
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
সিঁধেল চোর হিসেবে ময়েজ মিয়ার বেশ নাম ডাক আছে। গ্রামের লোকজন ময়েজ মিয়া নামটাকে বিকৃত করে সংক্ষেপে মইজ্জা নামে ডাকে। মইজ্জা চোর বললে অত্র এলাকায় সবাই এক নামে চেনে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো চুরি করে সে কখনও ধরা পরেছে এমন প্রামাণ কেউ বলতে পারে না। সম বয়েসি বন্ধু-বান্ধবরা রসিকতার মাধ্যমে তাকে মইজ্জা চোর বলে ডাকলেও অসম বয়েসী লোকজন কখনও চোর বলে ডাকে না। বন্ধুবান্ধবরা চোর চোর ডাকলেও সে কখনও তাদের কথায় রাগ করে না। আড়ালে আবডালে যে যাই বলুক না কেন সামনা সামনি সবাই সমীহ করে চলে।
বয়স পঞ্চাশের উপরে। দেখতে সহজ সরল হাবাগোবার মতো মনে হলেও মাথায় অনেক বুদ্ধি রাখে। শুধু মইজ্জা চোরই নয়, যে কোনো চোরের চালচলন, ভাব-ভঙ্গি, আচার-ব্যবহার যাই হোক না কেন, চুরি চোট্টামীর সময় তারা যথেষ্ট উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে চুরি করে থাকে।
মাসটি ছিল ফাল্গুন মাস। ময়েজ মিয়া গভীর রাতে একাই চুরি করার জন্য বের হয়েছে। কয়েকটি গ্রাম ঘুরেও চুরি করার কোনও সুযোগ পায়নি। চুরি করতে না পেরে মনঃক্ষুন্ন হয়ে বাড়ি ফিরছে। ফেরার পথে মাঠের মাঝে একটি বাড়ি চোখে পড়ল। আসেপাশে ঐ বাড়ি ছাড়া আর কোন বাড়ি নেই। রাস্তা থেকেও কিছুটা দূরে। গৃহস্থ বাড়ি। ততটা অবস্থাপন্ন নয় তবে সচ্ছল। বাড়িতে কোনো টিনের ঘর নেই সবকটি খড়ের ঘর। সেই সময়ে সিঁধেল চোরেরা পেটের ভাত যোগাড় করার জন্যই চুরি করতো। চুরি করতে গিয়ে দামি জিনিষপত্র না পেলে অল্প দামের জিনিষপত্র পেলেও চুরি করতো। এমন কি ধান, চাল, পরনের কাপড়-চোপড়ও চুরি করতো। ময়েজ মিয়া ঐ বাড়িতেই চুরি করার মনস্থ করল। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বাড়ির কাছে যেতেই কুকুর তাড়া করে বসল। কুকুরের তাড়া খেয়ে চুরি করা বাদ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে এলো।
পরদিন রাতে আবার সেই বাড়িতে চুরি করতে গেল। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই কুকুর তেড়ে আসল। কুকুরের চরা গলায় ভুগ ভুগ ভু-- উ -- শব্দ শুনে বাড়ির লোকজন জেগে উঠল। তারা ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে এসে গলাখাঁকারী দিয়ে বাড়ির চারদিকে লাঠি হতে ঘুরতে লাগল। বাড়ির লোকজন যেহেতু জেগে উঠেছে কাজেই সে রাতেও তার পক্ষে চুরি করা সম্ভব হলো না। দু’দিন চুরি করতে এসে ফিরে যাওয়ায় মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে বসল, যে কোনো ভাবেই হোক এবাড়িতে চুরি করবেই।
পরদিন সকালে পাশের গ্রামে কাজে যাওয়ার নাম করে ঐ বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চুরি করার সুবিধা অসুবিধাসহ পালিয়ে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তার সুযোগ সুবিধা ভাল করে অবলোকন করার জন্য গিয়েছে । কিন্তু বাড়ির কাছে যেতে না যেতেই কুকুর ঘেউ ঘেউ করে কামড়াতে এলো। ময়েজ মিয়া যে চোর, দু’দিন রাতে চুরি করতে এসেছিল এটা কুকুর ঠিকই বুঝেছে। ঘেউ ঘেউ করে চোরের কথা সবাইকে বলতে চাচ্ছে। মানুষের মত কথা বলতে পারছে না তাই কেউ বুঝতে পারছে না। তবে ময়েজ মিয়া কুকুরের আচরণে সে সব বুঝে নিল। মনে মনে চিন্তা করলো কুকুরকে পরাস্ত না করতে পারলে এ বাড়িতে চুরি করা সম্ভব হবে না। কাজেই কুকুরকে আগে চোর তাড়ানোর মনোভাব বন্ধ করতে হবে। কুকুরের মুখ কি করে বন্ধ করা যায় সেই কৌশলসহ, তন্ত্রমন্ত্র, ঔষধ-পত্র খুঁজতে লাগল। অবশেষে পেয়েও গেল।
দু’দিন পরে ময়েজ মিয়া গামছার আঁচলে মুড়ি নিয়ে খেতে খেতে ঐ পথ দিয়েই যাচ্ছল। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কুকুর দৌড়ে এলো। কুকুরের ভয়ে মুড়ি ফেলেই ময়েজ মিয়া দৌড়াতে লাগল। ময়েজ মিয়ার ফেলে দেওয়া মুড়ি পেয়ে কুকুর আর দৌড় দিল না। ময়েজকে তাড়ানো বাদ দিয়ে ছড়ানো ছিটানো মুড়িগুলি খেতে লাগল। কুকুরের মুড়ি খাওয়া দেখে ময়েজ মিয়ার মাথায় নতুন বুদ্ধি এলো। তিনদিন পরে অমাবশ্যা রাত। অমাবশ্যা রাতে এই বুদ্ধি প্রয়োগ করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
অমাবশ্যার রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের শরীর নিজে দেখা যায় না। রাত গভীর হওয়ার কিছু পূর্বেই ময়েজ মিয়া রওনা হলো। এবার খালি হাতে নয় কুকুরের মুখ বন্ধ করার জন্য সাথে কিছু তন্ত্র-মন্ত্রের উপকরণ নিয়েছে। সিঁদ কাটার জন্য ছোট একটা লোহার সাবল, কাঁচের বোতলে একছটাক সরিষার তেল, কলার পাতায় পোঁটলা করে বাঁধা পুরো এক সের চালের ভাত। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আজকে যদি ওই বাড়ি চুরি করতে না পারি তাহলে আর কখনও ও বাড়িতে চুরি করতে যাবো না।
বাড়ির কাছাকাছি যেতেই কুকুর দৌড়ে এলো। ময়েজ যে প্রায়ই এ বাড়িতে চুরি করতে আসে এটা কুকুর তার উপস্থিতি টের পেয়েই বুঝতে পারে। কিন্তু ময়েজও নাছোর বান্দা। চুরি না করে আজ আর ফিরবে না। কুকুর তেড়ে আসলেও ভয়ে দৌড় না দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। কুকুর কাছে আসতেই কলার পাতার পোটলা খুলে ভাতগুলো ছড়িয়ে দিল। কুকুর ময়েজের দিকে দুইবার ঘেউ ঘেউ করেই থেমে গেল। ভাত পেয়ে চোর তাড়ানোর কথা ভুলে গেল। মাটিতে ছড়ানো ভাতগুলো মহা আনন্দে খেতে লাগল।
কুকুর সাধারণতঃ খাওয়ার সময় লেজ উঁচু করে খায়। কুকুরের এ স্বভাবটি সে কয়েকদিন খেয়াল করে দেখেছে। এই কুকুরটিও ভাত পেয়ে খুশির চোটে লেজ উঁচু করে নেড়ে নেড়ে খাচ্ছে। অন্য দিকে তার খেয়াল নেই। এই ফাঁকে ময়েজ তার হাতে রাখা তেলের বোতলের মুখ খুলে কুকুরের পায়ুপথের উপর পুরো এক ছটাক তেল ঢেলে দিল। তেল ঢেলে দেয়ায় কুকুর খাওয়া বন্ধ করে মুখ তুলে ময়েজের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কিন্তু ঘেউ ঘেউ করল না।
কুকুরের এই অবস্থা দেখে ময়েজ মিয়া মনের ভিতর সাহস পেল। কুকুরকে খাবারের অবস্থায় রেখে বাড়িতে গিয়ে উঠল। বাড়িতে মোট চারটি ঘর। একটি রান্না ঘর, একটি গোয়াল ঘর, দু’টি থাকার ঘর। যে ঘরটিতে মালপত্র রাখা আছে সেই ঘরে গৃহস্থ নিজে থাকে। মুশকিল হলো গৃহস্থ আলো জ্বালিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আলো জ্বালানো অবস্থায় ঘুমালেও সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেউ সজাগ নেই। দু’টি ঘর থেকেই নাক ডাকার শব্দ আসছে। কেউ সজাগ আছে কিনা তা পরখ করে দেখা দরকার। জেগে থাকা মানুষকে পরখ করার জন্য ঘরের বেড়ায় তিনটি থাপ্পর দিল। কেউ কোন সাড়া শব্দ করল না।
সাড়া শব্দ না করলেও আলো জ্বালানো অবস্থায় চুরি করা ওস্তাদের নিষেধ। সব সিঁধেল চোরেরাই নাকি এই নিয়মটি পালন করে। কারণ, আলো জ্বালানো অবস্থায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পরার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কাজেই আলো কিভাবে নিভানো যায় সেই চিন্তা করতে লাগল। মাথায় উপস্থিত বুদ্ধি পেয়েও গেল।
ঘরের উপরে কাঁঠাল গাছ। লাফ দিয়ে কাঁঠাল গাছে উঠে ঘরের চালে নেমে বিড়ালের মত আস্তে আস্তে চাল বেয়ে উপরে উঠে গেল। ঘরে যে অবস্থানে কেরোসিনের ল্যা¤পটি জ্বালানো আছে ঠিক সেই ল্যাম্প সোজা চালের উপর বসে নিশানা অনুযায়ী সাবল দিয়ে খড়ের চাল ফুটো করে নিল। খরের চাল হওয়ায় ফুটো করতে খুব একটা সময় লাগল না। চাল ফুটো করার পর নিশব্দে দু’হাত দিয়ে খামছে খড় সরিয়ে ফুটোর ছিদ্রি বড় করে নিল। ফুটো দিয়ে আস্তে করে থুথু ফেলল। থুথু উপর থেকে নিচে ল্যাম্পের কাছাকাছি পড়ল ঠিকই তাতে ল্যাম্প নিভল না। আবার ল্যাম্প সোজা থুথু ফেলল এবারও থুথু ল্যাম্প-এর উপরে না পড়ে পাশে গিয়ে পড়ল। এভাবে কয়েকবার থুথু ফেলে ল্যাম্প নিভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। থুথু ফেলে ব্যর্থ হওয়ায় মাথায় নতুন বুদ্ধি এলো। পরনের লুঙ্গির অগ্রভাগ দড়ি পাকিয়ে চালের ফুটো দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। পাকানো লুঙ্গির অগ্রভাগ চালের নিচে ঝুলতে লাগল। ঝুলানো লুঙ্গির গোড়ায় পেসাব করে দিল। ময়েজের পেসাব ঝুলানো লুঙ্গির অগ্রভাগ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় নিচে পড়তে লাগল। হাত দিয়ে লুঙ্গির অগ্রভাগ ল্যাম্পের উপর সোজা করে ধরতেই কয়েক ফোঁটা পেসাব ল্যাম্পের আলোর উপর পড়ে নিভে গেল।
ল্যাম্প নিভে গেলে ময়েজ মিয়া চাল থেকে নেমে এসে ঘরের পূর্ব দিকে গাছের আড়ালে সিঁদ কেটে ঘরে মানুষ ঢোকার মত বিশাল গর্ত করে নিল। সিঁদ কেটে মইজ্জা প্রথমেই গর্তে না ঢুকে ঘরের পিছনে ফেলনা ভাঙা মাটির হাঁড়ি সাবলের মাথায় দিয়ে সেই হাঁড়িটি সাবলসহ তিনবার গর্তের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল আবার বের করল। অর্থাৎ যদি কেহ জেগে থাকে বা গর্তের কাছে চোর ধরার জন্য বসে থাকে সাবলের মাথায় হাঁড়ি অন্ধকারে চোরের মাথার মত দেখা যাবে, চোরের মাথা মনে করে কেউ হাঁিড় ধরার সাথে সাথেই ঘরের বাইরে থেকে দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাবে।
তিনবার সাবলসহ হাঁড়ি গর্তের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে বের করার পর যখন নিশ্চিত হলো যে কেউ জেগে নেই তখন মইজ্জা মিয়া ঘরে ঢোকার জন্য নিজের মাথা ঢুকিয়ে দিল। মাথা ঢুকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিরাপদ মনে করে ঘরে ঢুকে গেল। ঘরে তেমন একটা মাল-পত্র ছিল না। হাতের কাছে দু’মন চালের বস্তা পেয়ে একাই ঘাড়ে তুলে নিয়ে এল।
চুরি করে ফিরে যাওয়ার সময় তাকিয়ে দেখে কুকুরটি বাহির বাড়ির উঠানে চুপচাপ শুয়ে আছে। একবারও সে ঘেউ ঘেউ করে উঠল না। ঘেউ ঘেউ করার ক্ষমতা সে হারিয়েছে। কারণ কুকুর ঘেউ ঘেউ করার সময় লেজ দিয়ে পায়খানার রাস্তা চিপে ধরে। লেজের গোড়াসহ পায়খানার রাস্তায় সরিষার তেল ঢেলে দেয়ায় কুকুরের পিছন অংশ পুরোই পিচ্ছিল হয়েছে, যে কারণে সে লেজ চিপে ধরতেও পারছে না ঘেউ ঘেউ করে ভুগতেও পারছে না। কুকুরের মুখ বন্ধ করার এই পদ্ধতী অনুসরণ করে পরবর্তীতে ময়েজ মিয়া আরো অনেক বাড়ি চুরি করেছে। এরপর থেকে আর কখনই কুকুরের আক্রমণে চুরি থেকে তাকে ফেরৎ আসতে হয় নাই।
(গল্পটি কাল্পনিক)
(ছবি ইন্টারনেট)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




