somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট্ট গল্পঃ শশশ..কথা না বলি!

০১ লা নভেম্বর, ২০১৩ রাত ৮:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাড়ে তিনটার মত বেজে গেছে, বৃষ্টি থামার নাম নেই। টিপটিপ করে সেই সকাল থেকে পড়ছে তো পড়ছেই। একটু যেন শীতও পড়ে গেছে সেই সাথে। লাইব্রেরীর সামনের প্রাঙ্গণে গোড়ালি-পানিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটার মনে হতে থাকে, ভুল হয়ে গেছে। গায়ে আরও কিছু জড়িয়ে আসা উচিত ছিল। সে ছপ ছপ শব্দ তুলে লাইব্রেরির বারান্দায় উঠে দাঁড়াল, তারপর নীল ছাতাটা নামিয়ে রাখল মেঝেতে।

এটা তাদের জিলা শহরের মাঝে সবচে বড় লাইব্রেরি। সেই উনিশ শতকের দিকে কোন এক জমিদারের হাত ধরে এর জন্ম, তারপর সময়ের সাথে একে একে বিভিন্ন শাসক-প্রশাসনের অর্থ-সহযোগিতায় আরও বড় হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে এর সংগ্রহ। কি নেই এখানে! গল্প-উপন্যাস, পুরনো দিনের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, পুঁথি, জীবনী, ভ্রমণ বর্ণনা, ইতিহাস থেকে শুরু করে অনেক মোটা মোটা ইংরিজি বইও আছে। মেয়েটা এই লাইব্রেরিতে প্রায়ই আসে। তার বই পড়তে ভাল লাগে। বিশেষ করে ডিটেকটিভ গল্পগুলো।

মেয়েটা ঘরে ঢুকে বুড়ো লাইব্রেরিয়ানের দিকে একটা পরিচিত হাসি ছুঁড়ে দেয়, তারপর ঘরটা পর্যবেক্ষণ করে। লাইব্রেরিতে সবসময় কমবেশি চার-পাঁচ জনের মত মানুষ থাকে, আজ বৃষ্টি বাদলার দিনেও দেখা যাচ্ছে ব্যতিক্রম হয় নি; দুজন মানুষ টেবিলে বসে পেপার পড়ছে। সে লাইব্রেরির কোণার দিকে হাঁটতে শুরু করে- রহস্যোপন্যাসের সেকশনটা ওখানে।

ফেলুদা..পড়া হয়ে গেছে...দস্যু বনহুর..এটাও... কিরীটি-ঘনাদা-বক্সী..উঁহু...প্রোফেসর শঙ্কু..হ্যাঁ! বইগুলোর শিরদাঁড়ায় হাত বুলোতে বুলোতে সে শঙ্কু সমগ্র বের করে নেয়। টেবিলে বই রেখে প্রথম পৃষ্ঠা খোলে। 'মহাকাশের দূত', হুম, ইন্টারেস্টিং শিরোনাম। মেয়েটা পড়া শুরু করে। কিন্তু লাইব্রেরির ২৫ ওয়াটের বাতির আলো বাইরের ধূসর কুয়াশার মত তেড়ে আসা অন্ধকারের সাথে তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। কম আলোতে পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই হয়তো মেয়েটা জোরে জোরে পড়তে শুরু করে। তার এই সশব্দ সাহিত্যরস আস্বাদনে কাগজ-পড়ুয়া দুজন বিরক্ত হয়। যুগপৎ কাশি আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তারা ব্যাপারটা জানান দিতে চায়, কিন্তু সে তখন গল্পের ভেতরে ঢুকে গেছে আপাদমস্তক। এই জগতের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

আরও পাঁচ মিনিট কাটে, তবুও মেয়েটার রিনরিনে কণ্ঠ থামে না। ত্যক্তবিরক্ত কাগজ-পড়ুয়ারা এবার অন্য পথ, অর্থাৎ লাইব্রেরিয়ানকে, ধরে। নিশ্চয়ই তাদের সুপারিশ বলিষ্ঠ ছিল, কারণ কিছুক্ষণ পরে বুড়োকে মেয়েটার দিকে আসতে দেখা যায়। কাঁধে হাত অনুভব করে মেয়েটা চমকে ওঠে, তার উচ্চারণ থেমে যায়, সে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকায়। বুড়ো বিরক্তি ঢেকে রেখে বলে, 'মা, কম আলোতে এত ছোট ছোট অক্ষরের বই পড়ছ, কষ্ট হচ্ছে না?'
মেয়েটা মাথা নাড়ে, 'একটু একটু'।
- 'আচ্ছা। আমরা তাহলে একটা কাজ করি। আমি যে ঘরটায় বইয়ের যত্ন-আত্তি করি, ওখানে পাওয়ারফুল লাইট আছে- তোমার পড়তে সুবিধা হবে। তুমি ওই ঘরে বসে বসে পড়, হ্যাঁ?'
মেয়েটা সম্মতি জানিয়ে বইটা আঁকড়ে ধরে বুড়োকে অনুসরণ করে।

বুড়ো শেলফের পাশে দাঁড়ানো সবুজ দরজাটা খুলতেই মেয়েটা বুঝতে পারে, ঘরটা মাটির তলায়। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে স্যাঁতসেঁতে কাগজ, ভেজা কালি আর আঠার গন্ধ পায়। কেমন নেশা লাগানো গন্ধ। এই ঘরটা বেশ বড়, সারি সারি অনেকগুলো বইয়ের শেলফ আছে, একটা টেবিল দেখা যাচ্ছে, কোণায় একটা সাদা বাতি জ্বলছে। বুড়ো টেবিলের কাছে একটা চেয়ার টেনে আনে, তারপর মেয়েটাকে বসিয়ে দেয়।

'পড়, কেমন? কিছু লাগলে আমাকে ডাকবে। আমি ওপরেই আছি।'

মেয়েটা পুতুলের মত ঘাড় নাড়লে লোকটা মৃদু হাসে, তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে একটা আলতো ধাতব শব্দ শোনা যায়। মেয়েটা পড়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এবারে গল্পটা কেন যেন তাকে টানছে না। সে কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে পাতা উল্টে তারপর উঠে দাঁড়ায়, ঘরটা ঘুরে ফিরে দেখতে শুরু করে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা শেলফের পেছনে গিয়ে তাকাতেই সে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখতে পায়। তিনটে বাচ্চা, বয়েস আট-ন বছরের বেশি হবে না, বিধ্বস্ত পোশাকে মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। তাঁদের কপালে-গালে একাকার হয়ে আছে শুকনো থুতু-সর্দি-কালি, আর সামনে অনেক বই হাট করে খোলা। মুখে বইয়ের পাতা নিয়ে নির্দ্বিধায় চিবোচ্ছে, লালা ঝরছে চিবুক বেয়ে বেয়ে । মেয়েটা এক মুহূর্তের জন্য কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। তার কি বুড়োকে ডাকা উচিত? নাকি চোখে ভুল দেখছে? তার দ্রুত নিঃশ্বাস নেবার শব্দে বাচ্চা তিনটে কাগজ চিবানো বন্ধ করে দেয়, তারপর একযোগে ওর দিকে তাকায়।

বাচ্চাগুলোর চোখে তাকিয়ে মেয়েটা হঠাৎ আবিষ্কার করে, ওদের সবাইকে খুব ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে।
৬১টি মন্তব্য ৬১টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মতভেদ নিরসন ছাড়া মুসলিম আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৩



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা তাদের মত হবে না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা….

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬



আজ সকালে ল্যাপটপ খুলেই উপরের চিত্রটা দেখলাম। দেখে মনটা প্রথমে একটু খারাপই হয়ে গেল! প্রায় একুশ বছর ধরে লক্ষাধিক ব্লগারের নানারকমের বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমৃদ্ধ আমাদের সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু গল্প

লিখেছেন মোগল সম্রাট, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



(এক)
দশম শ্রেণির ছেলে সাদমান সারাদিন ফোনে ডুবে থাকত। বাবা-মা বকাঝকা করলে প্রায়ই অভিমান করে ভাত খেতো না। একদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ। ভোরে দরজা ভেঙে সবাই স্তব্ধ। খবরের কাগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প - ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫



আমার সাথে একজন সাবেক সচিবের পরিচয় হয়েছে।
উনি অবসরে গেছেন, ১০ বছর হয়ে গেছে। এখন উনি বেকার। কোনো কাজ নাই। বাসায় বাজার করেন অনেক বাজার ঘুরে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডিপস্টেট তাহলে সসস্র বিপ্লবের গোলা বারুদের সরবরাহকারী! জঙ্গি আসিফ’কে কেউ প্রশ্ন করেনি ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



বাংলাদেশে একটা ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট-এর বিরুদ্ধে যখন জুলাই-আগস্ট মাসে তথাকথিত “মুভমেন্ট” চলতেছিল, তখন এটাকে অনেকে খুব ইনোসেন্টভাবে “পিপলস আপরাইজিং” বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্নটা খুবই সিম্পল—এইটা কি আসলেই স্পনটেনিয়াস... ...বাকিটুকু পড়ুন

×