somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আল-আন্দালুসঃ পাশ্চাত্য সভ্যতায় ইসলামের অবদানের অজানা কাহিনী

২৮ শে জুলাই, ২০১২ সকাল ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(আমার এই লেখাটি তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় খুবই তাড়াহুড়ো করে লেখা অনেকটা উত্তেজনার বশে। এই উত্তেজনার কারণ হলো করা তিনটি ডকুমেন্টারী মুসলমানদের ইউরোপের রাজত্বের উপর। যা দেখলাম তা আমার কাছে মনে হলো গুপ্তধন আবিষ্কারের মত। তাই তাড়াতাড়ি শেয়ার করার লোভটা সামলাতে পারলাম না। পরে হয়তো বিস্তারিত লিখবো এটার উপরে।)

এটা মনে হয় খুব একটা ভুল বলা হবে না যে আজকের পৃথিবীতে একজন মুসলমানের কথা বললেই একজন অমুসলিম কারো মনে প্রথমেই যে চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হলো দাঁড়ি গোঁফ সম্বলিত এক তীব্র গোঁড়া মানুষের চিত্র। যেই মানুষটির প্রাথমিক চিন্তা কিভাবে বোমা ফাটিয়ে কত লোকের মৃত্যু ঘটানো যেতে পারে। কিন্তু আজকের এই চরম নেগেটিভ ইমেজের শিকার মুসলমানরাই যে পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎকর্ষতার পিছনে রয়েছে সেটা কতজন অমুসলিম জানে? কতজন মুসলমানই বা জানে?

গ্রীক আর রোমান সভ্যতার পতন যখন ঘটলো পঞ্চম শতাব্দীতে, তারপর পাশ্চাত্যে বা ইউরোপে এক ধরনের অন্ধকার রাজত্ব বিরাজ করছিলো যাকে বলা হয় ডার্ক এজ। তখন সেখানে ছিল বার্বেরিয়ানদের রাজত্ব। ইউরোপকে এই অন্ধকার যুগ থেকে আলোর পথে কারা নিয়ে এসেছিলো? এই ইতিহাস আধুনিক পাশ্চাত্যের ইতিহাস শিক্ষায় অনেক দিন ধরে লুকিয়ে অথবা সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন তা বেড়িয়ে আসছে আস্তে আস্তে। ইউরোপ বা পাশ্চাত্য সভ্যতা উত্থানের পিছনে রয়েছে আল-আন্দালুসের মুসলিমরা।

ইসলামের যখন গোড়া পত্তন ঘটলো আরব দেশে ষষ্ঠ শতাব্দীতে, তারপর থেকে মুসলমানরা ছড়িয়ে পড়লো এবং তারা প্রথমে উত্তর আফ্রিকায় অভিযান চালিয়ে চালিয়ে স্পেনের কাছে চলে আসলো। স্পেনে তখন বার্বেরিয়ান ভিজিগোথদের রাজত্ব। মুসলমানরা স্পেন এর একটা বিশাল অংশ দখল করে নিল এবং সেটার নামকরণ হলো আল-আন্দালুস বা বর্বরদের দেশ। সেটা ৭১১ সালে।

এই মুসলিমরা জ্ঞান বিজ্ঞানের, শিল্প সাহিত্যের অনুরাগী ছিল। আর ইসলাম ধর্ম হিসেবে জ্ঞান আহরণকে সবসময় উৎসাহ দিয়ে এসেছে। তখনকার যুগের জ্ঞান বিজ্ঞান মূলত গ্রীক আর রোমান সভ্যতা লদ্ধ জ্ঞান। মুসলিমরা এই জ্ঞান খুব দ্রুত করায়ত্ত করে ফেললো। অন্যদিকে সেই যুগের খ্রীষ্টানরা গ্রীক আর রোমান সভ্যতা বর্জন করে চলতো কারণ তাদের ধর্ম গ্রীক দেব-দেবীকে সমর্থন করতো না। তাই আমরা অষ্টম শতাব্দীতে দেখি আমরা আধুনিক মুসলিম আর গোঁড়া খ্রীষ্টানকে। ফলাফল যা হবার তাই, আজকের পুরো উলটো। মুসলিমরা জ্ঞান বিজ্ঞান, শৌর্যে-বীর্যে এগিয়ে গেল আর খ্রীষ্টানরা পড়ে রইলো অন্ধকার যুগে।

গ্রীক-রোমান সভ্যতা লদ্ধ জ্ঞান কৃষিকাজ, সেচকাজ, আস্ট্রোনমি, আস্ট্রোলজি ইত্যাদিতে কাজে লাগিয়ে আল-আন্দালুসের মুসলিমরা একেবারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা শুরু করলো। যার ফলে কৃষিতে বাম্পার ফলন ঘটতো। প্রচুর খাদ্যের সম্ভার থাকায় অন্যান্য দিকেও সমৃদ্ধি ঘটতে লাগলো। তাই দেখা যেতো স্পেনের কর্ডোবাতে যখন স্ট্রীট ল্যাম্প ছিলো, সুরম্য অট্টালিকা এবং রানিং ওয়াটার ছিলো তখন লন্ডন, প্যারিস এই সব শহরগুলোতে লোকজন বলতে গেলে কুড়েঁ ঘরে বাস করছে।

স্পেনের কর্ডোবা, টলেডো, গ্রেনাডা এই শহরগুলো ছিলো এক একটি জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার। এখানে মুসলিম শাসকের রাজত্বে মুসলমান, ইহুদী আর খ্রীষ্টান স্কলাররা একসাথে হয়ে কাজ করতো। তাদের সবচেয়ে বড় অবদান যেটি সেটি হলো গ্রীক এবং রোমান যত জ্ঞানের আধার সেগুলো তারা ট্রান্সলেট করে নিয়ে আসছিল আরবী এবং অন্যান্য ইউরোপীয়ান ভাষায়। তারপর ব্রিটিশ পন্ডিত মাইকেল স্কট যখন স্পেনে আসলো তিনি এইগুলো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে দিলেন। এই জ্ঞান-ভান্ডার পরে ইউরোপের রেঁনেসা জাগাতে সাহায্য করে যেটি ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে আসতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।

তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আজকে পশ্চিমা বিশ্বের যে দাপট তার পিছনে ইউরোপের মুসলমানদের অবদান অনেক। এ থেকে আজকের মুসলিমদের শিক্ষণীয় হচ্ছে বোমা, অস্ত্র শস্ত্র, ভায়োলেন্স দিয়ে নিজেদের অধিকার বা আধিপত্য সবসময় বিস্তার করা যায় না। পাশ্চাত্য সভ্যতা আজকে পৃথিবী শাসন করছে কারণ জ্ঞান বিজ্ঞানের আধার এখন পশ্চিম মুখী। ভারত, চীন ধীরে ধীরে উঠে আসছে এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়েই। তাই এই থেকে পৃথিবীর অতি রক্ষণশীল এবং জংগী মুসলিমদের শিক্ষা হলো যে পাশ্চাত্যের সবকিছুর প্রতি ঘৃণার প্রকাশ না ঘটিয়ে, আল-কায়েদা, হিজবুল তাহিরি বা লস্কর-ই-তৈয়িবার ট্রেনিং ক্যাম্প ছেড়ে দলে দলে স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে যাত্রা করুন। আপনি যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেন, সারা পৃথিবী আপনার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিবে। সে আপনি মুসলিম, খ্রীষ্টান, হিন্দু, ইহুদী যাই হোন না কেন। সাতশ থেকে চোদ্দশ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপে মুসলিম রাজত্বের মূর্ত প্রতীক আল-আন্দালুসের অস্তিত্ব থেকে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই হতে পারে।
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×