somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি থেকে

১৪ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ১২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিজয়ের মাস ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের নভেম্বরে হলো ঈদ। কিভাবে যে ঈদ করলাম তা এখন ভাবতেই অবাক লাগে। তখন থাকতাম বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) – ভারতের বর্ডারে একটা ক্যাম্পে। চাচা তাহেজ উদ্দিন সরকার আমাদের কয়েকশ মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার। তাঁর চিঠি নিয়ে এসেছে ইসহাক কাকা, যিনি এখন বেড়া থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। চিঠি পেয়ে আমরা ২০-২৫ জনের একটা দল রওনা দিলাম ভারতে। হুরা সাগর নদী আমার বাড়ী সংলগ্ন। সেখান থেকে রাতে নৌকায় উঠলাম। সাথে আছে গতকাল হাটে ধানবিক্রি করা ১৭ টাকা। পরনে লুঙ্গী ও পাঞ্জাবী পায়ে পঞ্জের সেন্ডেল। পরের দিন যমুনা নদীর পাশে একটা জায়গায় আমরা যাত্রা বিরতি করলাম। উদ্দেশ্য কিছু খাবার সংগ্রহ করা। আমি, দুলু ও মঈন (ডাঃ মঈন এখন আমেরিকায় থাকে)। এক-দুই বাড়ী ঘুরার পরে যথেষ্ঠ চাল-ডাল এবং আন্তরিকতা পেলাম। জীর্ণ একটা ঘরের কোণ থেকে ৪০ বছর বয়সের একজন লোক এসে আমাদেরকে বললেন, আপনারা নৌকায় ফিরে যান। প্রশ্নের দৃষ্টির নিয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। অন্যদিকে ক্ষুধায় শরীরটা বিষণœ হয়ে আসছে। ভদ্রলোক বললেন, “আপনারা মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনারা জানেন না যে, এই এলাকায় রাজাকার, আলবদর আছে। যারা আপনাদেরকে পাক-বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিতেও পারে অথবা আপনাদেরকে মেরেও ফেলতে পারে”। সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করলাম সত্যি আমাদের এভাবে এখানে আসাটা ভুল হয়ে গেছে। নৌকায় এসে যখন পৌঁছোলাম, তখন পশ্চিম গগণে সূর্যের দেখা পেলাম না। রাতে যখন খাবার খেতে বসলাম, প্লেটে পেলাম কয়েক রকম চালের উষ্ণ ভাত। সাথে আগুনে পোড়ানো দুটো শুকনো মরিচ। রাতের বেলায় যে জায়গায় আমাদের নৌকাকে আটক করা হল, তা ছিল একটা চর অঞ্চল। জানতে পারলাম যারা আমাদেরকে আটক করেছে, তারা কাদেরিয়া বাহিনীর সৈনিক, অর্থাৎ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি বাহিনীর সদস্য, ওরা আমাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারল, আমরা যুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারত যাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দিলেন যে, এক ঘন্টা নৌকা চালালে আপনারা বাহাদুরাবাদ ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন। পৌঁছে ওখানেই অবস্থান করবেন। সূর্য উঠার সাথে সাথে আপনারা দ্রুত নদী পার হবেন। মনে রাখবেন, যত তাড়াতাড়ি ওপারে যাবেন, তত তাড়াতাড়ি আপনারা মুক্ত এলাকায় পৌঁছে যাবেন। গতকালও সকাল ১০ টার দিকে দুটি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধারা নদী পাড় হয়ে ভারত যাচ্ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে মুক্তিযোদ্ধাদের মেরে ফেলেছে ও নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। আমরা কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধার উপদেশ অনুযায়ী, আল্লাহর নাম নিয়ে প্রাণপণে নৌকা চালিয়ে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে গেলাম। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারি ক্যাম্পে কয়েকদিন অবস্থান করার পর উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা হবার প্রাক্কালে দুলু, শাহাদত ও এসকানকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারলাম ওরা মা-বাবার টানে বাড়ি ফিরে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাস্তায় যেতে যেতে ওদের কথাই বেশি মনে পড়ছিলো। যদি কোনো ভাবে বা কোন কারনে ওরা রাজাকার, আলবদর বা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, তাহলেতো নিশ্চিত মৃত্যু ছাড়া আর কোন পথ নেই। পশ্চিমবঙ্গের ক্যাম্পে সাউদ মামা আমাদের স্বাগত জানিয়ে ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। সাউদ মামা ১৯৬৭ সালে “র‌্যাক্সু” এর ভিপি ছিলেন। ১৯৭০ সালে এমএনএ, ১৯৭৩ সালে এম.পি, ১৯৯৬ সালে এম.পি. নির্বাচিত হন পাবনা-১ থেকে। আবু সাউদ সাহেবের ক্যাম্পে থাকাকালীন সময়ে জলিল(মরহুম আব্দুল জলিল প্রাক্তন এমপিও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ) ভাইয়ের সাথে তার ক্যাম্পে কয়েকবার দেখা হয়েছিল। জলিল ভাই খুব আদর করতেন আমাকে। ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারুল করিম মিন্টু উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজাম ভাইয়ের নেতৃত্বে (নিজাম ভাই তৎকালীন সময়ে শাহজাদপুর কলেজের ভি.পি. ছিলেন, বর্তমানে পাবনা জেলার সাথিয়া থানার উপজেলা চেয়ারম্যান) দেশের ভিতরে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে। স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে জানতে পারি, সম্মুখ যুদ্ধে মিন্টু শহীদ হয়েছে। নভেম্বরের ২৬-২৭ তারিখের দিকে দুপুরে ইন্দ্ররা থেকে পানি তুলে গায়ে ঢালছিলাম আমিও তাহেজ চাচা এমন সময়ে শুনতে পেলাম আমাদের ক্যাম্পে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী হামলা করেছে। আমি এবং ছোট চাচা তাহেজ মুক্তি ঐ অবস্থায় এসএলআর ও এসএমজি নিয়ে দৌড় শুরু করলাম ক্যাম্পের দিকে। ঘরে থাকলো তাঁর স্ত্রী, ছোট মেয়ে মিতু ও চার ছেলে -ঝন্টু, পিন্টু, মিন্টু, মিলন। চাচা আর আমি, খানিকক্ষণ পর যুদ্ধের খাতির আলাদা হয়ে গেলাম। রাত ৯টার দিকে আমি যখন ঘরে ফিরলাম, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার তাহেজ চাচার এখনও কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। আল্লাহর অশেষ রহমতে, ঘন্টাখানেক পরে চাচা ফিরলেন, চোখে অশ্রু আর মুখে প্রচন্ড কান্তি, বললেন, “তোমাকে অনেক খুঁজেছি, না পেয়ে ভাবলাম, পাঁচ বিবির মফিজের মত তোমাকেও হয়তো ওরা ধরে নিয়ে গেছে।” এরপরই শুরু হলো যুদ্ধের পূর্ণ দামামা, আমরা ২রা ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের বগুরা জেলার পাঁচবিবি থানায় পৌঁছে গেলাম, আসার পথে পাক হানাদার বাহিনীর পোঁতা মাইনে পা ওড়ে গেল হাদীর। পরে জানতে পেরেছি তাঁকে বিদেশ পাঠিয়ে যাবতীয় চিকিৎসা করে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে।

লেখক: প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার, মুক্তিযোদ্ধা।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ১:০২
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×