সামছু বলল, মরা মাইনষেরে ট্যাকা দিয়া কি ফল পাইবেন?

আমি বললাম, কেন? এ লাশের কাফন-দাফন করা দরকার না? আমরা টাকা না দিলে ও বেটি কই পাবে? এ লাশ নিয়ে সে কোথায় যাবে? তাছাড়া লাশ মাটির উপর যত থাকবে তত তার আত্মা কষ্ট পাচ্ছে না?

সামছু আমার কথায় কিছুটা অবজ্ঞা সুরেই বলে উঠল, আহারে মানিক ভাই, লাশের আত্মা কষ্ট পাইতেছে হের লাইগা তাড়াতাড়ি দশ ট্যাকা বাইর কইরা দিলেন। ঐ লাশটা যহন জীবিত আছিল, তহন এর চায়াও বেশি কষ্ট পাইছে, তহন তো তারে কিছু দিলেন না?
সামছুর এ প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে গেলাম। শিশুটি বেঁচে থকতে নিজে তো কিছু দেইনি উপরন্তু সামছুকেও দিতে দেইনি। লোক লজ্জার ভয়ে কি নিষ্ঠুরের মত কাজটাই না করেছি। সামছুর প্রশ্নের কি উত্তর দিব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আহাম্মকের মত বললাম, তাহলে কি দশ টাকা দিব না?

সামছু বলল, দ্যান, দিতে আমি না করি না। তবে আপনার কাছে আমার একটা প্রশ্ন-- আপনি অনেক বই পুস্তক পড়েন, জ্ঞান-গরীমা মান-সম্মান সবই আমার থাইকা অনেক বেশি।

আমি বললাম, প্রশ্নটা কি?

সামছু আমার হাতে টাকা দশটি ফেরত দিয়ে বলল, ঐ যে মহিলা বাচ্চার লাশ সামনে নিয়া কানতেছে আর কি সব কইতেছে। হেই বেডির কান্দোনের মাঝে ঐ কথাগুলার অর্থডা কি? হেই অর্থডা আমারে বুঝাইয়া দিয়া ট্যাকা দশটা লাশের কাফনের জন্য দিয়া চলেন যাই।
সামছুর কথায় মহিলার কান্নার পাশাপাশি তার বিলাপগুলো ভাল করে খেয়াল করলাম। মহিলা কাঁদছে আর বলছে, বাজানরে-- তর লাইগা একুল ওকুল দুইকুলই খাইলাম। তুইও চইলা গেলি। আমার লাভটা হইল কি? আমি কার জন্যে করলাম রে বাজা--ন? আমি এহন কারে ধইরা থাকমুরে বা-জা--ন? আমারে কোন কুলে রাইখা গেলিরে বা--প?

সামছুর একটা প্রশ্নে মহিলার বিলাপের মাঝে তার জীবনের এমন কিছু কঠিন তত্ব খুঁজে পেলাম, যা এর আগে কখনো চিন্তা করিনি। বুঝতে পেলাম, মাতৃত্বের টানে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে, জীবনের সমস্ত সত্বাকে পাপ পথে বিলীন করে দিয়েছে। তারপরেও শেষ রক্ষাটি করতে পারেনি। আমরা তার মাতৃত্বকে মূল্যায়ন না করে পাপের মূল্যায়ন করে লোক লজ্জার ভয়ে দূরে সরে থেকেছি। সামছুর প্রশ্নের উত্তর যখন খুঁজে পেলাম তখন নিজের কাছে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। নিজে তো কোন সহযোগীতা করিনি বরঞ্চ সামছুকেউ করতে দেইনি। সামছুর প্রশ্নের অনেক উত্তর ছিল, সব বাদ দিয়ে সামছুর মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে বললাম, সামছু ভাই-- বুঝতে পেরেছি, টাকা গত রাতেই মহিলার হাতে দেয়া উচিৎ ছিল।

একথা বলার পরে সামছু বলল, ভাই, হেই তো বুঝলেন, নিস্পাপ বাচ্চাটা মরার পরে। আমাকে কথাগুলো বলে সেও পকেট থেকে দশ টাকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, যান, এবার বিশটা ট্যাকা লাশের পাশে রাইখা আসেন।

আমি দাঁড়ানো অবস্থায় নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে টাকা বিশটা লাশের পাশে রেখে দিলে, মহিলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদাতে কাঁদতে বলল, ভাইরে-- হেই তো দিলেন, পোলাডা বাইচা থাকতে দিলেন না। আমি মরার আগে পোলাডার মুখে এক ফোঁটা খাইবার দিবার পারলাম না।

মহিলার কথা শুনে মনে হলো অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে শোয়ানো লাশের জন্য দায়ী আমি এবং আমার মত ভদ্রবেশী লোকজন। এ অপরাধের জবাব নেই। শারীরিক শাস্তি না হলেও বিবেকের তাড়নায় মানসিক শাস্তি শুরু হয়ে গেল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। মাথা টলে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। কাঁপতে কাঁপতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামছুকে বললাম, সামছু ভাই চলেন।

সামছু কোন কথা না বলে আমার সাথে সাথে চলে এলো। দু’জনে নিরবে নিঃশব্দে হাঁটতে লাগলাম। নিশি রাতে মহিলার আর্তনাদ, পুলিশের অমানবিকতা, পেটের দায়ে পতিতাবৃত্তি, বাচ্চাটির মৃত্যু সবকিছু মিলে মহিলার দুঃসহ পরিণতির কথা বারবার মনে পড়ছিল। হাঁটতে গিয়ে পাগুলো ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছিল। বাসার কাছে এসে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সামছু নেই, কখন সে পিছন থেকে চলে গেছে বুঝতেই পারিনি। সামছুর এভাবে চলে যাওয়ায় নিজের কাছে নিজেকে আরো অপরাধী মনে হলো। গেটের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বাসায় চলে এলাম।

০০০ সমাপ্ত ০০০
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:১৭
৩৭টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯



৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×