somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে বয়ান ঘিরে জামাতের রাজনীতি: "মুক্তিযুদ্ধ ভারতের ষড়যন্ত্র" আর "যুদ্ধাপরাধীরা ইসলামের সৈনিক"

২০ শে নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর আবার ভাঙতে যাবার অর্থ, জামাত ও মৌলবাদীদের প্রতিপক্ষ হাসিনা, হাসিনার স্বৈরশাসন বা আওয়ামী লীগের গুম-খুন-লুটপাট নয়। তাদের প্রতিপক্ষ মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙলা সংস্কৃতি। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির যে আত্মঅন্বেষণ ও সাংস্কৃতিক চেতনার উদ্ভাসন ঘটেছিল, সেই জায়গাটা জামাতের বিরোধের মূল কেন্দ্র।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তিগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে যতটা সক্রিয় হয়েছে, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ - রিকশাচালক থেকে গার্মেন্টস কর্মী, দিনমজুর, হকারসহ খেটে-খাওয়া মানুষেরা ছিলেন একেবারে সম্মুখসারিতে। রক্ত ও জীবন দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে প্রথম মূল্য তারাই দিয়েছেন। কিন্তু হাসিনার পলায়নের পর সকল প্রকার আলোচনা থেকে প্রথমেই তাদেরই বাদ দেওয়া হলো। হাসিনার পতনের সাথে সাথে আওয়ামী এলিটেরা পালালে জামাতের এলিটেরা ক্ষমতা দখল করলেন।

শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ভবনের নাম পরিবর্তনের জোয়ার। ড. কুদরৎ ই খুদা ভবনের নাম বদলে রাখা হলো জাবির ইবনে হাইয়ান। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশ চন্দ্র বসু ও জীবনানন্দ দাশের নাম মুছে ফেলা হলো। আদর্শিক শক্তির প্রথম আঘাত পড়লো বাঙালি সংস্কৃতি এবং সেক্যুলার রাষ্ট্রচিন্তার ওপর।

জামাতের আমীর লাগলেন নারীদের পেছনে। কখনো তিনি মেয়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেন, কখনো ঘরে থাকার জন্য ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তার কথা শুনলে মনে হয়, তিনি নতুন করে দাসপ্রথা চালু করতে চান ও নারীদের দাসী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিতে চান। ভারতে যেমন দলিতদের ওপর নিপীড়ন চলে, মোল্লাতন্ত্রে তেমনভাবে নারীদের দাসী করে রাখার প্রথা। এসব অসলগ্ন কথার আড়ালে তিনি আসলে শরিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লিটমাস টেস্ট নিচ্ছেন। যার ফলফল সবসময়ই নারীর মুখে কালি মেখে দেয়া ও তাদেরকে নিগৃহীত করা।

জামাত যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে সমস্যা কী? সমস্যা হল, জামাত একটি ধর্মভিত্তিক, জঙ্গিবাদী, বর্ণবাদী ও নারী-বিদ্বেষী রাজনৈতিক দল। তাদের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ধর্মীয় গোড়ামি, বর্ণবাদ, কুসংস্কার ও ধারাবাহিক মিথ্যাচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন জায়নবাদে ইহুদিদের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনে করা হয়, হিন্দুত্ববাদে উচ্চবর্ণবাদী মানসিকতা লালিত হয়, নাজিরা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষনা করে, তেমনি জামাতের রাজনীতিও মুসলমানী শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশুদ্ধ এবং আশরফ বা উচ্চবর্ণের মুসলমান শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার প্রতিফলন।

আতরফ বা অনভিজাত মুসলমানদেরকে তারা হিন্দুয়ানী মুসলমান বলে হেয় প্রতিপন্ন করে, এবং তাদেরকে খাঁটি মুসলমান বানানোর প্রকল্প হাতে নেয়। শুরুটা হয়, তাদের মাথায় জঙ্গিবাদী মতাদর্শের বস্তা চাপিয়ে দিয়ে। যেভাবে তারা নেকাবের আড়ালে নারীদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে, ঠিক সেভাবেই এই মতাদর্শের বস্তা মানুষের চিন্তা, প্রগতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন - সবকিছুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এই বস্তার গতিমুখ সবসময় পিছনের দিকে, অন্ধকারের দিকে। ধ্বংস, হিংস্রতা এবং বর্বরতার দিকে। আর এই ধ্বংস, হিংস্রতা ও বর্বরতার তারা নাম দেয় আল্লাহর আইন, শরিয়া, ইসলামী রাষ্ট্র ইত্যাদি। তাদের এই স্বঘোষিত ধর্মীয় রাজনীতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাঙালি সংস্কৃতি। যাকে তারা কখনো হিন্দুত্ববাদ, কখনো হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, আবার কখনো ভারতের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতই জামাত বাঙালি সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে। ফলে তাদের সকল কার্যক্রমই মূলত মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। জামাতের রাজনৈতিক কাঠামো পাকিস্তানি সামরিক ও অভিজাত শ্রেণির উত্তরাধিকারে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত। এটি বাঙালি হিন্দু- মুসলিম, বৌদ্ধ- খ্রিষ্টান-আদিবাসীদের রাজনীতি নয়। মানুষের অধিকার নয়, মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জঙ্গিবাদী মতাদর্শই এখানে মুখ্য। তাই হত্যা, নিপীড়ন ও দমন-পীড়ন এদের রাজনীতির কেন্দ্র।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর "সংস্কৃতি-কথা" প্রবন্ধে লিখেছিলেন: ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম… কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা… বাইরের আদেশ নয়, ভেতরের সূক্ষ্মচেতনাই তাদের চালক।

দেখার বিষয়, বাংলাদেশে মননশীল ও উন্নত চরিত্রের বাঙালি সংস্কৃতির জয় হয়, নাকি রাজাকার-জঙ্গি-বর্ণবাদীদের ধর্মের নামে বানানো অধর্মের জয় হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৪:৪৫
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহসের পরিচয় দিয়েছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

সৌদি আরব - তুরস্ক - পাকিস্তান জোটে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু, নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত করেছেন। এ এক অসাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০



শেখ হাসিনা ভারত চলে যাওয়ার পর, দেশের অনেক কিছু পরিবর্তন হয়।
ক্ষমতায় আসেন, ইউনুস। ইউনুস ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর সারা দেশ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। দেশের সমস্ত খারাপ লোকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইনকা চিপা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬


এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণীকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিল, ড. ইউনূস, আমেরিকা-বাংলাদেশ চুক্তি ও এলিট তৈরির কারখানা - আমাদের শিক্ষা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ট্রাম্পের সাথে করমর্দনের একটা ছবি প্রকাশ করেছেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ছবিটি ঘিরে অনেকে অনেক মন্তব্য করেন। বছরের শুরুতে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে চুক্তিগুলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা গান: অতীত ও বর্তমান- হৃদয়ে টিকে থাকা সুরের খোঁজে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৩২



বাংলা গান: অতীত ও বর্তমান- হৃদয়ে টিকে থাকা সুরের খোঁজে

রেডিওর ক্র্যাকল শব্দ ভেদ করে ভেসে আসা "আমার সোনার বাংলা", কিংবা কোনো বর্ষার সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলামের "কারার ঐ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×