somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেখ হাসিনা: সাফল্য, ব্যর্থতা ও এক কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেখ হাসিনা: সাফল্য, ব্যর্থতা ও এক কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এমন এক নাম, যাকে শুধু সমর্থন কিংবা বিরোধিতার সরল সমীকরণে মূল্যায়ন করা কঠিন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে যেমন দৃশ্যমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি তাঁর শাসনামলকে ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক, সমালোচনা এবং কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্নও।
আমি শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করি। তার নগন্য কর্মী হিসাবে, আমার এই সমর্থনের অন্যতম কারণ হলো তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের পথে এগিয়েছে, তার অনেক কিছুই দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত এক দশকে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎপ্রাপ্তির বিস্তার, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির কথা উঠে এসেছে।
তবে সমর্থন মানেই অন্ধ আনুগত্য নয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমন সাফল্য আছে, তেমনি আছে ব্যর্থতা। আছে এমন সিদ্ধান্ত, যেগুলো তাঁর সমর্থকেরা সঠিক মনে করেন; আবার এমন সিদ্ধান্তও আছে, যেগুলো নিয়ে বিরোধীরা কঠোর সমালোচনা করেছেন। একজন রাজনৈতিক নেতাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে তাঁর অর্জনের পাশাপাশি ভুল-ত্রুটিরও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বুঝতে হলে তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথাও অনিবার্যভাবে আসে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় নেতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা-নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের একটি দীর্ঘ ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধ্যায় তৈরি করেছেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে।
সেই সময় দেশের রাজপথে যখন ব্যাপক আন্দোলন, সংঘাত ও প্রাণহানি ঘটছিল, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ওই সময়কার সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল এবং স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি প্রশ্ন আজও আলোচনার দাবি রাখে সেদিন যদি ক্ষমতাসীন দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে ঢাকার রাজপথে নামানো হতো, তাহলে পরিস্থিতি কি আরও রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠত?
এখানে ইতিহাসের একটি দিক অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক শক্তির হাতে জনসমাগম ঘটানোর সক্ষমতা থাকলেই সেই শক্তিকে তা ব্যবহার করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংঘাত যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য কখনো কখনো শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, মানবিকভাবেও হিসাব করতে হয়।
আমার দৃষ্টিতে, শেখ হাসিনার সমর্থক হিসেবে তাঁর সেই সময়কার একটি সিদ্ধান্তকে এভাবেও দেখা যায় তিনি চাইলে ব্যাপক জনসমাগমের মাধ্যমে রাজপথের শক্তির পরীক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু তা করলে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি সেই পথ বেছে নেননি। এটি তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ছিল কি না, পরিস্থিতির বাস্তব মূল্যায়ন ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করেছিল তার বিচার ইতিহাসই করবে।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সহিংসতা বা প্রাণহানিকে স্বাভাবিক কিংবা অনিবার্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষের জীবন ও অধিকার রক্ষা করা। অতীতের যেকোনো সরকারের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতার বিচার করতে হলে একই নীতি সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কে ক্ষমতায় ছিলেন, কোন দল ক্ষমতায় ছিল তার ভিত্তিতে মানুষের জীবনের মূল্য আলাদা হতে পারে না।
তাই আজ যখন শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের প্রাণহানির জন্য নানা অভিযোগের মুখোমুখি করা হচ্ছে, তখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত ।অভিযোগগুলোর সত্যতা কী, কার কী ভূমিকা ছিল এবং সেই ভূমিকার নিরপেক্ষ প্রমাণ কী? একই সঙ্গে অতীতের অন্যান্য রাজনৈতিক সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা উচিত।
রাজনীতি যদি প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে যায়, তাহলে কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না। কিন্তু রাজনীতি যদি ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যম হয়, তাহলে সাফল্যের স্বীকৃতি যেমন থাকবে, তেমনি ভুলের জবাবদিহিও থাকবে।

শেখ হাসিনাকে যারা ভালোবাসেন, তাদের উচিত তাঁর উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অবদানের কথা তুলে ধরা। আবার তাঁর সমালোচকদেরও উচিত অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ, তথ্য ও ন্যায়বিচারের নীতিকে সামনে রাখা।
কারণ একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন কেবল আবেগ দিয়ে হয় না; হয় ইতিহাস, তথ্য, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং সময়ের পরীক্ষায়।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাস এখনই দেবে না। ইতিহাসের বিচার অনেক দীর্ঘ। আজকের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়তো একদিন ইতিহাসের উপকরণ হয়ে যাবে।
আর সেই ইতিহাসে যদি শেখ হাসিনার মূল্যায়ন হয়, তাহলে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা, উন্নয়নের পাশাপাশি বিতর্ক, নেতৃত্বের পাশাপাশি ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছুকেই একই সঙ্গে দেখতে হবে।
এটাই হয়তো একজন রাজনৈতিক নেতাকে ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়নের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পথ।

সালাউদ্দিন রাব্বী
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ কৃষক লীগ, মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখা
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাস্ততম শহরে এক ছুটির দিন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১২

নিউ ইয়র্ক দুনিয়ার অন্যতম ব্যাস্ততম শহর। বলা হয় The City that never sleeps! এরই মাঝে এবার মিলে গেলো এক ছুটির দিনে পিকনিকে যাওয়ার সুযোগ। শহরের সীমানা ছেড়ে প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১৭



সিরাজ ভাই বললেন, টেংরা মাছের ডিম আপনার কাছে কেমন লাগে?
আমি বললাম, ভালোই লাগে। শুধু রুই মাছের ডিম আমার ভালো লাগে না। সিরাজ ভাই বললেন, রুই মাছের ডিম সঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর বক্তব্য। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


জিন্নাহর সেই ভাষণ
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জিন্নাহর একটি বক্তব্য যাতে দাবী করা হচ্ছে তিনি নাকি আমাদের ওপর উর্দু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এতকাল “প্রচার”... ...বাকিটুকু পড়ুন

গালিব সাহেব, মিথ্যারও তো একটু সামাজিক মর্যাদা আছে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩



মির্জা গালিব বলেছেন -
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে, যেটা আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালা।”

গালিব সাহেব, আপনার কথায় যুক্তি আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাউঞ্জ এন্ড ফুড রিভিউ; দ্যা সেন্স

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪২


নিয়মিত-অনিয়মিত গত এক যুগ ধরে ভ্রমণ করছি এবং প্রায়োরিটি পাস দিয়ে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ ব্যবহার করছি প্রায় ৪ বছর ধরে। দীর্ঘ ফ্লাইট, লং ট্রানজিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে ফ্রিতে দৃষ্টিনন্দন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×