পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো দুম করে, ভীষণ ব্যস্ততার পরে একটু যে দম ফেলব সেই সময়টুকু পেলাম না। কি আর করা ফাইনাল পরীক্ষা বলে কথা, ধুমসে পড়ার আশায় চলে এলাম হলে।
ইউনিভার্সিটি হল মানেই বৈচিত্র্য, একটা না একটা অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। সবচেয়ে মজার অনুষ্ঠানের মধ্যে একটা হলো সরস্বতী পূজা। সরস্বতী বিদ্যার দেবী, তাই বিদ্যালয়গুলোয় খুব গুরুত্বের সাথে পূজা দেয়া হয় তাকে। সকালে ঘুমই ভাঙলো ভক্তিমূলক গানের সুরে। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমুল ঢাকের শব্দে আর উলুধ্বনিতে যখন মুখরিত চারদিক, পড়াশুনা শিকেয় তুলে ছুট লাগালাম। নিজের হলে একটা চককর মেরে চারপাশের আনন্দিত আর উৎসব মুখরিত মুখগুলোয় উৎসাহী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম জগন্নাথ হলের উদ্দেশ্যে।
জগন্নাথ হলের মন্ডপ- সম্ভবত পুরো ঢাকার মধেই সবচেয়ে আকর্ষনয়ীয় পূজা পন্ডপ, ইউনিভার্সিটির সব ডিপার্টমেন্টই আলাদা করে মন্ডপ সাজায়, পূজো দেয়। এত্ত বড় একটা হলের সম্পূর্ণটা জুড়ে এত এত মন্ডপ-- কে কার চে বেশি সুন্দর করে মন্ডপ সাজাতে আর নিজেরা সাজতে পারে তার যেন প্রতিযোগীতা চলে। বরাবরের মতই সবচেয়ে আকর্ষনীয় মন্ডপটি চারুকলার, হলের পুকুরটার মাঝে অসাধারণ করে তারা সাজিয়েছে সরস্বতী দেবীকে। সারা ঢাকা থেকে অসংখ্য মানুষের ঢল নামে পূজা দেখতে। প্রত্যেকেই যত্ন করে সেজে এসেছে পূজা উপলক্ষ্যে। আমার পরীক্ষার চাপে গুমোট হয়ে থাকা মনটা উৎসবের রঙে রঙীন হয়ে ওঠে। শাড়ি পড়া হলো না এবার, তাতে কি কপালে আবীর মাখতে ভুলিনি। নিজের ডিপার্টমেন্টের পূজা মন্ডপ থেকে টুকটুকে লাল রঙের আবীর আঙুলে মাখিয়ে লম্বা একটা টান দেই কপালের বড় লাল টিপটার ঠিক ওপরে।
সন্ধ্যা নামতে ফিরে আসি নিজের হলে। পূজা উপলক্ষ্যে কনসার্টের আয়োজন। এবারের শিল্পী সন্দীপন। সন্দীপনের গান আমার খুব পছন্দের, কিন্তু ভয় হচ্ছিলো কনসার্ট কি জমাতে পারবে? কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যেখানে বড় বড় ব্যান্ডস্টাররাও মার খেয়ে যান কখনো কখনো হলের ছাত্রীদের চাহিদার কাছে, সেখানে চট্টগ্রামের অপরিচিত কিছ ুআঞলিক গান গেয়ে কেবল অসাধারণ পারফরমেন্স দিয়ে সন্দীপন আসর মাতিয়ে তুললেন। দেশীয় গান, ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাজনায় মুগ্ধ হয়ে মেতে রইলাম আমরা সবাই। গানের ফাঁকে ফাঁকে সন্দীপণ যখন চিৎকার করে উঠছিলো, " সরস্বতী মা কি..." আমরা তাল দিচ্ছিলাম " জয়" !
বড্ড বেশি এগিয়া যাওয়া আধুনিকতা, আর একইসাথে ভীষণ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা গোঁড়ামি বুঝি এমন করেই প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যায় বুকের মধ্যে গেঁথে যাওয়া বাঙালিয়ানার কাছে। উৎসব এমনি করে, নতুন করে প্রতি বছর, প্রতি মুহুর্তে, প্রতি পর্বে আন্দোলিত করবে আমাদের, নতুন করে জন্ম দেবে আমাদের আজীবনের পুরনো বাঙালীয়ানার-- এটাই আজন্ম বিশ্বাস।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৯:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



