somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি মনিপুরি পরিবারের আতিথেয়তা এবং সিলেট ভ্রমণ

২৮ শে নভেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মনিপুরি সম্প্রদায়ের লোকজন এতো অতিথি পরায়ন হয় এটা আমার আগে জানা ছিল না। না জানার কারণও আছে-- আগে কখনও এই সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে মেশার সুযোগ হয় নাই, বই পুস্তকেই যা জ্ঞান লাভ করেছিলাম ততটুকুর মধ্যে জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল। গত এক দশক হলো ঢাকায় একই বিল্ডিংয়ে বসবাস করার কারণে সুরজিত ‍কুমার সিনহা নামের একজন ভদ্রলোকের সাথে প্রথমে ক্যান্টিনে পরিচয় এবং পরিচয় থেকেই বন্ধুত্ব। রাতের ডিনারে প্রায় প্রত্যেক দিনই দুইজন একই টেবিলে বসে ডিনার করে থাকি। ডিনার টেবিলে একত্রে ডিনার করতে করতে দুইজনের বন্ধুত্ব এমন এক পর্যায়ে যে, একজনের ডিনারে উপস্থিত হতে দেড়ি হলে আরেকজন অপেক্ষায় বসে থাকতাম এক সাথে ডিনার করার জন্য। ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও আমাদের মধ্যে স্বাভাবিক মতের কখনও অমিল হয় না।


গত বছর সিলেটে পরিবার নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে সুরজিত বাবু ট্রেনের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে সিলেটের হোটেল বুকিং পর্যন্ত করে দিয়েছিলেন। তার এই সহযোগীতা ভুলে যাবার মত নয়। কিন্তু বিধিবাম হওয়ায় টিকিট কাটার পরও যাওয়া হয় নাই। যাওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো পরিবার নিয়ে এয়ারপোর্ট স্টেশনে সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত বসে থেকেও সিলেটের কোন ট্রেন না পেয়ে অবশেষে টিকিটের টাকা ফেরৎ নিয়ে বাসায় ফিরে গিয়েছিলাম। ট্রেন এক্সিডেন্টের কারণে সিলেটের সাথে ২৬ ঘন্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ছিল। সারাদিন স্টেশনে বসে থাকলেও স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন এক্সিডেন্টের সামান্যতম বার্তাটিও দেয়া হয় নাই। যখনই স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করেছি ট্রেন কতদূর-- তখনই স্টেশন মাস্টার উত্তর দিয়েছে এই তো, আধ ঘন্টার মধ্যে ট্রেন চলে আসবে। ট্রেন যে এক্সিডেন্ট করেছে একথা একবারও তিনি বললেন না। আমরাও স্টেশন মাস্টারের কথা অন্ধের মত বিশ্বাস করে বসে ছিলাম। সেইদিন স্টেশনে বসে আমিই শুধু কষ্ট করি নাই আমার মত হাজার হাজার যাত্রী কষ্ট করেছিল। আমার বাসা ঢাকা শহরে হওয়ায় সহজেই বাসায় ফিরতে পারলেও অনেক যাত্রী রংপুর দিনাজপুর থেকে এসে আটকা পড়েছিল। প্রথম শ্রেণীর ওয়েটিং রুমে বাচ্চাকাচ্চাসহ দিনাজপুর থেকে আসা একটি পরিবারের মুখগুলো আজো চোখে চোখে ভাসে । তারা দিনাজপুর থেকেই অনলাইনে সিলেট পর্যন্ত টিকিট কেটেছিল। বাচ্চাগুলো বাসে বমি করে দেখে ট্রেনে যাত্রা করে মাঝ পথে আটকা পড়েছে। না যেতে পারছে দিনাজপুর না যেতে পারছে সিলেট। বাসায় ফিরে টিভিতে স্ক্রল দেখে টের পেলাম আখাউরার কাছে ট্রেন সকালেই এক্সিডেন্ট করেছে। ট্রেন এক্সিডেন্ট করলেও যাত্রীদের বলা যাবে না ব্রিটিশদের দেয়া সেই নিয়মটি বর্তমানেও বাংলাদেশ রেলওয়েতে চালু আছে।

এবার সুরজিত বাবুকে না জানিয়েই সিলেট এসেছি। কারণ গতবছর না যাওয়ার কারণে বুক করা হোটেল ক্যানসেল করতে হয়েছিল। এই
কাজটি তিনিই করেছিলেন। সেই ভোগান্তির কথা চিন্তা করেই এবার তাকে জানাইনি। সিলেট এসে ফোন করে যখন জানালাম তখন তিনি কিছুটা আশ্চর্যই হয়েছিলেন। তবে তেমন কিছু বললেন না শুধু আমার কাছ থেকে হোটেলের নাম ঠিকানা আর রুম নাম্বার চেয়ে নিলেন। রুম নাম্বার দেয়ার পর আর কোন কথা হলো না। পরদিন হুট করেই দেখি অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন, ফোন রিসিভ করতেই অল্প বয়সি কণ্ঠে বলল-- আঙ্কেল, আমি তো আপনার হোটেলের নিচ তলায় বসে আছি। আমি চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম-- তুমি কে? ছেলে ঝটপট উত্তর দিল, আমি সুরজিত বাবুর ছেলে সৌমিত্র। আমি থ হয়ে গেলাম, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। সুরজিত বাবুর ছেলেটি বেশ আন্তরিক, সকালে আসার পর থেকে প্রায় সারাদিনই আমাদের সাথে সঙ্গ দিয়েছে। চা বাগানসহ পুরো সিলেট শহর ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। ছেলের এই সহযোগীতা কোন দিনই ভুলবো না। দুপুরে পানসী হোটেলে লাঞ্চ সেরে তাকে বিদায় দিয়ে আমরা হোটেলে রেস্ট নিচ্ছিলাম। সন্ধার সময় দেখি ছেলেটি আবার এসেছে। এসেই বলতেছে আঙ্কেল, মা আপনাদের নিয়ে যেতে বলেছে। তাদের বাসায় যাবো এবিষয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমার ছেলেমেয়েদের আগ্রহ প্রচুর। তাদের আগ্রহের কারণ হলো মনিপুরিদের ঘর বাড়ি দেখা। তাদের আগ্রহের কারণেই সন্ধার পরপরই রওনা হলাম। হোটেল থেকে খুব দূরে নয়।

বাসায় পৌঁছলে সুরজিত বাবুর স্ত্রী এবং ছোট ভাই রবীন্দ্র সিনহা আমাদের বাড়ির গেট থেকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। সুরজিত বাবুর স্ত্রী সরাসরি উনার বেড রুমে নিয়ে আমাদের বসতে দিলেন। জীবনের প্রথম পরিচয় এবং প্রথম দেখাতেই অন্দর মহলে নিয়ে বসাবে এটা কল্পনাও করতে পারি নাই। রবীন্দ্র ভালো বাংলা বলতে পারলেও সুরজিত বাবুর স্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ পুরোপুরি শুদ্ধ নয়। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলে। তবে বলার স্টাইলটা আমার কাছে বেশ ভালই লাগতেছিল। কথা যেভাবেই বলুক না কেন তাদের আন্তরিকাতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মেয়ে স্বস্তিকা মুহুর্তই আমার ছেলে মেয়ের সাথে মিশে গল্প গুজোবে মত্ত হয়ে গেল। রবীন্দ্র সিনহার মেয়ে শ্রেষ্ঠার কথা তো ভুলতেই পারছি না। পুতুলের মত সুন্দর ছোট মেয়েটির চঞ্চলতার দৃশ্য এখনও চোখে চোখে ভাসে। পুরো পরিবারটাই বেশ আন্তিরিক।
পরিচয় পর্ব শেষ হতে না হতেই খাবার এনে হাজির। অনেক কিছুই খাবার দিয়েছে, তার মধ্যে গরম গরম লুচি এবং মনিপুরি স্টাইলে রান্না করা ডালের তুলনা হয় না। ডালের মধ্যে কিসের যেন পাতা দিয়েছে, পাতাগুলোর কারণে ডালের স্বাদ অনেক বেড়ে গিয়েছে। এইরকম স্বাদের ডাল আমার জীবনে আর কখনও খাই নাই। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতেই রবীন্দ্র তার ঘরে গিয়ে হাতে বোনা দু’টি উলের মাফলার এবং সুরজিত বাবুর স্ত্রী তার নিজের হাতে বোন উলের চাদর এনে আমার স্ত্রীকে গিফট করলেন। তাদের গিফট করা দেখে আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না। বস্ত্র দান করা এটা নাকি তাদের অতিথী আপ্যায়নের একটি অংশ। তাদের কৃষ্টি কালচার সম্পর্ক-এ আমার তেমন একটা ধারনা না থাকলেও তাদের সহজ সরল মনের অতিথী আপ্যায়ন দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারা আমাদের এমনভাবে আপন করে নিয়েছিলেন যেন আমরা তাদের যুগযুগ ধরে পরিচিত এবং খুবই আপন কেউ। বাংলাদেশের বুকে এইরকম আন্তরিকতাপূর্ণ সহজ সরল মনের কমউনিটিগুলো যুগযুগ ধরে বেচে থাক আমি এই কামনাই করি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:৪৪
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

(আবার ফিরে যাই ঝুমতলি)

লিখেছেন সুলতানা শিরীন সাজি, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৮:১৮

রেললাইন বয়ে যায়।ভোরের প্রার্থনার বিপুল শক্তি।অন্ধকারকে আলো দিতে দিতে সকাল এগোয়! এমন সকাল এলেই ঝুমতলি যেতে ইচ্ছে করে! কুয়াশাঘেরা এক স্টেশনের রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কালো রং শাড়িতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে দিনের বেলা ভ্রমণ ........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১০:২৮


ঢাকা - বরিশাল/বরিশাল - ঢাকা নৌপথে দিনের বেলা বিগত বছরগুলোতে শুধু মাত্র গ্রীন লাইন জাহাজ কোম্পানির দুটি জাহাজ চলাচল করতো। যাত্রী সল্পতায় একটা জাহাজ বন্ধ করে, এক জাহাজেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুর মোবাইল এপ্লিকেশনের ইউজার ইন্টারফেস কেমন হতে পারে !

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১:২১



কয়েক দিন ধরে একটা অনলাইন কোর্সে ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটরের বিভিন্ন টুলসের ব্যবহার শিখছি। তবে শিখতে গিয়ে যা টের পেলাম তা হচ্ছে আমার ভেতরে ক্রিয়েটিভি শূন্য। যাই হোক, সেখানকার একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

Four Beautiful Ladies, বাংলাদেশী মডেলিং জগতে যাদের তুলনা ছিল শুধুই তারা - ওরা চারজন (পেছনে ফিরে দেখা)

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:১৫



মাঝে মাঝে এমন হয় যে, একটা দীর্ঘ এক ঘন্টার নাটকের চাইতে ৩০ সেকেন্ড বা এক মিনিট এর একটা বিজ্ঞাপন আমাদের মনে অনেক গভীর দাগ কেটে যায়। আর নব্বই এর দশকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারায়ণগঞ্জে নয় ঘন্টা

লিখেছেন আবদুল্লাহ আফফান, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:৪২


দিনটা অন্যান্য দিনের মতোই শান্ত। তবুও অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। সংক্ষিপ্ত সফরে নারায়গঞ্জে যাচ্ছি। সকাল ১০টায় বাসা থেকে বের হলাম। হোটেলে নাস্তা খেয়ে কমলাপুরের নারায়ণগঞ্জ প্লাটফর্ম থেকে টিকেট কাটলাম। ট্রেন ছাড়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×