somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি ‘রানওয়ে’ এবং একজন ‘তারেক মাসুদ’

২৮ শে জুলাই, ২০১৩ রাত ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রুহুল, অর্থাভাবে দাখিল পরীক্ষা দিতে না পারা এক হতভাগা বেকার কিশোর। মা-বাবা, বোন, ও বুড়ো দাদাকে নিয়ে রুহুলদের সংসার। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে একরকম বিরক্ত হয়েই বসতভিটা বিক্রি করে বিদেশ যায় রুহুলের বাবা। রুহুলদের আশ্রয় হয় ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছাকাছি এক খুপড়িঘরে। যেখানে প্রতিটি বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সাথে সাথে রুহুলদের ঘরে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

রুহুলের বোন গার্মেন্টসে কাজ করে। মা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে দুটি দুধেল গরু কিনে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। রুহুল অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোন কাজ জুটাতে পারে না। ছোটবোন গার্মেন্টস এ কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ চালায় অথচ সে বড় ভাই হয়ে বসে বসে বেকার খাচ্ছে। বিষয়টা তাকে খুব পীড়া দেয়। এ নিয়ে মাঝে মাঝে তাকে দু’একটু টিকা টিপ্পনীও শুনতে হয়।অবশেষে বাধ্য হয়ে দুঃসম্পর্কের এক মামার কম্পিটারের দোকানে কম্পিউটারে টাইপিং ও ইন্টারনেটের কাজ শিখতে শুরু করে।

আলিয়া মাদ্রাসায় পড়া রুহুলের মন খুবই সরল। অন্যায়ের প্রতিবাদ সে সবসময়ই করার চেষ্টা করে। আলীয়া মাদ্রাসায় পড়লেও ধর্মীয় গোড়ামী থেকে সে অনেকটা মুক্ত। তবে তার ধর্মের প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস আছে। যতটুকু সম্ভব ধর্মীয় বিধান পালন করার চেষ্টা সে করে।এভাবেই কষ্টে দিনাতিপাত করতেছিল রুহুল ও তার পরিবার।

কম্পিউটারে কাজ শিখতে গিয়ে রুহুলের সাথে পরিচয় হয় আরিফের। আরিফও রুহুলের মামার দোকানে কম্পিউটারের কাজ শিখে। আরিফ ইন্টারনেটের কাজে রুহুলের চেয়ে এক্সপার্ট। রুহুলের সমস্যা সমাধান করতে গিয়েই দুজনের কথা, পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। নেটে নানা ইসলামিক বিষয়াদির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় মৃদুভাষী রুহুল। একসময় তারা খুব অন্তরঙ্গ হয়। আরিফ একটি গোপন ইসলামিক সংঘের সাথে জড়িত। রুহুলকে প্রকৃত ইসলামের পথ দেখানোর কথা বলে আরিফ তাকে তার লিডারদের কাছে নিয়ে যায়। গেলে দেখা যায়, আরিফ জঙ্গীগ্রুপের সাথে জড়িত। রুহুলকেও একইপথের সাথী করে নেয়।

আস্তে আস্তে রুহুলের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সে পরিবারে এসে ধর্মের বিধিবিধান নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করে। শুরু হয় তার সাথে তার মা-বোন ও পরিবারের সাথে দ্বন্দ্ব। সে ঘর ছাড়ে। আরিফ ও জঙ্গীগ্রুপের সাথে দূরবর্তী স্থানে জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিতে যায়। পরিবার-পরিজন, ঘর-সংসার ছেড়ে সে এক অজানা ভয়ংকর পথে পা বাড়ায়। একে একে আরিফ ও জঙ্গী গ্রুপ দেশের সিনেমা হল, আদালত প্রাঙ্গন ও বিভিন্ন স্থানে বোমাহামলা ও আত্মঘাতী হামলা চালাতে থাকে। আত্মঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে আরিফ মারাত্বকভাবে আহত হয়ে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। যে খবর দেখে প্রায় মুষড়ে পড়ে রুহুল। সাথে সাথে তাদের গ্রুপের বিলুপ্তি ঘটে। যে যার মতো পালিয়ে যায়। রুহুল ফিরে আসে তার বাড়িতে। সে বুঝতে পারে সে সঠিক পথে ছিল না। সে অনুতপ্ত হয়। নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে বিভোর হয় সে।

হ্যাঁ বলছিলাম তারেক মাসুদের সর্বশেষ ছবি রানওয়ের কাহিনী।ছবিটির কাহিনীর সাথে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনীরও কিছুটা মিল আছ। আমিও হতে পারতাম রুহুলের মতো! সে গল্প আরেকদিন। একটি সাধারণ ছেলে কিভাবে জঙ্গীগ্রুপের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে সেটা এবং সেটার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই তারেক মাসুদ নির্মান করেছিলেন ছবিটি। যেমনটি করেছিলেন মাটির ময়না ছবিটিতেও। আমরা অনেকেই ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় গোড়ামী সম্পর্কে লেখালিখি করি। কিন্তু সেটা ম্যাস পিপলের কাছে খুব একটা পৌছায় না। সেক্ষেত্রে চলচিত্র ম্যাস পিপলের কাছে পৌছানোর এক অন্যতম সুন্দর এবং সঠিক মাধ্যম। তারেক মাসুদ সেই মাধ্যমটিই বেছে নিয়েছিলেন নিঃশঙ্কচিত্তে।

তবে তারেক মাসুদের স্বপ্ন পুরোপুরি সার্থক হয় নি। মাটির ময়না ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরপরই দেশজুরে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফলে ছবিটি তিনি গ্রামগঞ্জে ঢালাওভাবে প্রচার করতে পারেননি। তবে রানওয়ে ছবিটি করার সময় তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন যে, ছবিটি যেভাবেই হোক সারাদেশে প্রচারের ব্যবস্থা তিনি করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতার বলী হয়ে তিনিই আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন।

ছবিটি যে সময়ের প্রেক্ষাপটে তৈরী সে সময়ের কথা চিন্তা করুন। সিনেমা হলগুলোতে বোমাহামলা, সারাদেশে একযোগে বোমাহামলা, আদালতে-বিচারকদের ওপরে বোমা হামলা, ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলা, রমনায় বোমা হামলা, কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনাকে মারতে বোমাস্থাপনসহ বাংলাভাই, জ়েএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠীর উথান। ভাবা যায়!

যে সিনেমার ওপর ভিত্তি করে সিনেমা হলগুলোতে হামলা করা হল, সে সিনেমাগুলো কাদের অধীনে মুক্তি পেয়েছিল? স্মরণ করে দেখুন, বাংলাদেশের ইতিহাসের স্মরণকালের সেরা অশ্লীল ছি!নেমাগুলি তৈরী হয়েছে ২০০১-০৬ শাসনামলে। আবার তারাই জঙ্গীগোষ্টীকে মদদ দিয়েছে বোমা হামলা চালানোর। আজ আবার তারাই সেজেছে ধর্মের সোল এজেন্ট!

যাইহোক, ক্ষমতাসীন দলের উচিত ছিল, তারেক মাসুদ মারা যাবার পরপরই এসব ছবিগুলোকে হাইলাইট করা। ঢালাওভাবে দেশজুরে প্রচারের ব্যবস্থা করা। সরকারের থিঙ্ক-ট্যাংকরা কিভাবে কি ভাবেন, চিন্তা করেন তা তারাই ভালো জানেন। আশা করছি আপনারা সবাই ছবিটি দেখবেন এনং অন্যদের মাঝে ছবিটি ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হবেন। ধর্মান্ধতা নিপাত যাক, মানবতা মুক্তি পাক!


১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওয়ান-ইলেভেন: স্মৃতিহীন জাতির হঠাৎ জাগরণ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:৩০

কাভার- সরাসরি আপলোড না হওয়াতে!!


ওয়ান-ইলেভেন: স্মৃতিহীন জাতির হঠাৎ জাগরণ!

জেনারেল মাসুদের গ্রেপ্তার হতেই হঠাৎ দেখি-
সবাই একসাথে ওয়ান-ইলেভেন-কে ধুয়ে দিচ্ছে!

মনে হচ্ছে, এই জাতির কোনো অতীতই নেই।
বাঙালির স্মৃতিশক্তি আসলেই কচুপাতার পানির মতো-এক ঝাপটায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪


অপারেশন সার্চলাইট (২৫ মার্চ): ১৯৭১-পাকিস্তানের বাঙালি গণহত্যা
অপারেশন সার্চলাইট ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত একটি গণহত্যা। বঙ্গবন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৬

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০



ইদ শেষ। লোকজন ঢাকা ফিরতে শুরু করেছে!
আজ বুধবার, ১১ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বসন্তকাল)। ইংরেজি তারিখ ২৫শে মার্চ, ২০২৬। সব কিছু যেন দ্রুত'ই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্প কি ভেবেছিল? "সর্দার খুশ হোগা? সাবাশি দেগা?"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৫৮

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কিছু বলি।
আমি সাধারণ সত্য যা ঘটছে সেটাই বলি। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, সেটা যে পক্ষেরই হোক, আমার শেয়ার করতে ভাল্লাগে না।
একটা সময়ে আমেরিকা নিজের এয়ারফোর্স এবং নেভি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:০৪



সূরাঃ ১ ফাতিহা, ১ নং থেকে ২ নং আয়াতের অনুবাদ-
১। সমস্ত প্রশংসা জগৎ সমূহের প্রতি পালক আল্লাহর।
২। যিনি অনন্ত দয়াময়, অন্তহীন মেহেরবান।

সূরাঃ ১ ফাতিহা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×