একটা স্নিগ্ধ সন্ধ্যার গল্প
তৃতীয় পর্ব: অদৃশ্য দেয়াল
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ছোট্ট নদীর পাড়ে বাতাসে কাশফুল দুলছে। দূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। সেই সুরের সঙ্গে কোথাও যেন মিশে আছে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি।
অনিরুদ্ধ বেঞ্চে বসে আছে। হাতে একটি বই, কিন্তু চোখ বইয়ের পাতায় নেই। বারবার সে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।
আজ মনমিতা আসবে বলেছিল।
কিছুক্ষণ পর নীল রঙের ওড়না উড়িয়ে সে এসে দাঁড়াল।
"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?"
হেসে বলল, "যার জন্য অপেক্ষা করা যায়, তার জন্য সময় কখনো দীর্ঘ হয় না।"
মনমিতা মুচকি হেসে পাশে বসল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ।
নীরবতারও একটা ভাষা থাকে।
মনমিতা ধীরে বলল,
"জানো, বাসায় আমাদের নিয়ে কথা উঠেছে।"
অনিরুদ্ধ চমকে তাকাল।
"কী কথা?"
"বাবা চান, পড়াশোনা শেষ হলেই আমার বিয়ে হয়ে যাক।"
অনিরুদ্ধের বুকটা কেঁপে উঠল।
"তুমি কী বলেছ?"
"বলেছি, এখনই বিয়ে করব না।"
"তারপর?"
"তারপর বাবা শুধু একটা কথাই বললেন—'নিজের ধর্ম, নিজের সমাজের বাইরে কোনো স্বপ্ন দেখো না।'"
চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
অনিরুদ্ধ ধীরে বলল,
"আমাদের বাড়িতেও একই কথা। মা বলে, ধর্ম আলাদা হলে মানুষ সুখী হতে পারে না।"
মনমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমরা কি এতটাই আলাদা?"
অনিরুদ্ধ উত্তর দিতে পারল না।
সে শুধু আকাশের দিকে তাকাল।
একই আকাশ।
একই চাঁদ।
একই বাতাস।
তবু মানুষ নিজেদের মধ্যে কত অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে!
হঠাৎ মনমিতা ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট ডায়েরি বের করল।
"এটা তোমার জন্য।"
"কী আছে এতে?"
"আমার লেখা কিছু কবিতা। যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, এগুলো পড়ে আমাকে মনে করবে।"
অনিরুদ্ধ ডায়েরিটি হাতে নিয়ে বলল,
"তুমি হারাবে কেন?"
মনমিতা মৃদু হেসে বলল,
"সব মানুষ ইচ্ছে করলেই নিজের ভাগ্য লিখতে পারে না।"
সেদিন বিদায় নেওয়ার সময় দুজনের কারও মুখে আর কোনো কথা ছিল না।
শুধু চোখ দুটো অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল।
সেদিন রাতেই মনমিতার বাবা তাকে শহরের এক নামকরা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে মনমিতা অকারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। মাঝেমধ্যে জ্বর, মাথা ঘোরা আর শরীরে অদ্ভুত ব্যথা হচ্ছিল।
বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক রিপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
"আরও কিছু পরীক্ষা করতে হবে... তবে রিপোর্ট খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।"
মনমিতার বাবা-মায়ের মুখের রং মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আর মনমিতা?
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
দূরে অস্ত যাওয়া সূর্যের শেষ আলোটুকু তখন নিভে যাচ্ছিল।
তার অজান্তেই যেন জীবনের আকাশেও এক টুকরো অন্ধকার নেমে আসছিল...
চলবে…
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



