
"দুর্বৃত্তের"(!) লাথিতে সাত মাসের সন্তান মাতৃগর্ভ থেকে মৃত হয়ে বেরিয়ে আসছে। সাথে মাতৃত্বের ক্ষমতা হারালেন মা তুলসী রানী। সারা পৃথিবী হাত জোড় করে কয়েক হাজারবার ক্ষমা চাইলে এমন অপরাধের জন্য যথেষ্ট হবে কিনা জানি না।
ভালবাসার একটি ধাপ আছে। যেমন- একটি সন্তান নিজের মা কে যতটা ভালবাসে একটি মা তার সন্তান কে তার'চে হাজার গুণ বেশি ভালবাসে। একজন ছেলে মা হারালে যেই কষ্ট পায় একজন মা তার সন্তান হারালে তার'চে অনেক গুণ বেশি কষ্ট পায়।
একটি মেয়ে জন্মের পর মা-বাবার পাশে থাকে। একটি সময় সে বড় হয়। যতই বড় হয় মনের মাঝে একটি ভয় কাজ করে বাবা-মা তাকে বিয়ে দিবে। তার স্বামীর বাড়ি কেমন হবে, কেমন হবে তার স্বামী শাশুড়ি তার নতুন পরিবার। এই অজানা ভয় কেউ কোন দিন বুঝে না। এমন কি মা-বাবা আপন ভাইটি ও না। নিয়ম অনুযায়ী তাকে যেতেই হবে। বিয়ের পর সেই নতুন পরিবারের সাথে পরিচিত হতে কত বড় মানসিক চাপ সামলা একজন পুরুষ সেটা বুঝার ক্ষমতা নেই। যদি নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত হয় তাহলে তাকে দিতে হয় এই যুগের অগ্নিপরিক্ষা। একটা সময় এসব মানসিক চাপ ৮০% কমে যায় যখন প্রথম সন্তান আসে। মানে সে ওই পরিবারের পাকাপোক্ত সদস্য। একজন মা।
আরেক রকমের মা আছে যারা স্বামী হারিয়ে সন্তানের জন্য জীবনের সাথে চ্যালেঞ্জ করছে প্রতিদিন। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে সব কিছু করতে পারে এরা। "সব কিছু"। জীবনের কাছে সমাজের কাছে প্রতি মুহূর্ত পরাজিত এই মা সন্তান কে দেখে ভুলে যায় সব। সন্তান বড় হয় একটি চাকরি খুঁজে। মা প্রতিদিন ঈশ্বর কে ডাকে। ছেলের চাকরী টা হোক নাহয় মরেও শান্তি পাবে না।
আর নিঃসন্তান! নিঃসন্তান জননীর কষ্ট তাদের সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায় মিশে থাকে। যেই নারী অন্যের সন্তান বুকে চেপে ধরে একটু সুখ খুঁজা সেই নারী কতটা কষ্ট বুকে চেপে রাখে? স্বামী-স্ত্রী একেরপর এক ডাক্তার বদলায় শারীরিক কোন সমস্যা নেই। এবার সন্তানের আশায় ডাক্তারী পড়ুয়া নারী ছুটে যায় প্রচিন ঝাড়ফুঁক নিতে। কাতর অনুরোধ করে একটি সন্তানের জন্য। বিশ্বাস করে নলকূপের পানি পান করে অপেক্ষা করে একটি সন্তান পেতে। দিনের পর দিন জায়নামাজে পড়ে কান্না করে একটি সন্তানের জন্য। মা ডাক শুনতে চায় সে। একটা সময় সব আশা শেষ হয়। পাশের বাড়ির নববধূর সন্তান হয়েছে শুনে ছুটে যায়। সেখানে মিষ্টি বিতরণ চলছে। এযেন "হৈমন্তী" গল্পে"জৈষ্ঠের ক্ষরা রৌদ্রই তো জৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন"।
সবকিছুতে বাদ পড়ল একটি বাবার কথা। না বাবা হয় নি। হওয়ার কথা ছিল। সন্তানের বাবা হওয়ার স্বপ্ন নিমিষে হাঁড়িতে শুকিয়ে গেছে। কান্না করে নি হয়তো সে বা করবেও না। বাবারা এমনি হয়। খুব কঠিন তাদের হৃদয়, হৃদয়ের ভালবাসা।
ফেণী সদরে জেলেপাড়ায় তুলসী বাকি জীবন তা নিঃসন্তান। মাতৃত্ব হারিয়েছে নিজের চোখের সামনে। গত সাত মাস একটু একটু করে আগলে রেখেছে গর্ভে। খুব সতর্ক হয়ে চলতে হয়েছে তাকে সাতটি মাস প্রতিটি মিনিট সেকেন্ড কাউন্ট ডাউন করছিল দশটি মাস করে সন্তানের মুখ দেখবে। সেই দিন আর আসে নি।
তুলসী বন্ধ্য নয়। তার সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতা ছিল আর দশ জনের মত। কিছু মানুষ তার পেটে লাথি দিয়ে বের করে নিয়েছে সন্তান। হ্যাঁ আমি আবার বলছি "মানুষ" ওরা। পশু নয়। প্রজাতি ভেদে এরা মানুষ। খারাপ ভাল যাই হোক। বর্বরতা লুকাতে মানুষ হয়ে কুকুর, শাবক, ন্যাকড়া বলে মানুষ লজ্জা আর কত ডাকবেন। মানুষ "আশরাফুল মাকলুফাত" মানে সৃষ্টির সেরা জীব। ভালর দিক দিয়ে সেরা নাকি খারাপের দিকে সেরা বলা নেই। হয়তো খারাপের দিকে।
একজন বলেছিলেন -‘রবীন্দ্রকে ওরা মারছিল। তার পোয়াতি বউটা এসে তাকে বাঁচাতে চাইলে তার পেটেও লাত্থি মারলো। আমাদের মেয়েটা আর কোনওদিন মা হতে পারবে না। আমরা কী এমন দোষ করেছি বাপু, এদেশটা কি তাহলে শুধুই ওদের, আমাদের না'?
ঘটনার সূত্র লক্ষীপুজায় নামাজের সময় বাজি ফুটানো। অন্যায়। ঘোর অন্যায় করছে এরা। অবশ্যই চিন্তা করা দরকার সাম্প্রদায়িক মনভাব টি। সামাজিক পরিচয় টি। সংখ্যালঘু হিন্দু পরিচয় টি।
অসাম্প্রদায়িক হিসাব টা একটু ভিন্ন ব্যাপার। যেমন - আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু সেটা কাধে কাধ লাগানো মানুষ হতে হবে। শহরবাসী মসজিদ মন্দির একইসাথে পুজা নামাজে সমস্যা নেই। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য এটি দুঃসাহস। তারউপর নিম্নবর্ণ হিন্দু। জেলে! কি ভাবছেন বর্ণপরিচয় কেন? বালুতে মাথা গুঁজে না রেখে তাকিয়ে দেখুন। "পদ্মা নদীর মাঝী" উপন্যাস মুখস্থ করা হয়েছে শুধুই ভাল মার্ক নিয়ে পাস করতে। সমাজের জেলেরা এখনো বর্ণ বৈষম্যের চিপায় আছে। ৭০-৮০শতাংশ সমাজে হাল আমলের উঁচু নিচু জাতিভেদ রয়ে গেছে। সেই নিচু জাতের মানুষ গুলোর ছোট অপরাধ অনেক বড় চোখে দেখা হয়। যার সাজা নগদে দিয়ে দিল উচ্চবংশীয় অতি ধার্মিকগন।
এবার আইন হাতে তুলে নেয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার দেখানো হল। সাজার জন্য লম্বালাইনে মানববন্ধন, মিটিং মিছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। সাজা হবে ২বছর বা ৫বছর জেল। হতে পারে ২০বছর। আদতে কোন আইনের ক্ষমতা আছে কি সন্তান হত্যা আর মাতৃত্ব নষ্ট করার সাজা দিবে?
"তুলসী" একটি পবিত্র উদ্ভিদের নাম। যার পাতাটি পূজায় ব্যবহার করা হয়, ঢাল দিয়ে মালা বানানো হয়। আগা থেকে শিকড সবটাই পবিত্র। নিন্মবিত্ত পরিবারে এখন ও মডার্ন হয় নি। জন্মের পর পবিত্র দেব দেবীর, বা ধর্মগ্রন্থের থেকে নাম রাখে। তুলসীর নাম ও সেই খাতিরেই রেখেছিল মনে হয়। কে জানতো তুলসী সব খানে পবিত্র নয়। এই বঙ্গে অনেক আগে তুলসী গাছ উপড়ে পেলে দিয়েছিল। সেটা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বুঝলেও তুলসীর মায়ের তেমন জ্ঞান নেই। ৪৭সালের পর এখনো তুলসীর খোঁজ চলছে। একটি একটি গ্রামে একটু একটি ঘরে। তারা সক্রিয়, একটি তুলসী কন্যার খোঁজে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১৫ ভোর ৪:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



