বিদায়ের অশ্রু, বিমানবন্দরের হয়রানি এবং একজন নাগরিকের প্রশ্ন।
---------------------------------------------------------------------------
কখনো কখনো একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত থাকে না। একজন মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বৃহত্তর কোনো ব্যবস্থার দিকে আঙুল তোলে, প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রের কাছে, প্রশ্ন তোলে নাগরিকসেবা ও জবাবদিহি নিয়ে।
ঢাকার বিমানবন্দরে আমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তেমনই একটি ঘটনা।
আমি বহুবার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছি ব্যবসা, কাজ ও ভ্রমণের প্রয়োজনে। পৃথিবীর ৪৬টি দেশ ঘুরেছি। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই বিদেশযাত্রা আমার কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এবারের যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এবার আমি স্বাভাবিক ভ্রমণে দেশ ছাড়িনি; নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
আমার বিরুদ্ধে করা একটি মামলা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত থেকে নিষ্পত্তি হয়। সেই মামলা মোকাবিলায় সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়েছে। মামলা শেষ হওয়ার পরও হুমকি ও চাপের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু দেশ ছাড়ার সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল অন্য জায়গায়।
আমি জানতাম না আবার কবে ফিরব আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে।
জানতাম না সন্তানদের কবে দেখব।
জানতাম না স্বজনদের সঙ্গে আবার কবে বসব।
আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল বৃদ্ধ বাবাকে ছেড়ে আসতে।
বিদেশে থাকার সময় মাকে শেষ বারের মতো দেখতে পারিনি। সেই আক্ষেপ আজও আমার মধ্যে আছে। এবার শত বছর ছুই ছুই বাবাকে ছেড়ে আসার সময় মনে হয়েছে হয়তো বাবাকেও আর দেখতে পারব না।
প্রিয়তমার চোখের জল তখন আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। নিজেকে সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
একজন মানুষের দেশ ছাড়ার মুহূর্ত যদি এমনিতেই কান্না, ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভারী হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমানবন্দরের দায়িত্ব হওয়া উচিত সেই মানুষটির যাত্রাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ও মানবিক রাখা।
কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ছিল উল্টো।
ব্যাগ বুকিংয়ের পর শুরু হলো নতুন ভোগান্তি
নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে নিয়ম অনুযায়ী ব্যাগ বুকিং দিলাম। সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে ভেবেই এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর আবার আমাকে ডাকা হলো।
ব্যাগ খুলে পরীক্ষা করা হবে।
আমি সহযোগিতা করলাম। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। নিরাপত্তার প্রয়োজনে যাত্রী ও তার মালামাল পরীক্ষা করা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
কিন্তু এরপর প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
কী নিয়ে যাচ্ছি?
এত জামাকাপড় কেন?
কোথা থেকে কিনেছি?
ইনভয়েস কোথায়? আমি জানি টাকার জন্যই ওদের এমন আচরন।
এরপর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলেন। জিজ্ঞাসাবাদ চলল। প্রায় এক ঘণ্টা পর আমাকে যেতে দেওয়া হলো। আমি কোন টাকা দিতে রাজি হইনি।
এখানে মূল প্রশ্নটি নিরাপত্তা তল্লাশি নিয়ে নয়।
মূল প্রশ্ন হলো এই প্রক্রিয়াটি কতটা প্রয়োজনীয়, কতটা নিয়মসম্মত এবং কতটা যাত্রীবান্ধব ছিল?
একজন নাগরিককে প্রশ্ন করার অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের থাকতে পারে। কিন্তু সেই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বও থাকে যাত্রীকে সম্মান দেওয়া, প্রয়োজনীয় কারণ জানানো এবং অযথা সময় ও মানসিক চাপ না দেওয়া।
যদি আমার ক্ষেত্রে সবকিছু নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে সেই নিয়ম কী জনগণ তা জানুক।
আর যদি নিয়মের বাইরে কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তার তদন্ত হোক।
বিমানবন্দর একটি দেশের দরজা
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়। এটি একটি দেশের সঙ্গে মানুষের প্রথম ও শেষ যোগাযোগের অন্যতম প্রধান জায়গা।
বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে প্রথম যে রাষ্ট্রীয় পরিবেশ দেখেন, তার একটি অংশ বিমানবন্দর।
একজন প্রবাসী বছরের পর বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে যে অভিজ্ঞতা পান, তারও একটি বড় অংশ বিমানবন্দরকেন্দ্রিক।
আর একজন বাংলাদেশি যখন দেশ ছাড়েন, বিমানবন্দরই তার দেশের সঙ্গে শেষ রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ গুলোর একটি।
সুতরাং বিমানবন্দরের আচরণ ব্যক্তিগত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর আচরণমাত্র নয়; সেটি অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় সেবার সংস্কৃতির প্রতিফলন।
এ কারণেই বিমানবন্দরে নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিকতা, নিয়মের পাশাপাশি স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহি প্রয়োজন।
৪৬টি দেশের অভিজ্ঞতা থেকে যে প্রশ্নটি আসে
আমি পৃথিবীর ৪৬টি দেশ ভ্রমণ করেছি। বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশন ও বিমানবন্দর দেখেছি।
কোথাও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এমন নয়। বরং অনেক দেশেই অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমার ভ্রমণ-অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় স্পষ্ট কঠোর নিরাপত্তা এবং মানবিক আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।
একজন যাত্রীকে প্রশ্ন করা যায়, আবার তাকে সম্মানও করা যায়।
তার ব্যাগ পরীক্ষা করা যায়, আবার তাকে অযথা আতঙ্কিত না করেও পরীক্ষা করা যায়।
নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়, আবার নাগরিকের মর্যাদাও বজায় রাখা যায়।
তাহলে আমাদের বিমানবন্দরে কেন বারবার যাত্রী হয়রানির অভিযোগ উঠবে? বার বার ঘুষ নেওয়ার কথা উঠছে? ব্যাগ কেটে মালামাল চুরির কথা উঠবে?
কেন একজন মানুষ বিমান ধরার আগে উদ্বিগ্ন থাকবেন তার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে?
এই প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত ক্ষোভ হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখা প্রয়োজন।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশের মাটিতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে যারা দেশে অর্থ পাঠান, তারা শুধু নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করেন না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও অবদান রাখেন।
আমরা তাদের সম্মানের সঙ্গে বলি রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
কিন্তু একজন প্রবাসী যখন নিজের দেশে আসেন বা দেশ থেকে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান, তখন তার প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
তিনি বিশেষ সুবিধা চাইবেন না।
তিনি আইন ও নিরাপত্তার বাইরে কোনো ছাড়ও চাইবেন না।
তিনি শুধু চাইবেন সম্মানজনক আচরণ।
দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী একজন মানুষ যদি বিমানবন্দরে এসে অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন, তাহলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কারণ প্রবাসীকে শুধু রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি একজন নাগরিক, একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন পরিবারের সদস্য এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা একজন ব্যক্তি।
অভিযোগের সংস্কৃতি নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি চাই
বিমানবন্দর নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ লিখছেন, সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, যাত্রীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন।
প্রশ্ন হলো এরপর কী?
শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই হবে না।
প্রতিটি গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন
স্বচ্ছ তদন্ত।
দায়িত্ব নির্ধারণ।
প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
যাত্রীকে অভিযোগের অগ্রগতি জানানো।
এবং সর্বোপরি এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একই ধরনের অভিযোগ বারবার না আসে।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতায় নয়; নাগরিকের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ করে, তার মধ্যেও রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায়।
আমার প্রশ্নটি তাই ব্যক্তিগত নয়
আমার সঙ্গে বিমানবন্দরে কী ঘটেছে, সেটি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে যাচাই করতে পারে।
আমার বক্তব্যের প্রতিটি অংশ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
একজন নাগরিকের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কি তার পাশে দাঁড়াবে, নাকি তার অসহায়ত্বকে আরও বাড়িয়ে দেবে?
আমি যখন বিমানবন্দরে ছিলাম, তখন আমার চোখের সামনে ছিল প্রিয়তমার অশ্রুসিক্ত মুখ, সন্তানদের মুখ, স্বজনদের মুখ এবং বৃদ্ধ বাবার মুখ।
আমি জানতাম না আবার কবে তাদের কাছে ফিরব।
এই মানসিক অবস্থার মধ্যেই যখন দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হলো, তখন বিমানবন্দরের সেই অভিজ্ঞতা আমার বিদায়ের কষ্টকে আরও গভীর করে দিয়েছে।
বিমানে ওঠার সময় শরীরের শক্তি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত ছিল মন।
শেষ কথা
রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবি বিশেষ কিছু নয়।
আমি চাই না নিরাপত্তা কমানো হোক।
আমি চাই না আইন প্রয়োগ বন্ধ হোক।
আমি চাই না দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তাদের কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকুন।
আমি শুধু চাই।
নিরাপত্তা হোক নিয়মের ভিত্তিতে।
তল্লাশি হোক স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়।
জিজ্ঞাসাবাদ হোক প্রয়োজনের সীমার মধ্যে।
যাত্রীর সঙ্গে আচরণ হোক মানবিক।
প্রবাসী ও রেমিট্যান্স যোদ্ধারা পান প্রাপ্য সম্মান।
অভিযোগের ক্ষেত্রে থাকুক কার্যকর জবাবদিহি।
একজন মানুষ যখন নিজের দেশ ছাড়ে, তখন তার সঙ্গে শুধু একটি লাগেজ থাকে না থাকে অসংখ্য স্মৃতি, সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা।
আমার ক্ষেত্রেও ছিল তাই।
কিন্তু সেই বিদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা, প্রিয়তমার চোখের জল, বাবাকে আর দেখতে পারব কি না এই আশঙ্কা এবং বিমানবন্দরের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতা।
তাই আজ দূরদেশ থেকে আমার প্রশ্ন।
ঢাকা বিমানবন্দর কি শুধু নিরাপত্তার জায়গা হবে, নাকি মানবিকতারও জায়গা হবে? রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কি শুধু দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়, নাকি তারা সম্মান পাওয়ার মতো নাগরিকও?
আর একজন নাগরিক যখন চোখের জল নিয়ে দেশ ছাড়ে, রাষ্ট্র কি অন্তত তার শেষ মুহূর্তটুকু সহজ করে দিতে পারে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো একজন যাত্রীর জন্য নয়।
এগুলো একটি দেশের নাগরিকসেবা, জবাবদিহি ও মানবিক রাষ্ট্রচর্চার প্রশ্ন।
সালাউদ্দিন রাব্বী
সংখ্যালঘু বাচাও আন্দোলন
বাংলাদেশ।
২২ অক্টো-২০২৬, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


