কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন আর কোটা সংস্কারের মধ্যে নেই সেটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে পুরো বিষয়টি এতটা খারাপ হওয়ার কোন কারন ছিলো না। শত শত বাচ্চা ছেলে-মেয়ের এই অকাল প্রয়াণ কোনভাবেই কাম্য ছিলো না। প্রশাসন ইচ্ছে করলেই এই হতাহতের ঘটনা এড়িয়ে যেতে পারত, প্রধানমন্ত্রীর এক কথাতেই সবকিছু ঠান্ডা হয়ে যেতে পারত। তা না করে দমন-নিপীড়ন আর গ্রেপ্তারের যে পথ সরকার বেছে নিয়েছে তা বুমেরাং হয়েই ফিরে এসেছে।
পুরো বিষয়টি নিয়েই আমি বেশ ব্যথিত, হতাশ এবং সেই সাথে ক্ষুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এতটা ন্যাক্কারজনক আর ঘৃণ্য কাজ আর কোন সরকারের মাধ্যমে/সময়ে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। আশির দশকের প্রথম দিকে আমাদের জন্ম, বড় হয়ে কোনদিনও সুষ্ঠু ভোট দেখিনি আর ভোটাধিকার প্রয়োগতো আরো দূরের বিষয়। মানুষ তারপরেও সবকিছু মেনে নিয়েছিলো কিন্তু গত একমাস ধরে যা ঘটেছে তা কোন সভ্য সমাজে ঘটা উচিত নয়। এর দায়ভার প্রশাসন কোনভাবেই এড়াতে পারে না।
শরীর ততটা ভালো যাচ্ছে না, পরিবারও বাসায় নেই, মোটামুটি ঘরে বসেই আমার সময় কাটছে। ঘুমাচ্ছি, খাচ্ছি, কাজ করছি কিন্তু কোনভাবেই মনের কোনে জমে থাকা এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যেতে পারছি না। অজস্র মানুষের মুখ ভেসে আসে যখন-তখন। এদের কেউই আমার রক্তের কেউ নন, তারপরেও তাদেরকে নিজের ছেলে-মেয়ের মতোই মনে হয়, আপন মনে হয়। তাদের রক্তপাত আমার চোখে বন্যা বইয়ে দিয়েছে বার বার। এগুলো অসহ্য রকম বেদনাদায়ক দৃশ্য। যারা স্ব-শরীরে উপস্থিত ছিলেন, দেখেছেন কিংবা তারা জানবেন আমি কি বলতে চাইছি।
দেশে এসেছিলাম কিছু বিশেষ কাজ নিয়ে, তার কিছুই হচ্ছে না, হয়ও নি। সবকিছু বেশ এলোমেলো লাগছে। খাবার খেতে প্রায়ই অনলাইনে অর্ডার করছি, যখন ইন্টারনেট ছিলো না তখন বাইরে গিয়ে হোটেলে খেতে হয়েছে। তখনই নিজ চোখে দেখেছি এদেশের বর্তমান তরুন প্রজন্মকে। হাতে লাঠি, মুখে রোমাল কিংবা পতাকা, তাদের গগণবিদারী স্লোগানের আওয়াজে হোটেলে খাবার ফেলে দৌড়ে বাইরে এসে দেখেছি কি হচ্ছে। টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড টলারেট করার বয়স আমাদের ততটা নেই। খেতে গিয়েও টিয়ার গ্যাসের কান্না নিয়ে ফিরতে হয়েছে। চিনি না, জানি না একটা বাচ্চা ছেলে এসে বললো "আঙ্কেল টুথপেস্ট লাগান মুখে"। আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভাবছি টুথপেস্ট কেন মাখবো মুখে? কে জানতো এই বাচ্চাগুলো আমার চেয়েও অভিজ্ঞ আন্দোলন নিয়ে। আকাশে তাকিয়ে যখন দেখলাম রেব এর হেলিকপ্টার থেকে ক্রমাগত টিয়ার শেল মারা হচ্ছে তখন না দৌড়ে ঐ ছেলে আমাকে টুথপেস্ট মাখিয়ে দিচ্ছিলো। যখন কিছুটা সম্বিত ফিরে পেলাম তার আগেই, ছেলেটা হাওয়া হয়ে গেছে হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে। ওদের মতো করে দৌড়ানো আমার পক্ষে এখন আর সম্ভব নয়। তবুও ক্যামেরা নিয়ে পা চালালাম যতটা দ্রুত সম্ভব।
আরেকটা শুকনো টাইপের ছেলে, যার কপালে, গলায় রাবার বুলেট লেগেছে সে সেসব ভুলে আমাকে জিজ্ঞেস করছে, "আঙ্কেল, আপনি ঠিক আছেন?" আমি ওর দিকে তাকালাম অনেকটা মনের অজান্তেই। মাথার উপর হেলিকপ্টার তখনও ফায়ার করেই যাচ্ছে, চারিদিক সাদা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ও কোত্থেকে যেন মাস্ক নিয়ে এসে বললো "আঙ্কেল, মাস্ক লাগান তাড়াতাড়ি"। আমার চোখ খুলে রাখা অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। ও-ই আমাকে কোথাও টেনে নিয়ে গেল নিরাপদ দূরত্বে। এসবই আমার অভিজ্ঞতা।
এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর যে অসীম সাহস আর দৃঢ়তা আমি দেখেছি, তার শতভাগের একভাগও আমার নেই। আমি বিশ্বাস করি, ওদের হাতেই বাংলাদেশ নিরাপদ। ওরাই বাংলাদেশের আগামী, এদের ঠেকিয়ে রাখারা সাধ্য কারো নেই। জয়তু তরুন ছাত্র জনতা। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




